ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৯ এপ্রিল ২০২০ ২৫ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৯ এপ্রিল ২০২০

সে এক অন্য ধরনের ছুটির ফাঁদ
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২০, ১০:৫৬ পিএম আপডেট: ২৬.০৩.২০২০ ১২:১৫ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 15

আমিনুর বেশ খোশ মেজাজে রিকশা চালাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সে বুধবার দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য সরকার যেখানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা লকডাউন করল। দূরপাল্লার বাস থেকে লঞ্চ, ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে আমিনুর সাহস করে তার নিজ জন্মভূমি নীলফামারী যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল। কেন সে এ সময় দেশে যাবে? এ প্রশ্নে তার পাল্টা প্রশ্ন, ঢাকায় থেকে কী করব? থাকি মেসে আর খাই হোটেলে। কিন্তু মেসের সবাই চলে গেছে। আর হোটেল তো বন্ধ। এর চেয়ে বড় কথা, প্যাসেঞ্জার নেই। রাস্তা সব ফাঁকা। খ্যাপ পাব কোথায়?
গাইবান্ধার মো. মমিনুল ইসলাম ঢাকায় এসেছিল রিকশা চালাতে। কিন্তু এখন রাস্তাঘাটের যে অবস্থা তাতে আর মন কিছুতেই সায় দিল না থাকার। ঢাকা ছেড়ে চলে গেল মঙ্গলবার মধ্যরাতে। যেতে কষ্ট হলেও সে মনের সাহসে চলে গেল। মারুফ মার্কেটের আউয়াল একজন ব্যস্ত কম্পিউটার অপারেটর। মার্কেট বন্ধ হওয়ার কথা শুনেই সে তার বাড়ির পথে পথ ধরেছে। আবদুল আজিজ একই মার্কেটের আরেক ব্যস্ত কম্পিউটার অপারেটর। তার ব্যস্ততার কাছে সবাই হার মেনে যায়। কিন্তু কষ্ট হলেও ঢাকা ছাড়ল।
শফিকুল ইসলাম দিব্যি রিকশা চালাচ্ছিল। হঠাৎ করোনার আতঙ্ক পেয়ে বসল। কাউকে না জানিয়ে সে ঢাকা ছাড়ল। পুরানা পল্টনে কালিজিরা বিক্রি করছিল। আয় হতো প্রতিদিন ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। কিন্তু ঢাকা শহরের পরিস্থিতি দেখে তার মন আর সায় দিল না। কষ্ট হলেও তাকে ঢাকা ছাড়তে হলো।
সে অন্ধ মাকে নিয়ে রামপুরায় থাকত। কষ্ট করে দিন যাপন করত। কিন্তু এক ধরনের অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসল। হঠাৎ করেই সে চলে গেল। মোহাম্মদপুরের নাজমুল সারা দিন রিকশা চালাত। কম টাকা আসত না। কিন্তু করোনার কথা শুনে সে গ্রামে চলে গেল। শাহজাহানপুরের শাকিল আর সোহান লেপ-তোশকের কাজ করে। ভালোই চলছিল তাদের দিনকাল। কিন্তু তাদের বাড়ি থেকে রীতিমতো তলব করে বসল। বাধ্য হয়ে ঢাকা ছাড়ল।
বাংলামোটরে বসবাস করে বেশ কয়েকজন রাজশাহীর রাজমিস্ত্রি। তারা প্রতিদিন অনেক দূরে গিয়ে কাজ করত। কিন্তু তাদের আর কাজ
করা হলো না। যেখানে কাজ করত তারাই কাজ বন্ধ রাখতে বলেছে। বাধ্য হয়ে তারা দল বেঁধে ঢাকা ছাড়ল। এ বাংলামোটরের ধারে কাছের ঢালে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট হোটেল ছিল। কর্মমুখর ব্যস্ততার দিনে তাদের খদ্দেরের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু লকডাউনের কথা শুনে হোটেলের বয় আর বাবুর্চি আর ঢাকা থাকতে চাইল না। বাধ্য হয়ে হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে গেল।
যারা বাড়ি গেল তাদের এ যাওয়া সুখকর নয়। এ যাত্রা তাদের জন্য শুভ হলো না। ঈদের ছুটিতে যখন সবাই দল বেঁধে গ্রামের বাড়িতে যায় তখন এক ধরনের আনন্দ বয়ে নিয়ে যায়। ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতেই তাদের এ আনন্দ যাত্রা। কিন্তু দল বেঁধে গ্রামের বাড়িতে এ যাওয়া যেন অন্য ধরনের যাত্রা। কারও কারও মনে ভয় আর আতঙ্ক কাজ করছে বলে জানা গেছে।
সরকার করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অফিস আগামী ৪ এপিল পর্যন্ত বন্ধ, স্কুল কলেজ বন্ধ, শপিংমলসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক পদক্ষেপে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু অনেকে এ ছুটিকে অন্য ধারণায় নিজ দেশের বাড়ি যাওয়ার প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউনে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও যাত্রা থেমে নেই। এমনকি সরকারি অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ঢাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
আজ দেশ জরুরি প্রয়োজনে ছুটির ফাঁদে পড়ছে। এ ছুটি অনেকের কাছে সুখকর নয়। এরপরও মানুষ ছুটছে তার আপন গ্রাম। আজ থেকে ঢাকা শহরের চিত্র একেবারে পাল্টে যাবে। কোলাহলমুখর ঢাকা নিঃশব্দের শহরে পরিণত হবে। দোকানপাট বন্ধ, কাঁচাবাজার খোলা থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা হবে অনেক কম। ওষুধের দোকান হয়তো খোলা থাকবে। কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা হবে হয়তো অনেক কম। হোটেল-রেস্তোরাঁ কোলাহল থেমে যাবে। পাড়া-মহল্লায় ছোট চায়ের দোকানে আড্ডার চিত্র হয়তো দেখা যাবে না। রাস্তা অজগর সাপের মতো পড়ে থাকবে চিত্রকল্প হিসেবে। গাড়ির সে হর্ন শোনা যাবে না। ঢাকার চিত্রপট একেবারে পাল্টে যাবে এ কথা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
নাগরিক জীবনে এবার প্রথম এক অন্য ধরনের ছুটির ফাঁদ। সেখানে বন্দি জীবনের কথাই মনে করিয়ে দেবে। ছুটি পেয়েও অনেকে হয়তো তার নিকট আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যেতে পারবে না। পারবে না ছুটির স্বাদ নিতে। এরপরও এ ছুটির ফাঁদ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]