ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০ ১৮ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ৩ এপ্রিল ২০২০

স্বাধীনতা মানে জয় বাংলা ও মুক্তির সংগ্রাম
খোকন সাহা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২০, ১১:৩৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 13

১৯৭১-এর মার্চের টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগে ২৫ মার্চে গণহত্যা সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পোড়ামাটি নীতির প্রতিফলন ঘটায়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামরিক জান্তাদের ইতঃপূর্বেকার পূর্ব পাকিস্তান প্রসঙ্গে ব্লু-প্রিন্ট প্রণয়ন করার মাধ্যমে। একটি জাতিকে চিরতরে নির্মূল করার নীল নকশায় পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা নৃশংসভাবে বাঙালি নিধনের মাধ্যমে কার্যকর করার ভয়াবহ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে পা বাড়ায়। ২৫ মার্চ ছিল সেই পোড়ামাটি নীতির প্রথম নির্মমতা। ভয়ঙ্কর সেই নির্মমতার ভয়াবহতা ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল অত্যন্ত কাছ থেকে।২৫ মার্চ যারা ঢাকার সেই ক্র্যাকডাউনের মুখোমুখি হয়ে জীবন বাঁচিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তাদের স্মৃতিচারণে ২৫ মার্চের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের নানা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে করুণ বয়ানে। এর আগে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর সর্বস্তরের বাঙালি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্যোগ নিলেওÑ পাকিস্তানি আর্মির ট্যাঙ্ক, কামান আর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের কাছে তুচ্ছ হলেও জাতি হিসেবে বাঙালি যে বীর জাতি হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ক্রমশ যুুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল এবং বীরত্বের সঙ্গে রণাঙ্গনে পাকিস্তানি আর্মিদের পরাভূত করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিল। সে জ¦লজ¦লে ইতিহাস আজ বিশে^ এক বিরল উদাহরণ হয়ে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসরের চিন্তা যেমন মাথায় রেখেছিলেন, একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন যেন তাকে গ্রেফতার করা হলে বাঙালি জাতি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পক্ষান্তরে, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। যার অকুতোভয় উচ্চারণ ৭ মার্চের ভাষণেই উদ্ধৃত্ত ছিল। এবং তার নির্দেশ অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং জেলা ও মহকুমা, থানা, ইউনিয়ন, পাড়া-মহল্লা পর্যায়ের নেতারাও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। ২৬ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি আর্মি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং কারাগারে বন্দি করে রাখে। ১৯৭১-এর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি ছিলেন সেই কারাগারে বন্দি।
’৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পাকিস্তান শাসনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা
থাকলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণতান্ত্রিক ধারার বিপরীতে বাঙালিকে যুদ্ধের দিকে শুধু ঠেলেই দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধে নির্বিচারে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর, তরুণ-তরুণীদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
এর বিপরীতে সাধারণ বাঙালি, পুলিশ, সামরিক, আধা সামরিক, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করার লক্ষ্যে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিকামী সাধারণ বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে গিয়ে অস্ত্র চালনার ট্রেনিং নিয়ে আবার দেশে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। ইতোমধ্যে ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধকে ‘স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ’ এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক চ্যানেলে যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে যখন এ যুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, দুষ্কৃতকারীদের যুদ্ধ বলে বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ের উদ্যোগ নেয় তখন বরাবরের মতো তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সব উদ্যোগ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন দিলেও সে দেশের জনগণ এবং গণমাধ্যমগুলো ছিল বাংলাদেশ এবং বাঙালির প্রতি অসম্ভব সহমর্মী।
ইতঃপূর্বে ছয় দফা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্নময় পথে পা ফেলার যে মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ১৯৬৯-এ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন একটা চূড়ান্ত রূপ রেখায় উপনীত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি যে শোষণ-শাষণের দুঃসহ সময় পাড় করছিল। বঙ্গবন্ধু সে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, দেখিয়েছিলেন স্বাধিকারের, সার্বভৌমত্বের মহৎ আলোক রেখায় একটি স্বাধীন স্বদেশ ভূমির সূর্যোদয়ের অভিস্পৃহা এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ছিল যার মূলমন্ত্র। একটি আকাক্সক্ষার স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় ১৯৭০-এর নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুুশ জয় লাভের মাধ্যমে। আর এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের পথটি সুগম হয় বঙ্গবন্ধুর জন্য। কিন্তু পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এ বিজয়কে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয় এবং বঙ্গবন্ধুর হাতে পাকিস্তানের শাসনভার ন্যস্ত করার পরিপ্রেক্ষিতে সময়ক্ষেপণের পথ অনুসরণ করে। নির্বাচনোত্তর প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া বাঙালির ওপর দমন-পীড়নের পথে পা বাড়ায়। ইতোমধ্যে দাবানলের মতো সারা বাংলায় আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সমগ্র বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসক চক্রের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজন জনসভার। ওই জনসভার মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য শোনার জন্য লাখ লাখ বাঙালি জনসভাস্থলে সমবেত হয়। এবং সেই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে এ বলে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। অতঃপর বাঙালি ক্রমশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানি হানাদারদের গোলাবারুদসহ বাংলাদেশে সমাবেশ ঘটাতে থাকে। অন্যদিকে বাঙালি জাতিও সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ যুদ্ধাবস্থায় চলে আসে। সারা বাংলা মার্চে উত্তাল হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানি শাসকচক্র ২৫ মার্চ গভীর রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট নামে ক্র্যাকডাউন করে বিপুল পরিমাণ নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ২৫ মার্চের গণহত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও এক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তেমনি ১৯৭১-এর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি আরও এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে বিগত ৪৯ বছর ধরে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। এরপর ৯ মাসের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় বরণ করে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকা খচিত নতুন একটি দেশের সার্বভৌমত্ব অঙ্কিত হয়, যার নাম বাংলাদেশ।

ষ আইনজীবী




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]