ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৬ জুন ২০২০ ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ৬ জুন ২০২০

ভাষা শহীদদের জন্য প্রার্থনা
মুফতী জুবায়ের রশীদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৩:২৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 128

ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার প্রতি মমতা কেমন বেড়ে যায়। অস্তিত্বের শেকড়ে বিন্দু বিন্দু জমে থাকা ভালোবাসাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ পায়। চেতনার ডালপালা নড়তে থাকে। চারপাশে বইতে থাকে ভালোলাগার বাতাস। নির্জন রোদে টাটানো দুপুরে স্নিগ্ধ সবুজে ছাওয়া বাঁশবাগানে টুকুস-টাকুস পাখির কলরবকে ভারী মিষ্টি লাগে। কামরাঙা রোদের ধূসর বিকালে ঘরে ফেরা বকের সারির ডানার শব্দকে মনে হয় এ যেন হাজার বছরের চেনা এক সুর। ক্ষয়ে যাওয়া বৈঠা হাতে ছন্নছাড়া গেঁয়ো মাঝির মুখে অদ্ভুত সুরেলা ভাটিয়ালি মৃদুটান নদীর উচ্ছল তরঙ্গে স্পন্দন আর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ইথারে ইথারে যেন পৌঁছে যায় মহাকালের সুদূর কোনো ঘাটে। স্বপ্নের বন্দরে। শিশুর মুখের উচ্ছল হাসি, মনের মাধুরি মেশানো পুষ্পরেণু সুবাসিত মায়ের ডাক, বাবার বাঁ হাতের ছোট আঙুলে ধরে নেচে গেয়ে শৈশবের সেই হেঁটে যাওয়া, রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে দৌড়ে দৌড়ে হারিয়ে যাওয়া অফুরন্ত সব আনন্দের ভেতর- বাংলার আবহকালীন এ সুন্দর চিত্রগুলো ফের জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এ সব কিছুর ভেতরই যেন মাথা উঁচিয়ে জেগে আছে একটি ভাষা। সবুজ পাতার মতো স্নিগ্ধ ভোর, রোদ ঝলসানো দুপুর, পাখি ওড়া গোধূলি, অপরূপ সন্ধ্যা, বৃষ্টির ভেজা গন্ধের জোছনা মুগ্ধরাত; এ সবের ভেতরই জীবন্ত হয়ে আছে একটি চির উন্নত আপন ভাষা। যার অপার কল্যাণে চিরচেনা মনে হয় সব কিছু। পাখির ডাক নদীর ঢেউ মাঝির টান শিশুর হাসি এবং মায়ের কথা সবই যেন প্রিয় সে ভাষার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। ফেব্রুয়ারি এলেই পরানের গহীনে লুকিয়ে থাকা ভাষার প্রতি অকুণ্ঠ সেই ভালোবাসা ক্রমশই আচ্ছন্ন করতে থাকে আমাদের মন মনন স্বপ্ন ও বাসনা। ঘিরে রাখে চেতনার শেকড় থেকে শিখড় অবধি।

ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে গর্বের সেই অতীতের কথা। বেদনাদীর্ণ সকালের কথা। মনে পড়ে আমাদের সে সাহসের গল্প। সেদিন আবেগ ছিল। ভালোবাসা ছিল। দরদ ছিল। ছিল ভাষার প্রতি আজন্ম মমতা। আমাদের ভাগ্যে হাত দেয় ওরা কারা! মায়ের মুখের বুলিকে কেড়ে নিতে চায় ওরা কোন সে ঘাতক! বুকভরা রক্ত নিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন পা রাখে রাজপথে। মুষ্টিবদ্ধ হাত। ঔদ্ধত তর্জনী। ঝাঁঝালো স্লোগান। সেদিন সবাই বিপ্লবী বিদ্রোহী। অধিকার আদায়ের চিৎকারে কেঁপে ওঠে সেদিন আকাশ। পদভারে কাঁপে মাটি মৃত্তিকা। অগ্নিস্লোগানে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। বাংলা মায়ের সন্তানেরা। সবার চোখ মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। প্রতিশোধের আগুন যেন আজ জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে ওদের সব কিছু। যারা আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চায় তাদের। পরাজিত শত্রু সেদিন গুলি চালায় আমাদের সাহসের বুকে। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। কংক্রিট এবং ফুটপাথ। লুটিয়ে পড়ে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বাররা। রক্তের ডানায় ভর করে তাদের আত্মার পাখি উড়ে যায় মহাকালের পথ ছাড়িয়ে স্বর্গোদ্যানের দিকে। কেমন সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আমাদের দুঃসহ রৌদ্রতাপে।

সবুজ বাংলার পথে-ঘাটে। প্রান্তর থেকে তেপান্তরে। রক্তের সে সুবাস। সে তখন থেকে দিনটি ইতিহাসের। এ ইতিহাস সত্যের। সাহসের। আবেগের। ভালোবাসার। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন আমরা হতাশ করেছি ওদের। ছিনিয়ে এনেছি বিজয়মাল্য। বেদনাবিধুর সেদিনটি ছিল একুশে ফেব্রæয়ারি। সেদিন এ দেশের সব পাখির কণ্ঠে ছিল বিষাদের সুর। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে যাওয়া ঝরনায় ছিল কান্নার কলকল ধ্বনি। শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে অশ্রু ফেলেছিল জায়া ও জননীরা। শহীদের রক্ত আর বিয়োগার্তদের আর্তনাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ইতিহাসের সত্যের প্রতি এক পৃথিবী শ্রদ্ধা রেখে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমরা লিখি মহান একুশে ফেব্রæয়ারি। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল এবং চৌষট্টি হাজার গ্রাম ছাড়িয়ে একুশের পতাকা আজ উড়ছে বিপুলা দুনিয়ার পথে পথে। দিকে দিকে। এ প্রাপ্তি আমাদের। আমাদের রক্তের। মাতৃভাষা বাংলার।

ফেব্রুয়ারি এলেই তাই দুই হাত তুলি মহান পাকের দরবারে। তাদের জন্য যারা রক্ত বিলিয়েছেন অকাতরে আমাদের এ ভাষার তরে। যাদের ত্যাগ আর শ্রমের কল্যাণে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে আমাদের ভাষা। আমাদের এবড়োখেবড়ো এই মানচিত্র। আজ দেখে কষ্ট পাই। শুনে মর্মাহত হই। যখন বহুজাতিক ঐশ্বর্য, মিনার সংস্কৃতি আর দিবস পালনের গড্ডালিকায় প্রার্থনা থেকে বঞ্চিত হয় মহান শহীদদের পবিত্র আত্মা। তাই একুশের সকালে নগ্নপদে মিনারের বেদিতে ফুলঅর্চনা নয় বরং আমাদের প্রার্থনার ফুলঝুরিতে সুবাসিত হোক একুশের শহীদদের আত্মা। জয় হোক আমাদের। আমাদের ভাষার। জয়তু সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার!




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]