ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৩১ মে ২০২০ ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ৩১ মে ২০২০

বিপর্যয় ও মহামারী পাপাচারের ফল
মাওলানা মুনীরুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 47

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সর্বশ্রেষ্ঠ নিপুণ কারিগর। আসমান-জমিন, পাহাড়-সাগর, গ্রহ-নক্ষত্র এক কথায় সুন্দর এই বসুন্ধরা যেভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে সৃষ্টি করা প্রয়োজন, ঠিক সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। এর ব্যতিক্রম হলে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় ঘটতো। এখন আল্লাহর ইচ্ছা ও কামনা হলো, তিনি যেমন পৃথিবীতে ভারসাম্য রক্ষা করে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন, তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষও যেন পৃথিবীতে তেমনি শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলে।
অতীতে পৃথিবীতে যে বড় বিপর্যয়-মহামারীগুলো হয়েছেÑ প্লেগ, কলেরা, স্পেনিশ ফ্লু অথবা বাংলাদেশে ‘সিডর’, কয়েক বছর আগে ইন্দোনেশিয়ায় ‘সুনামি’ ও আমেরিকায় ‘কেটরিনা’ সংঘটিত হয়েছে, বর্তমানে যে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস নামের কোভিড-১৯ মহামারী আকারে বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এ ছাড়া বিভিন্ন সময় যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, ভূমিধস ইত্যাদি হয়ে থাকে, এ সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে থাকেন। কেউ বলেন, তা মানুষের পাপাচার ও সীমা লঙ্ঘনের জন্য, আবার কেউ বলেন, তা নিছক প্রকৃতির খেয়ালিপনা। কিন্তু বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন, আসলে কী কারণে এসব মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। বস্তুত পৃথিবীতে সৃষ্ট এসব বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তন হেতু নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এগুলো আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সীমা লঙ্ঘনকারী পাপাচারীদের পাপের শাস্তিস্বরূপ অবতীর্ণ হয়।
এ প্রসঙ্গে কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে তা তো তোমাদের কর্মফল। আমি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে থাকি।’ (সুরা শুআরা : আয়াত ৩০)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন তারা সৎপথে ফিরে আসে।’ (সুরা রুম : আয়াত ৪১)। মানবতার মুক্তির দিশারী হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ছোট-বড় যত দুর্ভোগ বা হয়রানি বান্দার ওপর আপতিত হয় সবই নিজ কর্মদোষে। আর অধিকাংশই আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি)
আল্লাহ তায়ালার অবাধ্য হয়ে আমাদের পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও জনপদ ধ্বংস হয়েছে। যেমন, সাবাবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। দুটি উদ্যান, একটি ছিল ডানদিকে অন্যটি বামদিকে। (তাদের বলা হয়েছিল) তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া খাদ্য খাও এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় কর। এটা ছিল উত্তম শহর এবং তোমাদের প্রতিপালক ক্ষমাশীল। এরপর তারা অবাধ্যতা করল। ফলে আমি তাদের প্রতি বাঁধভাঙা বন্যা প্রবাহিত করলাম এবং তাদের উদ্যান দুটি পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি উদ্যানেÑ যাতে উদগত হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ। এটা ছিল কুফরের কারণে তাদের প্রতি আমার শাস্তি। আমি অকৃতজ্ঞ ছাড়া কাউকে শাস্তি দিই না।’ (সুরা
সাবা : আয়াত ১৫-১৭)
হজরত নুহ (আ.)-এর কওম আল্লাহর হুকুম অমান্য করে দেব-দেবীর পূজা করত। তারা আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের প্রতি মহাপ্লাবন নাযিল করেন এবং সেই প্লাবনে নিমজ্জিত করে তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। কিন্তু নুহ (আ.)-এর অল্পসংখ্যক অনুসারীকে আল্লাহ মহাপ্লাবন থেকে হেফাজত করেন। হজরত হুদ (আ.)-এর সম্প্রদায়ও একই অপরাধে অপরাধী ছিল। তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস করে দেন। হয়রত শুয়াইব (আ.)-এর গোত্র ওজনে কম দিত। এ ব্যাপারে তারা সীমা লঙ্ঘন করলে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। হজরত লুত (আ.)-এর গোত্র সমকামিতায় লিপ্ত হতো। তারা যখন এই অপরাধের চরম সীমায় পৌঁছে গেল, তখন তাদেরকে ভূমিকম্প ও পাথর বর্ষণে ধ্বংস করে দেন এবং নিরপরাধীদের রক্ষা করেন। এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন অপরাধের কারণে ধ্বংস করে দেন। তবে এ উম্মতে মুহাম্মদি আজাব-গজব দ্বারা সমূলে ধ্বংস হবে না, এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার ফল এবং উম্মতে মুহাম্মদির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সময়ে সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপদাপদ দিয়ে সাবধান করা হবে, যা আমরা মাঝেমধ্যে লক্ষ করছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি দেখে না যে, তারা প্রতিবছর দুয়েকবার বিপর্যস্ত হয়? এরপরও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।’ (সুরা তাওবা : আয়াত ১২৬)
হাদিসে শরিফে আছে, পিতা-মাতা সন্তানকে যত ভালোবাসে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে তারচেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তাই কখনও কখনও মানুষের কর্মদোষে বিপদাপদ সংঘটিত হওয়া সঙ্গত হলেও আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং বিপদ সংঘটিত করেন না। তবে ক্ষমার অযোগ্য হলে বিপদ সংঘটিত করেন। এটা সার্বভৌম ক্ষমতাধর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন।
আমাদের জানা উচিত, এ প্রকৃতির পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন, যিনি তা নিয়ন্ত্রণ করেন। আকাশমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা আছে সবই তার আজ্ঞাবহ। যখনই তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন কেবল বলেন, ‘কুনÑ হও’ তখন সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়। (সুরা ইয়াসিন : আয়াত ৮২)। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে, তাঁর নির্দেশে বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং তাঁর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৬৪)। তাই প্লেগ, কলেরা, করোনা আল্লাহর নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে, তবে তা বান্দার সীমা লঙ্ঘনজনিত কর্মের জন্য সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করি না যতক্ষণ না তারা নিজে নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ : আয়াত ১১)
সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের কর্মদোষে বিভিন্ন পাপাচারে সীমা লঙ্ঘনের ফলে জলে-স্থলে বিপদাপদ নাযিল হয়। তাই আমাদের অতীতের কৃতকর্মের জন্য তওবা করে সংশোধন হওয়া জরুরি এবং ভবিষ্যতে যেন আমাদের মাধ্যমে এমন কোনো পাপাচার না হয়, যার জন্য আল্লাহ তায়ালার ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কারণ সীমা লঙ্ঘিত হলে যেকোনো সময় আমাদের ওপরও আল্লাহ তায়ালার কঠিন আজাব আসতে পারে। আর বিচার দিবসের কাঠগড়ায় তো আমাদের অবশ্যই দাঁড়াতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিপদাপদ মুক্ত করুন এবং ক্ষমা করে দিন।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]