ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৩ জুন ২০২০ ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৩ জুন ২০২০

হোম কোয়ারান্টাইন: মানসিক যন্ত্রণা নাকি অদৃশ্যের যুদ্ধ
আহমেদ সালেহীন
প্রকাশ: রোববার, ২৯ মার্চ, ২০২০, ৬:২৮ পিএম আপডেট: ২৯.০৩.২০২০ ৮:১৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 209

চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া অজানা, অপরিচিত এক ভাইরাস পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জানিয়েছে, অতি ক্ষুদ্র কনার শক্তির কাছে পরাজিত পুরো মানব সভ্যতা।

নাম তার কোভিড-১৯, করোনা ভাইরাস। সেই ভাইরাস থেকে সংক্রমিত হয়ে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। প্রতিদিন গড় মৃত্যু প্রায় হাজারখানেক।

এমন পরিস্থিতিতে, করোনা থেকে বাঁচতে তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নানা বিধ। কারো সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পাশাপাশি থাকতে হবে গৃহ অন্তরীণ। মানতে হবে নিয়ম কানুণ। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়াই যেখানে বারণ। লকডাউন করা হচ্ছে নানা দেশ, বিভিন্ন শহর। ঘরে আবদ্ধ তাই পুরো বিশ্ব।

এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিদেশ থেকে যারা আমাদের দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের পাঠানো হচ্ছে বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে। হাতেগোনা ক'জন বাদে নির্দেশ মেনে চলছেন অনেকেই। যারা অসুস্থ বা করোনার লক্ষণ রয়েছে তাদের দেয়া হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা।

কিন্তু, যারা বিদেশ থেকে এসেছেন তারা সবাইকি করোনা ভাইরাস বহন করছেন তার শরীরে..! এমন যদি হতো তবে কি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট কি এতদিনে ইতালির মত হতোনা..! যেখানে প্রতিদিন সর্বনিম্ন মৃত্যুর সংখ্যা ছয়শোর অধিক।

তবে যারা বিদেশ ফেরত, তাদের নিয়ে কেনইবা এত কৌতুহল, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা..!! কেনইবা তাদের মানসিকভাবে হেয় করছেন অবুঝ মানুষগুলো..?

একটি উদাহরণ দেই..যদিও এ উদাহরণ অনেক পরিবারে এখন মানসিক যন্ত্রণার কারণ..!
আমার একজন বড়বোন যিনি গত ২০শে মার্চ শুক্রবার নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় এসেছেন। নির্দেশ মোতাবেক মানছেন গৃহঅন্তরীণ থাকার সব নিয়ম কানুণ। রয়েছে তার বড় পরিবার। তবুও তিনি ১৪দিনের সমস্ত নিয়ম মেনেই একাই রয়েছেন তার আলাদা কক্ষে। দরজার বাইরে খাবার দিয়ে যাচ্ছে তার মেয়ে, স্বামী থাকছেন ভিন্ন ঘরে। সবাই এক ছাদের নিচে থেকেও রয়েছেন সম্পূর্ণ একা একটি কক্ষে। ক্যালেন্ডারে দিন দাগিয়ে কিছু লেখালেখি করেই কাটছে তার সময়। মানসিক যন্ত্রণা তার এখন নিত্যসঙ্গী।

এমন অবস্থায়, তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই কারও। যারা নিত্য ফোন দিতো, নানা সমস্যার সমাধান খুঁজতো তার কাছে, আশ্রয় চাইতো বিপদে। তারাই কিনা একটিবারের জন্যও নিচ্ছেনা তার খোঁজ। এমনকি ফোনেও নেই যোগাযোগ। অপরাধ একটাই...মার্কিন মুল্লুক থেকে এসেছেন তিনি।

বাসার বাইরে উৎসুক মানুষ তাকিয়ে যায় তার ফ্লাটের দিকে৷ প্রতিদিন যেই তরকারিওয়ালা কিংবা দোকানদার তার কাছে সদাই বিক্রি করতে উদগ্রিব ছিলো৷ তারাও আর আসতে চায়না তার বাসার সামনে। বাড়ির অন্য ফ্লাটের বাসিন্দাদের চেহারার আতঙ্কিত ছাপ লজ্জিত করছে তাদের পরিবারকে। কেমন যেন অসামাজিক আচরণ সবার মাঝে। তাদের কাছে একঘোরে করে রাখার ভিন্ন নাম হয়তো এই হোম কোয়ারান্টাইন।

যদিও তার এই সেক্রিফাইজ শুধু তার পরিবার নয়, পুরো সমাজের জন্য। তবুও মানুষের চেহারা ভিন্ন।

এদিকে যারা আছেন.....

এবার আসুন আমার কথায়....পেশায় সাংবাদিক বলে করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। প্রতিদিন এক একটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে নামতে হচ্ছে মাঠে, এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে মরার উপর খড়ার ঘাঁ 'করোনা'র প্রাদুর্ভাব। নিজেকে সতর্ক না রাখলে যে আমার পরিবার আক্রান্ত হবে, হবে আমার সহকর্মী, বন্ধু-পরিজন। কিন্তু সেসব ভেবেও সতর্ক হয়েও কাজ করছি নিজের তাগিদে, করছি সমাজ ও দেশের তাগিদে। আমারও রয়েছে পরিবার। আতঙ্কিত আমিও কোন অংশে কম না।

তবুও কিছু সহকর্মী, বন্ধু পরিজনের আড়চোখা মনোভাব কিংবা তাদের বিষাক্ত কথাও যেন করোনা ভাইরাসের চাইতেও ভয়ঙ্কর। কোন এসাইনমেন্ট থেকে আসার পর নিউজ রুমে ঢুকতেই সমস্ত নিয়ম মেন চলারই চেষ্টা করছি করোনার প্রভাব বিস্তার করার পর থেকেই। বাসাতেও যেমন, বন্ধু মহলেও তাই। কিন্তু সেই সহকর্মীদের আচরণ ব্যথিত করছে প্রতি নিয়তই। অফিসে ঢোকা মাত্রই তাদের কটুক্তি কিংবা বারবার প্রশ্ন করা সতর্কতা অবলম্বন করেছি কিনা অথবা হোম কোয়ারান্টাইনে চলে যাওয়ার পরামর্শ। কত কিছুই না সহ্য করতে হচ্ছে আমাদের। কাজের পরিবেশ দিনদিন নেমে আসছে তলানিতে।

এমন পরিস্থিতির জন্য হয়তো সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না।

মূল কথা হচ্ছে, যারা স্বেচ্ছায় হচ্ছেন গৃহ অন্তরীণ কিংবা ঝুঁকি নিয়ে মানুষের খবর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা নিজেরাই রয়ছেন প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায়। তাদের সতর্কতা আপনার আমার জন্যই আখেরে বয়ে আনছে লাভ। তারপরও তাদের এই সেক্রিফাইজ কোন অংশে যেন বাড়তি মানসিক যন্ত্রণায় রূপ না নেয় আপনাদের এই ভিন্ন দৃষ্টি সেটাই এখন প্রত্যাশা।

তাদেরকে থাকতে দিন তাদের মত করে। সাহায্য করুন সেচ্ছায় অন্তরীন হওয়া যুদ্ধে জয়ী হতে। মানসিক ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে সহযোগিতা করুন। যন্ত্রণা নয়, সাহস জোগান সতর্ক হয়ে পথ চলার। সঙ্গে নিজেদেরও খেয়াল রাখুন সতর্ক থাকার। করোনা প্রতিরোধে যুদ্ধ হোক আপনার পক্ষে...
















আহমেদ সালেহীন
প্রতিবেদক, সময় টেলিভিশন




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]