ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০ ২২ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০

‘আমরা এখন যুদ্ধে আছি হাতে কিছু অস্ত্র চাই’
আহমেদ শরীফ শুভ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২০, ১২:২৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 119

করোনাভাইরাস বিপর্যয়ে আমরা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি যুদ্ধাবস্থায় আছি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই যুদ্ধটি একটি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। এই শত্রুর গতি প্রকৃতি এখনো আমাদের পুরোপুরি জানা হয়নি। তবে শারীরিক বিভেদের (কথিত সোস্যাল ডিসটেন্সিং, কিন্তু প্রকৃথ অর্থে তা হওয়া উচিত ‘ফিজিক্যাল ডিসটেন্সিং’) নীতিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই এখনো পর্যন্ত সফল যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

দেরিতে নেয়া হলেও বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। ভাইরাসের সংক্রমণের গতি শ্লথ করতে হলে মানুষের চলাচলের গতিও শ্লথ করার বিকল্প নেই। ঘোষিত আংশিক লক ডাউন অবশ্যই তাতে সহায়ক হবে। কিন্তু ছুটি ঘোষণার সাথে সাথে মানুষ যেভাবে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলের দিকে ভিড়াভিড়ি করে যাত্রা শুরু করেছে তাতে সংক্রমণের গতি কতটুকু শ্লথ হবে, তা প্রশ্ন থেকে যায়। এখন আর দেরি না করে জরুরিভিত্তিতে আরো কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

১। আমরা সবাই একসাথে এই যুদ্ধের সৈনিক। তবে চিকিৎসক সমাজ এই যুদ্ধের অগ্রসেনা। আজ থেকে মাঠে নামানো সেনাবাহিনীও তাদের সাথে যোগ গিয়েছে। সুতরাং, চিকিৎসকদের এবং দায়িত্ব মোতাবেক সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের অবিলম্বে পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) নিশ্চিত করা হোক। আত্মরক্ষার অস্ত্র ছাড়া কাউকে যুদ্ধে নামানো অন্যায়। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়। খুব বেশি নয়, প্রতিটি রফতানি নির্ভর গার্মেন্টস কারখানাকে ৩ দিনের মধ্যে ১০ হাজার করে পিপিই বানিয়ে সরকারের কাছে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হোক। তাতে চোখের পলকে লক্ষ লক্ষ পিপিই হাতে এসে যাবে। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার পরও নীতি নির্ধারককদের নির্লিপ্ততা অচিন্ত্যনীয়

ঢাকা ছাড়ছে অগণিত মানুষ
২। অনতি বিলম্বে জল, স্থল ও বিমানের সব প্রবেশপথে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ও ফিরে আসা নাগরিক ছাড়া কেউ কোন অবস্থাতেই দেশে প্রবেশ করতে পারবেন না। যারা প্রত্যাবর্তনের অনুমতির আওতায় ফিরে আসবেন তাদের সেনা তত্ত্বাবধানে বাধ্যতামূলক দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

৩। অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থানীয় পর্যায়ে (যেমন এক রাজ্য/ প্রদেশ থেকে অন্য রাজ্য/ প্রদেশে) ভ্রমন নিষিদ্ধ করে রাজ্য/ প্রাদেশিক সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র জরুরি কাজে নিয়োজিত গাড়ি ও ব্যক্তি ছাড়া কেউই এসব অভ্যন্তরীণ সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন। বাংলাদেশেও সে ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। আমাদের সব ফেরি চলাচল, আন্তঃজেলা ও আন্তঃনগর গণপরিবহন কেবলমাত্র জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বন্ধ করে দিতে হবে। জরুরি কাজে যাদের যাতায়ত করা প্রয়োজন তাদের জন্য দিনে ২/৩টি সার্ভিস চালু রাখা যাবে। সেনাবাহিনী এই রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলেও এই বিধান প্রযোজ্য হবে। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বেলায়ও এই বিধি কঠোরভাবে আরোপ করতে হবে। জরুরি কাজে নিয়োজিতরা সুনির্দিষ্ট প্রমাণসাপেক্ষে চলাচল করতে পারবেন। প্রাইভেট কারের ব্যাপারেও এই বিধি নিষেধ প্রয়োগ করতে হবে। স্থানে স্থানে সেনানিয়ন্ত্রিত চেক পোস্ট বসিয়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৪। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে অপ্রয়োজনীয় জনচলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে। প্রয়োজনে কারফিউ জারি করতে হবে।

৫। ঢাকায় ও বিভাগীয় শহরগুলোতে একাধিক এবং জেলা শহরগুলোতে কমপক্ষে একটি করে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের কাজ শুরু করে দিতে হয়ে এই মূহুর্তেই, যাতে এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব ফিল্ড হাসপাতাল কাজ শুরু করতে পারে।

৬। জনসাধারণ, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যারাই এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করবেন তাদের তাৎক্ষণিক জরিমানা করতে হবে। এই জরিমানা আদায় দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তা নিশ্চিত করবেন। এ জন্য সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে।

৭। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ করতে চেয়েছিল ঠিক তেমনি একদল মুনাফাখোর মজুতদার সক্রিয় রয়েছে এই ভয়াবহ জনদুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে বাজারে ভোগ্য পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যেম মুনাফা লাভে। তাতে জনাতংক সৃষ্টি হয়ে প্যানিক বায়িং এর কারণে ‘ফিজিক্যাল ডিস্টেসিং’ প্রয়াস ব্যহত হবে। তাই এদেরকে সরকারিভাবে নব্য রাজাকার আখ্যায়িত করে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। সেনাবাহিনীকে স্পট চেকের মাধ্যেমে এসব মজুতদার ও মুনাফাখোরদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে সীল করে দেয়া, গ্রেফতার ও জরিমানা আদায়ের নির্বাহী ক্ষমতা দিতে হবে।

কারো কাছে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব মনে হতে পারে। বিষয়টি মোটেও তা নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশ প্রায় নয় মাস অঘোষিত লক ডাউনে ছিল। তখন যদি সম্ভব হয় এখন তা মোটেও অসম্ভব নয়। একবার ফিলিস্তিনিদের কথা ভাবুন, যারা ১৯৪৮ সাল থেকে কখনো আংশিক আবার কখনো পূর্ণাঙ্গ লক ডাউনে আছে। একবার সিরিয়ার কথা ভাবুন। ধরে নিতে হবে, আমাদের অস্তিত্ব যেমন ১৯৭১ সালে হুমকির মুখে ছিল এখন তেমনটাই হুমকির মুখে। আপাততঃ এই ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের জন্য প্রযোজ্য হোক। এর পরিবর্ধন, পরিমার্জন এবং সংকোচন কিংবা প্রত্যাহার নির্ভর করবে এই দুই সপ্তাহের পরিস্থিতির উপর।

১৯৭১ সালে আমরা শারীরিক নৈকট্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিলাম। এবারে তার চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী একটি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে। উপরের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হতে পারে সেই যুদ্ধ জয়ের কার্যকর মারণাস্ত্র। সরকার যত শীঘ্র এই অস্ত্র আমাদের হাতে তুলে দেবেন যুদ্ধটা ততোই সহজ হবে। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।

আহমেদ শরীফ শুভ : 
চিকিৎসক, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। 
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]