ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০ ১৮ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০

করোনা মহামারী ও কোরআনের বাণী
আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করুন
আমিন ইকবাল
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 86

বিশ্ব জুড়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে করোনাভাইরাস। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে পৃথিবীবাসী। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ দেশে করোনাভাইরাস আক্রমণ করেছে। আক্রান্ত হয়েছে তিন লাখেরও বেশি মানুষ। নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৬ হাজার। পরিস্থিতি বলছে, আরও ভয়াবহ হবে এর পরিসংখ্যান। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ইতালি। তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। সব ধরনের অক্ষমতার কথা স্বীকার করে আকাশের মালিকের সাহায্যের প্রতি তাকিয়ে রয়েছে। একই অবস্থা অন্যান্য রাষ্ট্রেরও। বিশে^র পরাশক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য পর্যন্ত ক‚লকিনারা পাচ্ছে না! এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধই তৈরি করতে পারেনি চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর মানুষ মানতে বাধ্য হচ্ছেÑ কতটা নিরুপায় ও অসহায় আমরা!
করোনাভাইরাস আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার শাস্তি। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তার হুকুম অমান্য করে, ইবাদত-বন্দেগির বদলে পৃথিবীতে পাপাচার ও অশ্লীলতা করে বেড়ায়, অন্যায় অবিচার করেÑ তখন আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকে অদ্যাবধি মহান রবের শাস্তি নানা যুগে নানা পন্থায় এসেছে। কখনও প্লাবনের মাধ্যমে পুরো জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছে, কখনও ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে, কখনও জনপদকে উপুর করার মাধ্যমে, কখনও মাটি চাপা দিয়ে, কখনও পাহাড়র উল্টিয়ে, কখনও ভ‚মিকম্প দিয়ে, কখনও পশু-পাখির আক্রমণ দিয়ে, কখনও বা মহামারী ইত্যাদি মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দিয়ে থাকেন।
১৪৫০ বছর পূর্বে নাজিল হওয়া পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সেসব কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন। নবীজির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, পূর্ববর্তী মানুষদের আল্লাহ নানা সময় তাদের অপরাধের কারণে শাস্তি দিয়েছেন। যেমনÑ সুরা ইউনুসের ১৩নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিল।’
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘তারপর প্রবল বন্যার পানি তৈরি করলাম এবং ফসলি জমিগুলো পরিবর্তন করে দিলাম। অকৃতজ্ঞ অহঙ্কারী ছাড়া এমন শাস্তি আমি কাউকে দিই না।’ সুরা ইয়াসিনের ২৮ ও ২৯নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারপর তাদের বিরুদ্ধে আমি আকাশ থেকে কোনো সেনাদল পাঠাইনি। পাঠানোর কোনো প্রয়োজন‌ও আমার ছিল না। শুধু একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, আর সহসা তারা সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল (মৃত লাশ হয়ে গেল)।’ সুরা আরাফে তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি এই জাতিকে পোকামাকড় বা পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত, প্লাবন ইত্যাদি দ্বারা শাস্তি দিয়ে ক্লিষ্ট করি।’ (আয়াত ১৩৩)। ‘এবং এসব মিথ্যার ওপর আশ্রয়গ্রহণকারী জালিমরা অর্থাৎ কাফিররা বলেছিল, আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করব। অন্যথায় তোমার আমাদের মতাদর্শে ফিরে এস। তারপর আল্লাহ অহী পাঠালেন, আর বললেন আমি অবশ্যই জুলুমকারী শক্তিগুলোকে সমূলে বিনাশ করে দেব।’ (সুরা ইব্রাহীম : আয়াত ১৩)।
তিনি আরও বলেন, ‘অতঃপর যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে উপদেশ এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো, তারা তা ভুলে গেল (আল্লাহর কথাকে তুচ্ছ ভেবে প্রত্যাখ্যান করল) তাদের এই সীমা লঙ্ঘনের পর আমি তাদের জন্য প্রতিটি কল্যাণকর বস্তুর দরজা খুলে দিলাম অর্থাৎ তাদের জন্য ভোগ-বিলাসিতা, খাদ্য সরঞ্জাম, প্রত্যেক সেক্টরে সফলতা, উন্নতি এবং উন্নয়ন বৃদ্ধির দরজাসমূহ খুলে দিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন তারা আমার দানকৃত কল্যাণকর বস্তুসমূহ পাওয়ার পর আনন্দিত, উল্লসিত এবং গর্বিত হয়ে উঠল, তারপর হঠাৎ একদিন আমি সমস্ত কল্যাণকর বস্তুর দরজাসমূহ বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দরজাসমূহ বন্ধ করে দিলাম। আর তারা সেই অবস্থায় হতাশ হয়ে পড়ল। তারপর এই অত্যাচারী সম্প্রদায়ের মূল শিকড় কর্তিত হয়ে গেল এবং সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্যই র‌ইল, যিনি বিশ^জগতের কেন্দ্রীয় ভ‚মিকা পালনকারী বা সব কিছুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী ‘রব’। (সুরা আনআম : ৪৪-৪৫)
এমন অসংখ্য আয়াত নাজিল করে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বোঝাতে চাইলেন, তোমরা পূর্বের মানুষদের পরিণতি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা কর এবং নিজেরা অনুধাবন কর যে, আমি কীভাবে অস্বীকারকারী ও জুলুমকারীদের ধ্বংস করেছি। একই সঙ্গে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা কি ভাবনা মুক্ত হয়ে গিয়েছ যে, আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের সহ ভ‚মিকে ধসিয়ে দেবেন না?
অথবা তোমাদেরকে ভ‚গর্ভে বিলীন করে দেবেন না? এমন অবস্থায় যে ভ‚ভাগ তথা জমিন (আল্লাহর নির্দেশে) আকস্মিকভাবে থরথর করে কাঁপতে থাকবে বা ভ‚মিকম্পকে চলমান করে দেওয়া হবে। নাকি তোমরা ভাবনামুক্ত হয়ে গিয়েছ যে, আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমদের ওপর কংকরবর্ষী ঝঞ্ঝা বৃষ্টি কিংবা প্রস্তর বৃষ্টিবর্ষণ করার হুকুম দেবেন না? (যদি আমি এমন করার হুকুম করি) তখন তোমরা জানতে পারবে বা উপলব্ধি করবে, কেমন ছিল আমার সতর্ক বাণীর পথ-নির্দেশ।’ (সুরা মূলক : ১৬-১৭)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি ভাবনামুক্ত হয়ে গিয়েছে সেই আল্লাহর বিষয়ে যে, তিনি তাদের ওপর ঘুমন্ত অবস্থায় শাস্তি পাঠাবেন না? যে শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে! নাকি জনপদের অধিবাসীরা চিন্তামুক্ত হয়ে গিয়েছে এই বিষয়ে যে, আমি তাদের ওপর শাস্তি পাঠাব না, এমন অবস্থায় যে যখন তারা আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত ছিল?’ (সুরা আরাফ: ৯৭-৯৮)। ‘যারা কুচক্র বা কুকর্ম করে বা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, অবিচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা কি চিন্তা মুক্ত হয়ে গিয়েছে যে ‘আল্লাহ’ তাদেরকে সমূলে বিনাশ করে দেবেন না কিংবা তাদেরকে ভ‚গর্ভে বিলীন করে দেবেন না? কিংবা তাদের ওপর এমন সবদিক থেকে বিপদ বা শাস্তি এনে হাজির করানো হবে না, যে দিকগুলোর বিষয়ে এর আগে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না?’ (সুরা নাহল : আয়াত ৪৫৪৭)
এই যে কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা, তবুও কি মানুষের জ্ঞান হয়েছিল? পৃথিবীব্যাপী যে চিত্র দাঁড়িয়েছিল আল্লাহর নাফরমানি করার ক্ষেত্রেÑ যেন সবাই উদাস হয়ে গিয়েছিল! আল্লাহ যে একজন আছেনÑ মানুষ ভুলেই গিয়েছিল। সবাই ব্যস্ত পৃথিবী নিয়ে। টাকা-পয়সা আর বাড়ি-গাড়ি নিয়ে। কে কাকে মেরে বড় হতে পারে, কার সম্মান বেশি, কার ক্ষমতা বেশিÑ যেন এসবের প্রতিযোগিতা চলছিল বিশ^ জুড়ে। আর আল্লাহও তাদের সুযোগ দিয়েছিলেন; যেন তাদের অপরাধের পাল্লা ভারী হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘আমি জালিমদেরকে সুযোগ দিই বা বেঁচে
থাকার সময় দেই, তাদের পাপকে পাকাপোক্ত করার জন্য। (এই বেঁচে থাকার সুযোগে তারা নিজেদের পাপের বোঝা বা পরিমাণকেই বৃদ্ধি করে থাকে) অতঃপর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন অপমানকর শাস্তি।’ (সুরা আল-ইমরান: ১৭৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আমি বহু জনপদকে এমন অবস্থায় বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছিলাম যে তারা ছিল অপরাধী, সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। তারপর (নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর) আমি তাদেরকে পাকড়াও করি।’
আল্লাহর পাকড়াও যখন চলে আসেÑ তখন কিছুই করার থাকে না। মানুষ বুঝে ওঠার আগেই ধ্বংস হয়ে যায় জনপদের পর জনপদ। পবিত্র কোরআনের ২৯নং সুরার ৫৩নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা জালেম তাদের ওপর চ‚ড়ান্ত শাস্তি আসবে আকস্মিকভাবে, যেন তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।’
আল্লাহর শাস্তি যখন এসে যায়Ñ মানুষের পক্ষ তা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশে^র অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছেÑ করোনাভাইরাসের মাধ্যমে মহান প্রভু তার নাফরমান বান্দাকে শাস্তি দিচ্ছেন; আর ঈমানদারদের জন্য রেখেছেন ধৈর্যের পরীক্ষা। কোরআনে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের ওপর রোগব্যাধি, অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা চাপিয়ে দিয়েছিলাম, যেন তারা আমার কাছে নম্রতাসহ নতি স্বীকার করে।’ (সুরা আন‌আম : ৪২)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান-মালের ক্ষতি এবং ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে পরীক্ষা করব। তবে তুমি ধৈর্যশীলদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা : ১৫৫)
তাই আসুন, এই বিপদে আমরা মহান রবের দরবারে আত্মসমর্পণ করি, নিজের কৃতকর্মের জন্য তওবা করি এবং আল্লাহর সব বিধান মেনে চলি। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সাহায্যকারী নেই আমাদের। তার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]