ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০ ২২ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০

প্রয়োজনে লকডাউন ঘোষণা
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০, ১১:০৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

করোনাভাইরাস যত না আতঙ্কের তার চেয়েও বেশি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গুজবের মাত্রাহীন প্রচার। সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ফিরছে মোবাইল আর তার কারণেই মুহূর্তের মধ্যে তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে খবরের পর খবর। যার মধ্যে এমন সব উদ্ভট সব খবর প্রচারিত হচ্ছে যাতে আতঙ্ক আরও বাড়ছে। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। অনেকে বলে থাকেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদেরকে অনেক নতুন নতুন খবর দেয়। জ্ঞান বাড়ায় বিভিন্ন বিষয়ে। কিন্তু কখনও কখনও মূর্খরাও যখন তাদের ইচ্ছেমতো জ্ঞান দিতে থাকে তখন আপনার সত্যিকার জ্ঞানও বিভ্রান্ত হবে। ভয়টা সেখানেই। যেমন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে করোনাভাইরাস সম্পর্কে কত যে কথা আর তথ্য পাওয়া যায় ফেসবুকে তার কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, বোঝাই দুষ্কর হয়ে পড়ে। নানা ধরনের গুজবের পেছনে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষদের স্বার্থ থাকে। তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার একটা মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে বিশ^াসযোগ্যভাবে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া। এই তো কয়েক মাস আগে গুজবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে লবণের গুদাম সাফ করে ফেলল ব্যবসায়ীরা দুয়েক দিনের মধ্যে। এখন যেমন চাল ডাল কিনে মজুদ করে রাখার প্রবণতা বেড়ে গেল গুজবের কারণে। ত্রিশ টাকার পেঁয়াজও আবার উঠে গেল পঞ্চাশ টাকায়।
ওদিকে বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। অথচ চাল ডালের কিছু মাত্র সঙ্কট নেই বাজারে। হুজুগের কেনা দুই চার পাঁচ দিনে শেষ হয়ে গেলেই আবার এই দাম কমে যথাস্থানে চলে আসবে। তবে ব্যবসায়ীরা সব সময়ই চায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম সব সময় চড়া রাখতে। কী বিচিত্র আমাদের দেশের মানুষ। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা। দেশে চলছে প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণ। তাতে মানুষ মরছে, আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যেও সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে একটুও দ্বিধা নেই তাদের। আমাদের দেশেই এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর মানুষের অভাব নেই। সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট আর অসহায়তা নিয়েই এদের কারবার। ঈদের সময় মানুষের খুশিতে থাবা বসায় এরা। নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়ে নিজেরা খুশি হয়। সরকারি সংস্থাগুলোও এদের কাছে, এদের কৌশলের কাছে পরাজয় মানে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যারা উৎপাদন ও বাজারজাত করে তাদের বাহানার কোনো শেষ নেই মুনাফা বাড়াবার ক্ষেত্রে। এরা সুযোগ বুঝে সরকারকে বিভ্রান্ত করে নিজেরা তাদের পণ্যের দাম বাড়ায়, অন্যদিকে সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনাও নেয়। ফলে লাভের ওপর লাভ হয় দুদিক থেকে। এদেরকে দমন করাই এখন সরকারের অন্যতম জরুরি কাজ হওয়া উচিত। যাতে সাধারণ মানুষরা একটু শান্তিতে থাকতে পারে হাজারো অশান্তির মধ্যে। বিদেশফেরত, তাদের সংস্পর্শে আসা কেউ এদের ছাড়িয়ে যখন কোনো সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হবে করোনাভাইরাসে তখন বুঝে নিতে হবে এবারে সামাজিক পর্যায়ে ছড়াচ্ছে ভাইরাস। আর এই পর্যায়ের সংক্রমণই হবে সত্যিকার অর্থে ভয়ের কারণ এ পর্যায়ের আগেই কঠোরভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে দ্রæত সে অনেকটা জ্যামিতিক হারে আক্রান্ত করবে সাধারণ মানুষকে। তখন পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে পড়বে। জটিল হবে চিকিৎসাসেবা।
তাই এখনই যেভাবেই হোক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে করোনার বিস্তার। তার জন্য সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা সম্ভবত লকডাউন ব্যবস্থা। যে জায়গাকেই সন্দেহ হবে সে জায়গাকেই লকডাউন করা এখন একান্তই জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের ঘটনাটি আমাদেরকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সাদুল্যাপুরের ইউএনও যেখানে লকডাউনের কথা বলেছেন সেখানে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক কেন ব্যাপারটাকে অত হালকাভাবে নিলেন বোঝা গেল না। অন্তত কয়েকদিনের জন্য লকডাউন ব্যবস্থা ওখানে চালু থাকলে কার আর এমন কী ক্ষতি হতো ভালো ছাড়া। এখন ওখানকার অবস্থা যদি আরও খারাপ হয় তাহলে তার জন্য দায়ী হবেন কে? এ প্রশ্নের উত্তর দুই-চার দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
এদিকে আরও একটা বিষয় নিয়ে চিকিৎসকরা উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। বেশিরভাগ হাসপাতালেই দেখা গেছে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে দারুণ ঝুঁকির মধ্যে আছেন তারা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে যদি তেমন কোনো প্রয়োজন হয় যখন জরুরি ভিত্তিতে অনেককে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে তখন চিকিৎসকরা কি হাতের কাছে সবকিছু পাবেন নিজেদের নিরাপত্তাসহ? সরকারি তরফ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও যাতে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা। সবাই এখন দেখছেন ঢাকা শহর থেকে বাইরের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলাতে পর্যন্ত কোনো ধরনেরই হ্যান্ড স্যানিটাইজার জাতীয় কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে এসব দ্রব্যাদি কেন পাওয়া যাচ্ছে না তার কারণ সহজেই অনুমেয়। যে যেমন পারছে আগে ভাগে ফার্মেসিগুলো থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে হ্যান্ড ওয়াশ, মাস্ক, হ্যান্ড গøাভসসহ ডেটল স্যাভলন ইত্যাদি যতগুলো পেরেছে কিনে নিয়ে ঘরে মজুদ করেছে। এর পেছনেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভ‚মিকা কম নয়। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলেও আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয় নয় এই যে, এসব দ্রব্যাদি সাধারণ মানুষের অনেকটা জরুরি ভিত্তিতে কেনার প্রেক্ষিতে যে যেমনভাবে পেরেছে দাম নিয়ে নিয়েছে। এটাও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা করার সুযোগ নেয়। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কোনো লজ্জা নেই।
ইতোমধ্যে অনেক বিশেষজ্ঞই কিছু কিছু স্থানকে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করার পক্ষে কথা বলেছেন, এখনও বলছেন এই কারণে যে, প্রথম থেকেই সামাজিকভাবে যাতে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে না পারে। এই পূর্ব সতর্কতা একান্তভাবে এখনই অবলম্বন করা উচিত বলে সাধারণ মানুষও মনে করেন। টিভি টকশোগুলোতে যারা আসেন সবাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন, এটা তাদের কথা শুনলেই বোঝা যায়। এবং কথা প্রসঙ্গে নানা ধরনের উপদেশমূলক বক্তব্যও দেন।
আর প্রায় সবারই কথায় একটা বিষয় হয় যে, এখনকার এই করোনা আতঙ্ক দূর করার দায়িত্ব শুধু বর্তমান সরকারের। অভিযোগ, কেন সরকার সাধারণ মানুষ যা বোঝে তাও বুঝতে এত সময় নেয়? কেন এটা করা হলো না, ওটার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? ইত্যাদি। কিন্তু এখানে যে আরেকটা প্রশ্ন থাকে সেটা হলো, দেশে এত যে, রাজনৈতিক দল রয়েছে, যারা কখনও কখনও প্রয়োজনবোধে তাদের উপস্থিতির জানান দেয়, তারা দেশের মানুষের এই দুঃসময়ে কোথায়? শুধু মাঝে-মাঝ্যে কিছু বিবৃতি দিয়েই কর্তব্য শেষ করলেই কি হবে? এদেশের সাধারণ মানুষের আসলে দুর্ভাগ্যের আর বোধ হয় শেষ নেই।
আমরা বাঙালিরা সাহসী জাতি, সন্দেহ নেই, যথেষ্ট বুদ্ধিমানও। কিন্তু এবারে যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আমরা দিলাম, তার বোধ হয় কোনো তুলনা নেই। না হলে বারবার বলা এবং সতর্ক করা সত্তে¡ও ইতালিসহ অন্যান্য দেশ থেকে দেশে ফিরে আসা অনেকেই নিজেদের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করেছেন আগের মতো। কেউ কেউ গিয়েছেন শ^শুরবাড়ি, কেউ খেয়েছেন বিয়ের দাওয়াত। কেউ কেউ নিয়মিত বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। অথচ এদের সবাইকে দুই সপ্তাহ নিজ বাড়িতে অন্য সবার সংস্পর্শ ছাড়া থাকতে বলা হয়েছিল হোম কোয়ারেন্টাইনে। থাকলেন না কেন? বরং না থেকে নিজের পরিবারসহ বন্ধু-বান্ধবদের ফেললেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
আসলে অবস্থা অনুসারে এখন অনতিবিলম্বে কিছু কিছু জায়গা লকডাউন করাই প্রয়োজন। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে ইতোমধ্যেই পুরো দেশ লকডাউন ঘোষণা করেছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]