ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ২৮ মার্চ ২০২০ ১৩ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ২৮ মার্চ ২০২০

চট্টগ্রামের মেয়র পদে আ.লীগের চমক রেজাউল : যে কারণে নাছির বাদ
জসীম চৌধুরী সবুজ চট্টগ্রাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৭.০২.২০২০ ১২:৪২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 157

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী মনোনয়নে চমক দেখালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মনোনয়ন চেয়েছিলেন ১৯ জন। ডাকসাইটে প্রার্থী ছিলেন অনেকে। লবিং-তদবিরেরও কমতি ছিল না। এদের সবাইকে ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পেলেন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী। বীর মুক্তিযোদ্বা এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা একজন ত্যাগী রাজনৈতিক সংগঠক তিনি। যিনি সব সময় এড়িয়ে চলেছেন গ্রুপিং-কোন্দল। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিকে যিনি প্রশ্রয় দেননি কখনও। স্কুল জীবনে ছাত্রলীগ দিয়ে শুরু করে ৬৭ বছর বয়সে এসেও কোনোদিন নীতিচ্যুত হননি।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত ত্যাগী নেতা হিসেবে ঋদ্ধ করেছেন নিজেকে। এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠককে চট্টগ্রামের মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার মধ্যরাতে নাম ঘোষণার পর থেকেই এটিই হয়ে ওঠে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। চট্টগ্রামেও সৃষ্টি হয়েছে দারুণ চাঞ্চল্য। একে পুঁজি এবং পেশিশক্তির দাপটের বিপরীতে ত্যাগী নেতার যথার্থ মূল্যায়ন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি চায়ের টেবিলে-আড্ডায় আলোচনার অন্যতম বিষয়ও হয়েছে ‘কেন বাদ পড়লেন আ জ ম নাছির উদ্দীন?’
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাঈদ খোকন বাদ দিয়ে যখন ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে প্রার্থী করা হয় তখনই মূলত ঝরের পূর্বাভাস পেয়ে যান আ জ ম নাছির। আলোচনায় চলে আসেন সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর ছেলে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন্তু তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে জড়াতে আগ্রহী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রার্থী ১৯-এ গিয়ে ঠেকে। আ জ ম নাছিরের ভাগ্য পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। লবিং-তদবিরে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তেও শিকে ছিঁড়ল না তার ভাগ্যে।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল নির্বাচনে বিজয়ী আ জ ম নাছির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জুলাই মাসে। ২০১৬ সালে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও আমলাদের সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করে বেকায়দায় পড়ে যান। তিনি বলেছিলেন, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রকল্পের অনুমোদন মেলে না বিনিময় ছাড়া। গাড়ি ও নানা লোভনীয় উপঢৌকন না পেলে আমলারা ফাইল ছাড়েন না।
তার এই বক্তব্যে তুমুল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এরপর থেকে সরকারের সঙ্গে তার দূরত্বের শুরু। প্রথম তিন বছর তিনি শুধু রুটিন ওয়ার্ক করে গেছেন। জলাবদ্বতা নিরসনসহ নির্বাচনি প্রতিশ্রæতি পূরণেও তার চেষ্টার ঘাটতি লক্ষণীয়। নগরীর অগুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে উঠলেও তিনি তা দূর করতে পারেননি। শুধু সিডিএ এবং ওয়াসাকে দোষারোপ করে গেছেন। তার মনোনয়নপ্রাপ্তি এবং নির্বাচিত হওয়ার পেছনে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অবদান থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আ জ ম নাছির মন্তব্য করেন, চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারিবারিকভাবে অর্থবিত্তের মালিক আর কেউ নেই। অন্যরা রাজনীতিতে এসে টাকার মালিক হয়েছে। এই বক্তব্যেও তিনি অনেকের বিরাগভাজন হন।
মহিউদ্দীন চৌধুরী চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একটা মহীরুহ। তার সম্পর্কে এমনসব মন্তব্য নাছির করেছেন, যাতে তার অনুসারীরা আরও দূরে সরে যান। দলের বিভাগীয় সম্মেলনে বেগম হাসিনা মহিউদ্দীনকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সেই দূরত্ব আরও বাড়ে। নাছির তার নিজস্ব বলয় থেকে বের হয়ে যেমন সবার মেয়র হয়ে উঠতে পারেননি, তেমনি উন্নয়ন কাজেও সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে ব্যর্থ হন। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী তার ওপর চরমভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন। যে কারণে ৬ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্বতা নিরসন প্রকল্প চসিককে না দিয়ে সিডিএকে দেওয়া হয়। গত সাড়ে তিন বছরে তিনি একবারও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পাননি। দেশের সব সিটি মেয়র মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীর পদমর্যাদা পেলেও নাছিরকে তা দেওয়া হয়নি। তিনি মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও আরও অনেক ছোটখাটো সংগঠনের দায়িত্ব এবং চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশি সময় দিয়েছেন। গৃহায়ন অধিদফতরের এক প্রকৌশলীকে চড় মেরে ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি। নওফেল কোতোয়ালি আসনের সংসদ সদস্য। তার অনুসারী কাউন্সিলরদের সঙ্গেও তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। নগরীর চারটি আসনের সংসদ সদস্যদের কোনো মতামতের তোয়াক্কা তিনি করেননি। গত সাড়ে চার বছরে একবারও তাদের সঙ্গে বসার গরজ বোধ করেননি। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে এবার তার পাশে অনেকেই ছিলেন না, যারা গতবার তাকে মনোনয়ন পেতে সহায়তা করেছিলেন। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী তার মাথার ওপর থেকে স্নেহের হাত তুলে নিয়েছিলেন সাড়ে তিন বছর আগে। দীর্ঘ সময়েও নাছির তা আর ফিরে পাননি। তা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে একই ব্যক্তি থাক, তাও চাননি প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে কপাল পুড়ল আ জ ম নাছিরের। মূল্যায়ন হলো নিবেদিত একজন সংগঠক রেজাউল করিমের।
রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগরীর বনেদি পরিবারের সন্তান। বহদ্দারহাট তাদের পারিবারিক পরিচয় বহন করে। তার পিতা প্রয়াত হারুনুর রশীদ চৌধুরী ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং দাদা ছালেহ আহমদ চৌধুরী ছিলেন আইনজীবী ও তৎকালীন কমরেড ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নগরীর বিভিন্নস্থানে বহদ্দারবাড়ির প্রতিষ্ঠিত ২৩টি মসজিদসহ বহু জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক তিনি। ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি, উত্তর জেলা সভাপতি ছিলেন। নগর আওয়ামী লীগে ধাপে ধাপে তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন। তিনি একজন লেখক। তার প্রকাশিত একাধিক গ্রন্থ রয়েছে। তার বড় মেয়ে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখন দেশের বাইরে পিএইচডি করছেন। অন্য মেয়ে চবি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। ছোট ছেলে কেমিক্যাল প্রকৌশল বিষয়ে লেখাপড়া করছেন।
পাদপ্রদীপের আলোয় থাকা বাঘা বাঘা সব প্রার্থীকে ছাপিয়ে রেজাউল করিম চৌধুরীর মনোনয়নপ্রাপ্তি নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে আলাপকালে নগরীর সংসদ সদস্য ও মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা জানিয়েছেন তাদের প্রতিক্রিয়া।
এবারে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি রেজাউল করিম চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, নেত্রীর সিদ্বান্ত মেনে নিলাম। আমাদের কাজ হচ্ছে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে নেত্রীর মনোনীত প্রার্থীকে জিতিয়ে আনা। চট্টগ্রামের মেয়র পদটি আমরা প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিতে চাই।
নগরীর বন্দর, ইপিজেড ও পতেঙ্গা থানা এলাকার সংসদ সদস্য এমএ লতিফ সময়ের আলোকে বলেন, একজন ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাকে যথার্থই মূল্যায়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আশা করি, বিগত দিনের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি আগামীর পথ চলবেন। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের জন্যই নেত্রী তাকে বেছে নিয়েছেন। রাজনীতিতে তার কমিটমেন্টের মূল্যায়ন করেছেন। তার জয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে ব্যর্থ হলে নেত্রী কাউকে ছাড় দেবেন না।
সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী ত্যাগী নেতা রেজাউল করিমকে মনোনয়ন দিয়েছেন। রোববার তার সঙ্গে আমার শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। তিনি দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন। আমি তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, নেত্রীর সিদ্বান্তই চ‚ড়ান্ত। আমি মাথা পেতে নিয়েছি। আমরা সবাই মিলে কাজ করব নৌকার প্রার্থীর বিজয়ের জন্য।
নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আমি মনে করি নেত্রী খুব ভালো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি রাজনীতিতে গুণগত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস। এটাতে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। এটি খুবই শুভ লক্ষণ। পুঁজি এবং পেশির দাপট ছাড়াই একজন ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকের মূল্যায়ন হয়েছে। আমার শুভ কামনা থাকল। নৌকা বিজয়ে থাকবে সর্বাত্মক সহযোগিতা।
ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন বলেন, রেজাউল করিম চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। অতীতে চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে লবিং-তদবিরেও ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী তাকে মূল্যায়ন করায় আমি খুশি। এটি আওয়ামী লীগের ইমেজের জন্য ভালো এবং অন্যরাও এতে উৎসাহিত হবে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]