ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০ ২২ চৈত্র ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ২০২০

সকালের সূর্য
আজাদ মন্ডল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০, ১১:০৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

মাঘের শেষদিকের ঝলমলে সকাল। কমলালেবুর কোয়ার মতো সূর্যদেবের আলো। রাস্তার খুঁটিতে জড়ানো অসংখ্য অগোছালো তার আর জানালার প্রটেকশন গ্রিলে বাঁধা পেয়ে সূর্য আলোয় চাঁদের কলঙ্ক। আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তারপরও হালকা শীতে লেপের নিচে থাকার আরাম ব্যাহত হয় বুয়ার রান্নাঘরের টুংটাং শব্দে। প্রতিদিনই হয়। তবে, আমার না থাকলেও সবার ছুটির দিন নিজের মনে হয়। সেই রেশে ছুটির দিনে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে মন সায় দেয় না। কিন্তু সেই আরাম বা আলস্য বুয়া ঠিক বুঝতে চায় না। কিংবা তার হয়তো মনে থাকে না। সে টুংটাং শব্দের সাথে সারাক্ষণ একমনে নিজে নিজে কথা বলে কখনও হাসে কখনও বা গানের সুরে সুরে কাঁদে। তার মনোজাগতিক উথাল পাতাল আসলে যে কী, সেটা বুঝতে পারি না আমরা। বাঁধা বা বলেকয়ে বড়জোর একদিন বন্ধ করা যায়। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে আবার তার মুদ্রদোষের বাদ্যবাজনা শুরু হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের দশজনের মেসমেম্বারের একই। ফলে বিষয়টা পড়েছি মোড়লের হাতে খানা খেতে হবে সাথে এই প্রবাদের রেশে প্রায় প্রত্যেকেরই সয়ে গেছে। আরও বাড়িয়ে বললে বুয়া একদিন না আসলে তার মুদ্রাদোষের জন্যই বেশিরভাগ মেসমেম্বার একটা কিছুর শূন্যতা ফিল করে। সকলের সূর্যোদয়ের সাথে রিলেটেড বাইরের অসংখ্য হাঁকডাক ভ্যা-পু শব্দ লাগে লবণ ছাড়া তরকারির মতো। সেদিন কারও কারও অফিস যাওয়া লেটও হয়ে যায়।
আমার অফিস-আদালত নাই। লেখাপড়া শেষ করে আছি চাকরি নামক সোনার হরিণের দেনদরবারে। অতটা চাপও নাই। মাথার উপর ছায়া হিসেবে আছে বিদেশে চাকরিরত বড়ভাই। তাতে করে, যান্ত্রিক আর শাব্দিক নগরে সকালে কমলার কোয়ার মতো সোনা রোদের আলো মানবসৃষ্ট বাধায় কলঙ্কিত হলেও তা মনের সুখে গায়ে মাখি। অভিজ্ঞতা কুড়িয়ে বেড়াই এই ঘিঞ্জি নগরীর তৃণমূল মানুষের অন্তঃকোণের শস্যক্ষেতের। তাতে কখনও পেয়ে যাই সাহারা মরুভ‚মির অনন্ত হাহাকার, আবার কখনও আরাধ্য সুখ মেলে মরুভ‚মির বুকে অচিন বৃক্ষের ছায়ার মতো। আমার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বাড়ে। আমি সামাজিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনো এক অজানা তাড়াহুড়োয় আমাদের বুয়াযুগির মর্মমূলের সুখ-দুঃখ হিসেবের অঙ্ক এখনও আমার কষা হয় নাই। আজ না কাল, এভাবে কখনও মুগ্ধ আবার কখনও বিরক্ত হয়ে কেবল তার মুদ্রাদোষের পিঠে কান রেখে চলেছি ।
বুয়ার তালবেতাল মনোগত আবেগ আর মেসমেম্বারদের করপোরেট তাড়াহুড়োয় আমি সকালবেলা সাধারণত বাইরে বেরিয়ে পড়ি। তাতে করে, দুই ধরনের লাভ হয়। এক. বাথরুমের চাপ একজনের হলেও কমে, দুই. বাইরের রাস্তায় উজানমুখী কর্মজীবী মানুষের স্রোত দেখা যায়। এই তৃণমূল মানুষের তো আর শুক্র-শনি নাই। তাদের সাথে হাঁটা যায়। কথা বলা যায়। যা এক মনোগত আনন্দ বা গভীর কিছু ভাববার শিক্ষা পাই।
অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হোক আর রুমমেটদের করপোরেট ঝামেলা এড়িয়ে চলা হোক, রুম থেকে বের হয়ে গেটের দারোয়ানের প্রতিদিন কর্মলিপির ব্যতিক্রম চোখে পড়ে আজ প্রথমে প্রথম শ্রেণির ধাক্কা খেলাম। তার কানে হেডফোন গুঁজে মোবাইল ফোনে কথা বলা নাই! তার বদলে সে বসে আছে বিষণœ মুখে মাথায় মাফলার জড়িয়ে। এটা কী করে সম্ভব? পূর্বে তাকে যতবারই দেখেছি ততবারই ফোনে কথা বলা অবস্থায়। কৌত‚হল কম হয়নি। পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন মানুষ সারাক্ষণ ফোনে কথা বলে কার সাথে? আর এত কিসের কথা? এই কথা বলার জন্য সে মালিকের প্রায় প্রতিনিয়তই বকা খায়। একদিন তো এও শুনলাম, ‘মিয়া এই বয়সে আজাইরা পীড়িত বাদ দিয়া ঠিকমতো ডিউটি করেন, চাকরি চইলা গেলে ফোনে ইটিস পিটিস পাছার মধ্য দিয়া বার হইবো।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! পরের দিন থেকেই দারোয়ান কানে হেডফোন গুঁজে শুরু করে আগের মতো কথা বলা। বুয়ার মুদ্রাদোষের মতো দারোয়ানের ফোনে কথা বলার ব্যাপারটাও দীর্ঘদিনের হেতু আমার মগজে গেঁথে গেছে। আজকে তাকে কথা না বলতে দেখে সকালটা ওই লবণ ছাড়া তরকারির মতোই মনে হলো। মনে হলো গ্রাউন্ড ফ্লোরের পুরো জায়গাটা সূর্যের আলোর জন্য নয়, দারোয়ানের ফোনে কথা না বলার শোকে অন্ধকার, কিছুটা হলেও অসুখী।
দারোয়ানের সামনে যাওয়ার আগেই গেটের বাইরে হট্টগোলের শব্দ শুনে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। সরু গলির রাস্তা বিপরীতমুখী দুই রিকশার সংঘর্ষে চালকদ্বয়ের মধ্যে বিশ্রী ভাষায় গালাগালি। পাশ দিয়ে মেইন রোডের দিকে কর্মজীবী মানুষের আষাঢ়ের মেঘের মতো ঢল। পাশে দাঁড়িয়ে তিনটি কুকুর উপর দিকে মুখ তুলে অনবরত ঘেউ ঘেউ করছে। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে রিকশাচালকদ্বয়ের উচ্চস্বরে একে অপরের দোষারোপের জন্য নয়। ঘেউ ঘেউ করছে সামনে একতলার ছাদে একটি বানর দেখে। আমিও প্রতিদিন ওই একটি বানরকে দেখি। কোথা থেকে বানরটি দলছুট হয়ে এই গাছপালাহীন কংক্রিটের শহরে এসে পড়েছে কে জানে? কুকুরগুলোকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। কুকুরদের এলাকায় সে অহেতুক।
রিকশাওয়ালাদের বিপরীতমুখী গালিগালাজ নতুন মনে হলো না। এ ধরনের ঝামেলা প্রায়ই ঘটে। অসংখ্য রিকশা অসংখ্য রিকশাচালক সেই তুলনায় সরু আবার অসংখ্য খানাখন্দকে পুরো রাস্তার শরীর। ফলে হিসেবের কথা রিকশায় রিকশায়, রিকশায় গাড়িতে সংঘর্ষ কপালের লিখন না, হবেই। তবে সুখের কথা, এইসব ঝগড়া ফ্যাসাদ কুকুরদের ঘেউ ঘেউর মতোই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কুকুরদের যেমন রাস্তার মানুষ হুস হুস বা ঢিল মেরে তাড়িয়ে দেয়, রিকশাচালকদেরও তেমনি মানুষ মধ্যস্থতা করে কখনও বা নিজেদের তাগিদেই সরে পড়তে হয়, তা না হলে পিছনে লেগে যায় বিশাল বহরের জ্যাম।
আমি উজানমুখী মানুষের ঢলে মিশে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। আজ খুব একটা স্বস্তি পেলাম না। হতে পারে বুয়াকে নিয়ে বেশিক্ষণ চিন্তাভাবনা নতুবা গেটের দারোয়ানকে ফোনে কথা না বলতে দেখার জন্য। মেইন রোড পর্যন্ত যাওয়া হলো না। হুজুররা গলির মোড়ের এক কোনায় ছোট টেবিল বসিয়ে এতিমখানার জন্য মাইক দিয়ে টাকা তুলছে আর কিছুক্ষণ পরপর সুর করে গজল গাচ্ছে, ‘দে দে পাল তুলে দে, মাঝি হেলা করিস না, ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা।’ দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ গজল শুনলাম। অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেলাম না। গজলের কথা অনুযায়ী পাল তোলা নৌকায় কি আরব দেশে যাওয়া সম্ভব? অন্তঃকোণে প্রশ্ন আরও ঘনীভ‚ত হওয়ার আগে বিদায় নিলাম। এখন কোনো প্রশ্ন হুজুরদের করা যাবে না। সারা দিনের মধ্যে সকালবেলাটা ওনাদের টাকা কালেকশনের মোক্ষম সময়। এ সময় ডিস্টার্ব করাটা ঠিক হবে না।
আরেকটু এগুলেই চোখে পড়ল ইলেকট্রিক খুঁটির গোড়ার এক ভ্যানওয়ালা ক্যানভাসারকে। ভ্যানের উপর নানারকম ওষুদের ডালি সাজিয়ে টেপরেকর্ডার ছেড়ে দিয়েছে, ‘ চিপায়চাপায় ঘা, হাতে রানে ঘা, চুলকাইতে চুলকাইতে যারা জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলছেন, তারা আমাদের প্রচারগাড়ি লক্ষ করে চলে আসুন, লাগিয়ে দিন এই পাগলা মলম, দুই মিনিটে চুলকানি বন্ধ।’ ‘মাইরা ফ্যালান মাইরা ফ্যালান ছারপোকাগুলা মাইরা ফ্যালান, যাদের ঘরে ছারপোকা আছে তার চলে আসুন এই প্রচারমাইক লক্ষ করে, নিয়ে যান এই ওষুধ, ছারপোকা জনমের মতো বিদায়।’ এখানেও কিছুক্ষণ মনোযোগ দিলাম। তবে পাগলা মলম আর ছারপোকার ওষুধ কেনা হলো না। আমার চিপায়চাপায় কোনো চুলকানি আর ঘরে কোনো ছারপোকা নাই।
বাসার গেটে যখন ফিরে এলাম তখনও সামনের ছাদে বানরটা ঝিম মেরে বসে আছে। কুকুরগুলো নাই। বানরটির জন্য মায়া অনুভব করলাম। একটা জীবন তার চলে যাবে অথচ তার যেখানে মরার কথা সেখানে মরতে পারবে না। সারা জীবন পথ খুঁজতে খুঁজতে আর কুকুরের ধ্যাতানি খেতে খেতে চলে যাবে।
ঘোর কাটল দারোয়ানের কাশি শুনে। মুখটা তখনও বিষণœ। মালিক মনে হয় তার ফোনালাপ নিয়ে খুব করে বকা দিয়েছে। আমি কথা বললাম, চাচা মিয়া ভালো আছেন?
সে একবুক হতাশা নিয়ে উত্তর দিল, আর ভালো! গরিবের আবার ভালো মন্দ!
‘আপনার মোবাইল কি নষ্ট হয়ে গেছে?’
‘হ রে বাবা, কাইল টয়লেটে পইড়া গেছিল।’
‘আ হা, তাইলে তো আপনার কথা বলা বন্ধ।’
‘হ। মুখটা পাইনস্যা হইয়া আছে।’
‘এত কার সাথে কথা বলেন?’
‘এই প্রশ্ন সবাই করে রে বাবা। কাউরে কইবার পারি না। ’
‘আমাকে বলেন।’
‘আর কইও না বাবা। বহু চেষ্টাতদ্বির কইরা বুইড়া হইছে এক অসুখ্যা পোলা। হারা সময় অসুখ লাইগ্যাই থাহে। তাই একটু খোঁজখবর রাহি। ’
‘ও, তাই?’
‘দেহ না, তাই নিয়া কতজনে কতকিছু কয়।’
দারোয়ানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনে প্রথমের চেয়ে দ্বিগুণ ধাক্কা খেলাম। তবে কি এই গলি ধরে উজানে যাওয়া কর্মজীবী প্রত্যেক মানুষের চমকে দেওয়ার মতো ইতিহাস আছে? রাস্তায় টাকা উঠানো হুজুরদের? ক্যানভাসারের রানের চিপার খবর কী? তার ঘর কি ছারপোকামুক্ত? আর বুয়া? তার অনবরত কথা বলা, হাসা, গুনগুন করে গান গাওয়ার ইতিহাস কী?
বুয়ার ইতিহাস শোনার জন্য আমি দৌড়ে উপরে এলাম। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। রান্নাবান্না শেষ করে সে পরিপাটি করে সবকিছু সাজিয়ে রেখে গেছে। মেসমেম্বাররা কেউ কেউ উঠে সকালকৃত্য সারছে। আমি দারোয়ানের মতো বিষণœমুখে রুমে ঢুকলাম। কমলার কোয়ার মতো কলঙ্কযুক্ত আলোও এখন রুমে নাই। সূর্যটা একটু উপরে উঠতেই তা কোনো এক বিল্ডিংয়ের আড়ালে চলে গেছে হয়তো...




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]