ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২১ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৬ জুলাই ২০২০

ব্যবসায় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হারাম
মুফতী জুবায়ের রশীদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০, ১১:১৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 32

মানুষ সামাজিক জীব। যূথবদ্ধ হয়ে তাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে তারা গড়ে তুলেছে সমাজ রাষ্ট্র ও সীমানা। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ সমাজবদ্ধভাবে একত্রে মিলেমিশে বসবাস করে। একে অন্যের সঙ্গে পারস্পরিক লেনদেন এবং জিনিসপত্রের আদান-প্রদান করে থাকে। জীবন ও বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তারা হয়েছে একে অপরের সম্পূরক। প্রাত্যহিক লেনদেনকে সুন্দর কাঠামো দিয়ে গড়ে তুলেছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যে পরস্পরে পণ্য ও মূল্যের বিনিময় হয়ে থাকে। একজন পণ্য দিচ্ছে আরেকজন দিচ্ছে মূল্য। প্রয়োজনই সেসব পণ্য ও মূল্যের জোগান প্রস্তুত করে দেয়।
কিন্তু কখনও অতিমুনাফার লোলুপ দৃষ্টি বিক্রেতাকে অসৎ কাজে প্ররোচিত করে।
তখন সে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনের চাহিদা পূরণ না করে নিজের কাছে সে সব আটকে রাখে। চরম বিপদের সময় মানুষ যখন হন্য হয়ে তা খুঁজে তখন বিক্রেতা ডাকাতের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়। নিরুপায় মানুষ তার কথানুযায়ী চড়ামূল্যে কিনে নেয়। ব্যবসায়ী পরিভাষায় একে বলা মজুদদারি। আরবি ভাষায় মজুদদারিকে ইহতিকার বলা হয়। ‘ইহতিকার’ শব্দের অর্থ হচ্ছে: একচেটিয়াকরণ, একচ্ছত্র সুবিধাভোগ, মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশে পণ্য ধরে রাখা ইত্যাদি। পরিভাষায় ইহতিকার বলা হয়, পণ্য মজুদ করে চড়ামূল্যের অপেক্ষায় আটকে রাখা। অতঃপর মূল্য বৃদ্ধি পেলে অধিক মুনাফায় তা বিক্রি করা।’ (আল মুনজিদ, পৃষ্ঠা ১৪৬)
পণ্য মজুদের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
অধিক মুনাফা লাভের জন্য পণ্য মজুদ করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে হারাম ও নাজায়েজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখবে আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দিবেন। (ইমাম ইবনে মাজাহ) মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাজহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে মজুদদারি সম্পূর্ণ হারাম। কিন্তু হানাফী আলিমগণের মতে মজুদদারি মাকরুহে তাহরিমী। আল্লামা শামী (রহ.) বলেছেন, মানুষ ও পশুর খাদ্যদ্রব্য মজুদ করার কারণে যদি সেখানকার অধিবাসীদের কষ্ট বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে
মজুদ করা মাকরুহ। আর যদি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে মাকরুহ হবে না। ইমাম গাযালী (রহ.)-এর মতে, মজুদদারি হারাম।
তিনি এর কারণ উল্লেখ করে বলেন, এতে আল্লাহর বান্দাগণের কষ্ট ও অনিষ্ট সাধিত হয়ে থাকে। কোনো ব্যক্তি সমস্ত শস্য ক্রয়পূর্বক আটক করে রাখলে অবশিষ্ট সবাই এ থেকে বঞ্চিত থাকবে। এ উদ্দেশে খাদ্যশস্য খরিদ ও মজুদ করে রাখা পাপ। (ইমাম গাজালী, অনুবাদ, আব্দুল খালেক, সৌভাগ্যের পরশমনি, পৃ. ৭৩)
 পণ্য মজুদ করার পরিণাম
মজুদদারির আলোচনা বা ভয়াবহ পরিণামের কথা কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। সম্পদ মজুদ করা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা সোনা রূপা (ধন-সম্পদ) জমা করে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না তাদের জন্য আপনি যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সংবাদ দিন। সে দিন এসব ধন-সম্পদ আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পাঁজর আর পিঠে দাগ দেওয়া হবে। (বলা হবে), তোমরা যা কিছু নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে এগুলো তো সে সব ধন-সম্পদ। সুতরাং তোমরা যা কিছু জমা করে রেখেছিলে, এখন তার স্বাদ আস্বাদন করো। (সুরা আনফাল : ৩৪-৩৫) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, যাতে ধন-সম্পদ শুধু বিত্তবানদের মধ্যে পুঞ্জিভ‚ত না হয়। সুরা হাশর : আয়াত ৭)। এ সব আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, ধন-সম্পদ পুঞ্জিভ‚ত করে রাখাকে অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কেননা এতে ধন-সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণ ও বণ্টন হওয়ার পরিবর্তে শ্রেণি ও সম্প্রদায়-বিশেষের মধ্যে কেন্দ্রীভ‚ত হয়ে পড়ে আর সাধারণ মানুষ হয় নিঃস্ব ও দরিদ্র। লেনদেনেও স্থবিরতা দেখা দেয় এবং উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অনুরূপভাবে পণ্য সামগ্রী আটকে রাখার ফলেও একই রকম সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং সম্পদ পুঞ্জীভ‚তকারী এবং পণ্য মজুদকারী সমান অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা দৃষ্টান্ত স্বরূপ আল-কোরআনে কারুনের ঘটনা উল্লেখ করেন। কারুন ধন-সম্পদ জমা করে স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায় আচরণ করে এবং জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে, তার ঘরবাড়ি ও ধন-সম্পদসহ জমিনে ধসিয়ে দিয়ে শাস্তি দেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করে মানুষকে কষ্ট দেওয়াকে ইসলাম জঘন্য অপরাধ বলেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) পণ্য মজুদ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন খাদ্য শস্য মজুদ করে রাখল, সে আল্লাহ থেকে নিঃসম্পর্ক হয়ে গেল এবং আল্লাহও নিঃসম্পর্ক হয়ে গেলেন তার থেকে। (মুসনাদে আহমদ আহমাদ, আল-মুসনাদ, হাদিস : ৪৮৮০)-এর চেয়ে আরও অধিকতর কঠোর ভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে রাখবে আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দেবেন। (ইমাম ইবনে মাজাহ)
অপর হাদিসে বলেছেন, অপরাধী ব্যক্তি ছাড়া কেউ পণ্য মজুদ করে রাখে না। (মুসলিম : পৃষ্ঠা ৯৫৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, বাজারে পণ্য আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয়। আর পণ্য মজুদকারী অভিশপ্ত হয়। (ইবনে মাজাহ)
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) ব্যবসায়ীদের পণ্য মজুদকরণ সম্পর্কে ঘোষণা করে ছিলেন, আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুদ করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য কিনে তা মজুদ করে না রাখে। যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের দেশে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে সে উমরের মেহমান।
অতএব সে তার আমদানির খাদ্যশস্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক : হাদিস : ১৩২৯) হজরত উসমান (রা.) তার খিলাফত কালে কঠোরভাবে পণ্য মজুদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। আলী (রা.) মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি তার খিলাফাতকালে মজুদকৃত খাদ্যদ্রব্য আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু মজুদদারি জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থি তাই ইসলামে তা নিষিদ্ধ। মজুদদারির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। কেননা এমন অনেক প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী রয়েছে যেগুলো পরিহার করে চলা যায় না। তাই ইসলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সুলভ মূল্যে বিক্রয় করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। আর যেকোনো ধরনের মজুদদারিকে জঘন্য ধরনের অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদীনসহ পরবর্তী সাহাবা কিরামগণ মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে মানব জাতির কল্যাণ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সুন্দর যুগোপযোগী বিধান দিয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ধাপে ধাপে ইসলাম আইনের সৌকর্য সুনিশ্চিত করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাÐেও কল্যাণকর নীতি-আদর্শ উপহার দিয়েছে। ইসলামের ব্যবসায় নীতির গুরুত্ব পূর্ণ উপকারী দিক হলো, মজুদদারি, মুনাফাখোরি, কালোবাজারি ও যেকোনো প্রতারণামূলক ব্যবসায়-বাণিজ্যের নিষিদ্ধকরণ। ইসলাম অতি মুনাফার লোভে প্রতারণা করে ও অপকৌশল অবলম্বন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আটক রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
আধুনিককালেও যেখানে পৃথিবীর নানা স্থানে মজুদদারির প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনসাধারণ বিপর্যস্ত, সেখানে ইসলাম বহুকাল পূর্বেই এর আইনগত বিধান বর্ণনা করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় যদি ব্যবসা-বাণিজ্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হয় তাহলে শুধু মজুদদারির অপতৎপরতাই নয় ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো প্রকার নৈরাজ্য থাকবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার ও মানার তাওফিক দান করুন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]