ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০ ১৮ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০

বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু
আনিসুর রহমান দিপু
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতি-রাষ্ট্র গঠনের প্রাকমুহূর্তগুলো ছিল খুবই ঘটনাবহুল। সেই ঘটনার পরতে পরতে লেখা রয়েছে জাতি হিসেবে বাঙালির অভিনিবেশের এক মর্মন্তুদ উপাখ্যান। যে উপাখ্যানে শোষণ, বঞ্চনার ইতিবৃত্তের ভেতর ছিল আরও নানামুখী অপতৎপরতার অমার্জনীয় ঘটনাপ্রবাহ।
১৯৪৭-এর দেশভাগের আগে এ উপমহাদেশে এক অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। দেশভাগের মধ্য দিয়ে স্পষ্টীকরণ হয় জাতি-ধর্মের বিভাজন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এই বিভাজনের ছায়া ধীরে ধীরে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী প্রয়োগের পন্থা অবলম্বন করে। যার বিষবাষ্প সমাজের নানা ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করতে থাকে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাঙালি সমাজ এই সাম্প্রদায়িকতার কালো অধ্যায়ের স্রোতে গা ভাসায়নি। বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ এই বিভাজনের রাজনীতিকে ‘৪৮-এ এসেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’-এর মর্মে ছিল সেই অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের দর্শন। এই দর্শন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারিতে রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপানে পা রাখে। ২১ ফেব্রæয়ারি বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দেয় স্বাধিকার আন্দোলনের দ্বারপ্রান্তে। ’৬২-তে ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬-তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত ছয় দফা, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, গণআন্দোলন ও তৎপরবর্তীতে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্ত করে আনা, ’৭০-এর জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ ছিল বাঙালির আত্ম নিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার চ‚ড়ান্ত ইচ্ছা পোষণের উজ্জ্বল সিদ্ধান্ত। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী জনগণের এ রায়ের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র করতে থাকলে বাঙালি ফুঁসে ওঠে। রাজপথে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর হাতে ন্যস্ত না করে তা কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭১-এর জানুয়ারি, ফেব্রæয়ারি এবং মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শাসক গোষ্ঠী বাঙালির দাবিকে উপেক্ষা অবজ্ঞায় পার করার পথ বেয়ে আসে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণ আজ বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক সংরক্ষিত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি হলো বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ওই ভাষণ। যে ভাষণে বা বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার পর বাঙালি জাতি স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। পক্ষান্তরে শাসক গোষ্ঠীও বাঙালির ওপর মরণ ছোবল হানতে মরিয়া হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাহাজ বোঝাই করে মারণাস্ত্র, গোলা-বারুদ এনে পূর্ব পাকিস্তানে মজুদ করতে থাকে। পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিশাল একটি অংশকে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসে মোতায়েনের লক্ষ্যে বাঙালি সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করারও নানা রকম অপকৌশল গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষাপটে বাঙালি সেনাসদস্যরাও পূর্ব থেকেই অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেই নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে।
অপরদিকে রাজনীতির ময়দানে চলতে থাকে নানা কলাকৌশল। শাসক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রæতির কথা ব্যক্ত করলেও নানাভাবে সময় ক্ষেপনের পথ অবলম্বন করে। এদিকে বঙ্গবন্ধুও গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় গোপন বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধুকে কারাবন্দি করা হলে কোন নেতার কী ভ‚মিকা হবে তা নির্ধারণ করে দেন। এভাবে ৭ই মার্চের পর থেকে একটা গুমোট ভাব সারা দেশে চলতে থাকে। এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন, ব্যাংক, বীমা, কল-কারখানা, অফিস, আদালত, বেতার, টেলিভিশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র। অবশেষে বাঙালির সামনে আসে ২৫ মার্চের কালরাত। যে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে রাতের অন্ধকারে গণহত্যায় মেতে ওঠে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক বাড়িঘরেও চালায় নির্বিচারে গণহত্যা। ২৫ মার্চ রাতের ক্র্যাকডাউনের এক ফাঁকে ২৬ মার্চ ভোররাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় স্বাধীনতার মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এর অব্যবহিত পূর্বেই ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত ইশতেহারটি গোপনে প্রচারের জন্য হস্তান্তর করেন।
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী বাঙালি জাতি এক নতুন ইতিহাসের পথে পা বাড়ায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে পুরো জাতি ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ছিনিয়ে আনে লাল সবুজে আঁকা বাংলার নতুন পতাকা। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি। ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বিশ^নেতাদের চাপে পাকিস্তানের মিলানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে একটি বিশেষ বিমানে করে পাকিস্তান থেকে লন্ডন-ভারত হয়ে, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মাটিতে পা রাখেন। ঢাকার তেজগাঁওয়ের বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে আরোহণকারী বিশেষ বিমানটি অবতরণের পর বিমানের দরজা খুলে তিনি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ^াস নেন। তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি গলিয়ে নেমে আসেন তাঁরই নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকা বিমানবন্দরের যুদ্ধবিধ্বস্ত রানওয়েতে। সে এক অভ‚তপূর্ব দৃশ্য। তার চোখের কোণে রুপালি অশ্রæর কণা। বিমানবন্দরের লাউঞ্জে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষারত। ওই দৃশ্য যারা সেই ১০ জানুয়ারি প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা একই রকম দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন একই বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ১৯৮১ সালের ১৭ মে। সেদিনটি ছিল অনেক বেদনার এবং অনেক দুঃখের। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে যিনি তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন হারানোর শোকার্ত চোখের পানি সংবরণ করেছিলেন অনেক কষ্টে। যে নেতা যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ১০ জানুয়ারি বীর বাঙালি জাতির মহান নেতার উপাধি ধারণ করে স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করেছিলেন, সেই নেতাকে ১৯৭৫ সালে ঘাতকের দল সপরিবারে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। ভাগ্যচক্রে সে সময়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা ছিলেন বিদেশে। শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন ছোটবোন শেখ রেহানাও। তাই তারা প্রাণে বেঁচে যান। সবে মাত্র বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। ঠিক সেই সময় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
নির্মম এই করুণ উপাখ্যানের গল্পগাথা মনে করে বাঙালি জাতি আজও আবেগাপ্লুত হয়। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানি ভাবধারায় তথা ’৭১-এর পূর্ব চিন্তা-চেতনায় পরিচালিত করতে থাকে। এভাবে প্রায় ২১ বছর দুই সামরিক জান্তা এবং তাদেরই এক উওরাধিকার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করার পর ১৯৯৬ সালে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্রমশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে শুরু করে। মাঝে ২০০১-২০০৭ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত গণতন্ত্রের মানসকন্যা, জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এক অভ‚তপূর্ব উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলেছে। বিশ^ দরবারে বাংলাদেশ আজ এক পরিণত জাতিসত্তার স্পন্দন বুকে ধারণ করে আছে। আর যার দৃঢ় ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে এটি হয়েছে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাঙালি ও বাংলাদেশ আজ এক পরিশীলিত নাম।
আজ আমরা পালন করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। যদিও বাঙালির আবেগ জড়িয়ে থাকা এই উৎসবটি সীমাবদ্ধভাবে উদযাপন হয়েছে। এর পেছনেও রয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তা-চেতনা। বিশ^ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। দেশের মানুষকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতেই জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ আকারে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। জাতির পিতাকে নিয়ে বাঙালির আবেগের চেয়ে মানুষের নিরাপত্তাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের দৃঢ়তা এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে শিগগিরই আমরা এই সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাব। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সুযোগ দেবেন মুজিববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালনের পর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের।

ষ আইনজীবী, রাজনীতিক








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]