ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ এপ্রিল ২০২০ ২২ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ৬ এপ্রিল ২০২০

পুলিশে ছুঁলে আঠার ঘা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১১:৪১ পিএম আপডেট: ১৯.০২.২০২০ ১২:৩৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 437

কী অপরাধ আমার? অপরাধ না করেও কেন ৫ মাস ১৭ দিন জেল খাটব? তাদের দাবি করা ৩ লাখ টাকা দেইনি বলে তারা আমাকে এভাবে জেল খাটিয়ে নিঃস্ব করল। জেল খেটেও নিস্তার পেলাম না। এখন ভুয়া আসামি সাজিয়ে আদালতে সাক্ষীরও ব্যবস্থা করেছে। আমার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেও কোনো বিচার পেলাম না। কথাগুলো কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন রাজধানীর পল্টন এলাকার ‘হোটেল বন্ধু’র ম্যানেজার হাসান মজুমদার।
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর দুপুরে মতিঝিল জোনের গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন সদস্য তার হোটেল আসে এবং তাকে ও হোটেল বাবুর্চি সোহেল রানাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ৩ লাখ টাকা দাবি করে। সেই টাকা দিতে তারা অপারগতা প্রকাশ করায় দুজনকে আসামিকে বানিয়ে জাল টাকার মামলা দিয়ে আদালতে চালান দেয় ডিবি। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ও তার ভাই। তারা উল্লেখ করেন, অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে তিনটি তদন্ত কমিটি হলেও অভিযুক্তরা এখনও বহাল তবিয়তে। উল্টো তাকে ও তার সহকর্মীর নামে ভুয়া মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাদের ফাঁসানোর জন্য ভুয়া সাক্ষী বানিয়ে আদালতে তা প্রমাণের চেষ্টা করে যাচ্ছে অভিযুক্ত ডিবির সদস্যরা।
সেদিন কী ঘটেছিল : হাসানের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন ৫-৬ জন ব্যক্তি তার হোটেলের তৃতীয় তলায় প্রবেশ করে। এরপর তারা তাকে খুঁজতে থাকে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে তিনি হাসান কি না?। এ সময় তিনি তাদের পরিচয় জানতে চান। ওই ব্যক্তিরা নিজেদের ডিবির সদস্য বলে পরিচয় দেন। পরে তাকেসহ হোটেল বাবুর্চিকে হাতকড়া পরানো হয়। হাসান বলেন, আমি জানতে চাই কেন আমাকে হাতকড়া পরানো হচ্ছে? তারা বলে, পরে বুঝবেন। কোনো সমস্যা নেই। স্যারের সঙ্গে কথা বলিয়ে সম্মানের সঙ্গে আবার দিয়ে যাব। এ সময় তারা সিসি ক্যামেরা দেখতে পেয়ে বন্ধের নির্দেশ দেন। সহকারী ম্যানেজার ফরহাদ মিয়া সিসি ক্যামেরার লাইন খুলে দেয়। তবে নিচতলার সিসি ক্যামেরায় পুরো ঘটনাটি ধরা পড়ে। এরপর তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় পরে তাদের দুজনকে জাল টাকার মামলায় আসামি করে আদালতে চালান দেওয়া হয় বলে জানান হাসান। এ ঘটনার সময় হোটেলে ছিলেন জাল টাকা মামলার বাদী তপন কুমার ঢালী, তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল হোসেন, এএসআই জিয়াউর রহমান, সোহেল মাহমুদ, আবুল বাশার, মোমিনুল হক, নাজমুল হক প্রধান, কং নয়ন কুমার ও কং গোলাম সারোয়ার।
অভিযোগ করেই বিপাকে : ভুক্তভোগীর ভাই হোসেন জানান, অভিযোগের পর তার ছোটভাই, হোটেল বন্ধু (আবাসিক) মালিক হুমায়ুন কবিরসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের ডেকে নেন ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি ওমর ফারুক। দুপক্ষের কাছে সব কিছু শুনে ও হোটেলের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিষয়টি নিয়ে ডিবির ওই সদস্যদের গালমন্দও করেন তিনি। সমাধানের জন্য হাসানের ভাইয়ের অভিযোগ তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় ডিবির সদস্যরা আশ^াস দিয়েছিলেন, মামলার চার্জশিট থেকে হাসানের নাম বাদ যাবে এবং তারা হাসানকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। অভিযোগ প্রত্যাহারের পর আর ফোন ধরতেন না। উল্টো হাসানসহ তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। এরপর জেল থেকে বের হয়ে হাসান আবারও কয়েকদফা অভিযোগ করেন। ভুক্তভোগী হাসান জানান, তার হয়ে ছোটভাই ডিবি পুলিশের অপরাধের বিষয়ে আইজিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে অভিযোগ করায় হোসেনকে হত্যার হুমকি দেয় ডিবির সদস্যরা। ভুক্তভোগী হাসান মজুমদার জানান, পুলিশ সদর দফতর থেকে গঠিত কমিটির প্রধান সিনিয়র এএসপি শরিফুল ইসলাম তাদের ডেকে পাঠান। সে সময় তিনি বলেন, ‘পুলিশ যে দোষী তা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে। পুলিশ কেন এ ধরনের কাজ করল তা আমার বোধগম্য নয়। আপনার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
মামলার এজাহার, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী : মামলার এজাহারে হাসান ও তার সহকর্মীকে ফকিরাপুল থেকে বিকাল ৪টায় জাল টাকাসহ আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হিসেবে ২৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হলেও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী টেলিপ্লাসের কর্মী মাসুন, সানজিদা কম্পিউটারের কর্মী তারেক, বন্ধু সেলুনের সুজন রায় বলেন, হাসানকে সেদিন দুপুরের দিকে ৫-৬ জন লোক হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। পরে পুলিশ বিষয়টির সত্যতা জানার জন্য ডিবির মিন্টো রোডে ডেকেছিল তাদের। ‘ছেলেটাকে আমরা ভালোভাবে চিনি, তাকে হোটেল থেকে ধরে নিয়ে এমন মামলা দিল ভাবতেও পারিনি’Ñ বলছিলেন তারা।
ঘটনা তদন্তে কমিটির বক্তব্য : ডিবি পুলিশের ভুয়া মামলা থেকে রেহাই পেতে হাসান মজুমদার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ডিবির আট সদস্যের বিরুদ্ধে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির প্রধান করা হয় পুলিশ সদর দফতরের এএসপি ওমর ফারুক, সিনিয়র এএসপি শরিফুল ইসলাম ও ডিবির এডিসি কাজী শফিকুল আলমকে। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এই কমিটির প্রধান হলেন ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি মোহাম্মদ সাহেদ মিয়া ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য।
এ বিষয়ে এএসপি (বর্তমানে পুলিশ সদর দফতরে কর্মরত) ওমর ফারুক সময়ের আলোকে জানান, হোটেল মালিক অভিযোগ প্রত্যাহার করায় বিষয়টি আর তদন্ত হয়নি। কিন্তু তার এমন কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি। ঘটনার আরেক তদন্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে নিউমার্কেট জোনের এডিসি) শাহেদ মিয়া জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। বাধ্যবাধকতা থাকায় এর বেশি কিছু বলতে পারব না। এছাড়াও ডিবি উত্তর বিভাগের এডিসি কাজী শফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি অনেক বছর আগের। তদন্ত করে রিপোর্টও দিয়েছিলাম। কিন্তু রিপোর্টে কী দেওয়া হয়েছিল মনে নেই।
ভুয়া মামলা বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য : জাল টাকা মামলার বাদী তপন কুমার ঢালী বলেন, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারব না। ডিবির স্যাররা কথা বলবেন। অন্যদিকে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে ফরিদপুর পিবিআইয়ে কর্মরত) এসআই দেওয়ান উজ্জল হোসেন সময়ের আলোকে জানান, এই মামলায় চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য বা কথা বলতে পারব না। এ রকম ভিডিও ফুটেজ এডিট করে বানানো যায়।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]