ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ১ এপ্রিল ২০২০ ১৭ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ১ এপ্রিল ২০২০

একযুগ শিকলবন্দি প্রতিবন্ধী আলামিন
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১১:৪৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 24

আলামিনের বয়স এখন ১৭। এ বয়সে আর দশটা কিশোরের মতো স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, নদীতে সাতার কাটা- কোনোটাই সম্ভব হয় না তার। জন্ম থেকেই মানসিক প্রতিবন্ধী সে। হোটেল শ্রমিক বাবা শহিদুলের জন্য প্রতিবন্ধী ছেলেটি পাহাড়ের মতো বোঝা হলেও পিতৃস্নেহ দিতে সামান্য কার্পণ্য করেননি।

অন্যের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করা মা রেখা খাতুনের পক্ষে নাড়িছেঁড়া ধনকে মুক্ত রেখে জীবিকার অন্বেষণে যাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। তাকে মুক্ত রেখে মা-বাবা কর্মস্থলে গেলে পথ ভুলে হারিয়ে যায়। বাধ্য হয়েই তারা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে শিকলবন্দি রেখে যান আলামিনকে। কারণ এক দিন কাজে না গেলে সংসার চলে না তাদের।

যমুনার ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ার পর অসহায় শহিদুল পরিবার নিয়ে চলে আসেন শাহজাদপুরে নানা শ^শুরের বাড়িতে। সেখানেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় উপজেলার পৌর শহরের শান্তিপুর গ্রামে একটি জায়গা মাসিক পাঁচশ টাকা চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে ছোট্ট একটি টিনের চালা ঘর তুলে বসবাস করছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

পাঁচশ টাকার চুক্তিতে কোনোরকম মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও দুমুঠো ভাতের জন্য আলামিনের মা-বাবা দুজনকেই ছুটতে হয় কাজের জন্য। সকালে কাজে বের হয়ে বাড়ি ফেরেন রাতে। সারা দিন প্রতিবন্ধী আলামিনকে বাড়িতে একাই থাকতে হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট একটি টিনের চালাঘর। পাশেই একটি গাছের সঙ্গে আলামিনের পায়ে শিকল লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে রেখে কর্মস্থলে গেছেন তার মা-বাবা। ঝড়, বৃষ্টি যা-ই হোক, সারা দিন কাজ করে বাড়িতে মা-বাবা না ফেরা পর্যন্ত আলামিনকে শিকলবন্দি হয়ে গাছের পাশেই থাকতে হয়।

শত চিৎকার করেও মুক্তি মেলে না তার। এটা যেন চারপাশের সবারই গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকালে মা বাড়ি ফিরে শিকলের তালা খুলে ১৭ বছর বয়সি মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে গোসল করান।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা সদরের শান্তিপুর গ্রাম। সেখানেই নদীতীরে ছোট একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকে আলামিন ও তার মা-বাবা। আলামিনের জন্মের পরই তার পিতা বেলকুচি নিবাসী শহিদুলের ভিটেমাটি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। অর্থাভাবে মা-বাবা ছেলেকে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। স্থানীয় বিভিন্ন কবিরাজ ও তাবিজ-কবজের চিকিৎসা করিয়েছেন আরোগ্যের আশায়।

আলামিনের মায়ের ভাষ্য, প্রতিদিন সকালে ছেলের পায়ে শিকল পরিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন। সারা দিন ছেলেটি না খেয়ে থাকে। ছয়-সাত বছর বয়স থেকেই তাকে এভাবে বেঁধে রাখতে হয়। কথা হয় আলামিনের মায়ের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘এই ছেলেকে ১৭ বছর ধইরা টানত্যাছি। এহন ছেলের সঙ্গে আর পারি না। কিন্তু ছাইড়াও রাখতে পারি না। কহন কই যায়, নাকি কোনো পুকুরেই পড়ে। তাই মা হয়া নিজেই ছেলের পায়ে শিকল পরাই বাইন্ধা রাহি। ছেলের কষ্ট দেইখা কইলজাটা ছিঁইড়া যায়। কী করমু কোনো তো উপায় নাই।’

ছেলের একটা প্রতিবন্ধী কার্ড পেতে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেতে হয়েছে বহুবার। কিন্তু কোনো চেষ্টাতেই একটি কার্ড মেলেনি আলামিনের ভাগ্যে। একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পেলে সামান্য হলেও উপকারে আসত আলামিনের দরিদ্র পরিবারের। কিন্তু নানা জায়গায় ধর্না দিয়েও কার্ড না পেয়ে হতাশায় সে আশাও ছেড়ে দিয়েছে আলামিনের পরিবার। ইতঃপূর্বে চাইল্ড সাইড কেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে মাসিক ৩০০ টাকা দিলেও অফিসার বদলে যাওয়ায় এখন আর সেই অনুদান আর পায় না।

এ ব্যাপারে শাহজাদপুর পৌরসভার স্থানীয় কাউন্সিলর লিয়াকত আলী জানান, কিছু সরকারি নিয়ম রয়েছে যা পালনের জন্য ওই প্রতিবন্ধী মা-বাবাকে বলা হলেও তা তারা এখনও করতে না পারায় তিনি আলামিনকে প্রতিবন্ধী কার্ড দিতে পারছেন না।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]