ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ মে ২০২০ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২৫ মে ২০২০

মানবতাবোধের ফানুসটি কি মুখ থুবড়ে পড়েছে?
কেশব রায় চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২০, ১:৩৮ পিএম আপডেট: ৩১.০৩.২০২০ ১:৫৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 178

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আকিজ ও গণস্বাস্থ্যের যৌথ উদ্যোগে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেয়ার পর সেখানে বাধা দেয় এলাকাবাসী। সীমিত আকারে হলেও করোনার সংক্রমণ তৃতীয় স্তরে পৌঁছেছে- এটা রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে এই বিস্তৃতিটা ব্যাপক আকারে হচ্ছে কি না তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে রয়েছে বিশেষজ্ঞকূল।

উপসর্গ থাকা সকলের নমুনা আরও ব্যাপক হারে পরীক্ষা করতে পারলে চিত্রটা হয়তো পরিষ্কার হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। ইতিমধ্যে করোনার উপসর্গ নিয়ে দেশের নানা অঞ্চলে মারাও গেছে বেশ কয়েকজন। যদিও এখনও জানা যায়নি যে, তারা আদৌ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কিনা। এমন এক দুঃখক্লিষ্ট ও আতঙ্কজনক অবস্থার মধ্যেই এই আতঙ্ক নামক জুজুর আবডালে মানবতাবোধ আর সহমর্মিতার এক দৈন্যদশা ফাঁস হতে শুরু করেছে চারদিকে। অনুভূতিহীনতার আস্ফালন চলছে এদিক-সেদিক। যা আমাদের করে তুলছে নিতান্তই উদ্বিগ্ন, মাথা হয়ে যাচ্ছে আমাদের নতমুখী।

দেশে করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্তের পর প্রতিরোধ-প্রস্তুতির শুরুতেই রাজউকের উত্তরা আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি ভবনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত এলাকাবাসীর বিক্ষোভের মুখে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের ঢাকার খিলগাঁও তালতলার একটি কবরস্থানে দাফন করার সিদ্ধান্তও এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে বাতিল করতে হয়। এমনকি তাদের প্রতিবাদের মুখে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃতদেহ শেষ পর্যন্ত ওই কবরস্থানে দাফন করা যায়নি।
কিশোরগঞ্জের একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে কোয়ারেন্টিনে রাখে। খবর এলাকাবাসীর কাছে চাউর হতেই করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এলাকাবাসী তাকে হাসপাতাল ছেড়ে দিতে বলেন। একপর্যায়ে এলাকাবাসী তাকে এলাকাছাড়া করার হুমকিও দেন। চিকিৎসকেরা পুলিশের শরণাপন্ন হলেও একসময় এলাকাবাসীর অদম্য প্রতিরোধের কাছে হার মানতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। শেষে জীবন রক্ষায় সকলের অগোচরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বাঁচে পরিবারটি।

বগুড়ার শিবগঞ্জে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির স্ত্রীর রাতভর আকুতিতেও করোনা-আতঙ্কে তার সাহায্যে এগিয়ে যায়নি পড়শিদের কেউ। এমনকি কোনোপ্রকার সাড়া দেয়নি সরকারি লোকজনও। শেষে সবকিছুকে পেছনে ফেলে বিনা চিকিৎসায় মারা যান সেই ব্যক্তি। এখানে শেষ হলেও নয় এত আক্ষেপ হতো না। ওই ব্যক্তিকে দাফন করতে গেলে পরপর দুই জায়গায় বাধা প্রদান করা হয়। শেষে পুলিশি পাহারায় সরকারি খাস জমিতে ওই ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করা হয়।

এবার দেখা গেল আরেক তেলেসমাতি কান্ড। চীনের উহানের লেইশেনশান হাসপাতালের আদলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহযোগিতায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ৭-৮ দিনের মধ্যে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তাদের নিজস্ব খালি জমিতে আপাতত ২ বিঘা জমির ওপর ৩০১ শয্যার একটি অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে কাজেও নেমে পড়েছিল আকিজ গ্রুপ। অথচ সেখানেও একই অজুহাতে বাধা প্রদান করে এলাকাবাসী। কাজ বন্ধ করে দিতে হয় কয়েক ঘন্টার জন্য। পরে অবশ্য মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নির্মাণ কাজ আবার শুরু হয়।

সর্বশেষ খবর মোতাবেক নওগাঁর রাণীনগরে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে যুবককে তার নিজ বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি গ্রামবাসী। শেষে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে কয়েক হাসপাতাল ঘুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এমন সব কিম্ভূতকিমাকার ঘটনাবলী হরহামেশাই ঘটে চলেছে আমাদের দেশে। কারফিউ বা লকডাউনের মতো কঠোর প্রতিবিধি আরোপ না করা সত্ত্বে ও সাধারণ ছুটির সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘরে থাকার অনুরোধ প্রায়-সফল হতে চললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতেক সদস্যের অতি-বাড়াবাড়ি, যশোরের মনিরামপুরে এসি (ল্যান্ড)-এর তিন বৃদ্ধকে কান ধরে ওঠবস করানোর মতো অবমাননার ঘটনা, আবার ওই এসি (ল্যান্ড)-কে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা উচিত বলে এক ব্যাংক-কর্মকর্তার স্পর্ধিত হুংকার আমাদের সত্যিই নির্বাক করে দেয়।

যে হারে পুরো বিশ্বে ভাইরাসটি তার থাবা ক্রমশ বিস্তৃত করে চলেছে, সেভাবে যদি আমাদের দেশে তার প্রাদুর্ভাব চতুর্থ স্তরে বিস্তৃতি ঘটায় তাহলে আমাদের এই বিপুল জনসংখ্যা, জনঘনত্ব আর দুর্বল স্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামোয় আমরা কতটুকু লড়াই করতে পারবো তা একবার ভেবে দেখেছেন কি? ডাক্তার, নার্সসহ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, বিশেষায়িত হাসপাতালের অপ্রতুলতা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা-সামগ্রীর অভাব, সরকারের সীমিত সক্ষমতা, জন-অসেচতনতা ইত্যাদি নিত্য অনুষঙ্গ মাথায় রেখে চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন তো! এভাবে ভাবলে করুণ চিত্রটা এরূপ হলে কেমন হবে তাও একটু ভাবুন যে, করোনা উপসর্গসমেত আপনাকে নিয়ে আপনার স্ত্রী ঘুরে বেড়াচ্ছে দ্বারে দ্বারে, কিন্তু এগিয়ে আসছে না আত্মীয়-পরিজনসহ পড়শিদের কেউ!

আচ্ছা, তেমন সময় যদি সম্পূর্ণ লকডাউন করতে হয় দেশ, সেক্ষেত্রে ১৬/১৭ কোটি মানুষের দেশে যেখানে অধিকাংশ লোকই শ্রমজীবী এবং মহামারী যদি মন্বত্বরে রূপ নেয়, সেখানে তাদের খাবারের যোগানটা হবে কীভাবে- তা একবার ভেবে দেখেছেন কি? যারা প্রতিবাদ করেছেন তারা কেউ আক্রান্ত হলে কোথায়-ই বা চিকিৎসা করা হবে তাদের? কোথায়-ই বা কবরস্থ করা হবে তাদের?- ভেবে দেখেছেন কি? শুধু দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ঘরবন্দি হয়ে থাকলেই কি আপনি বা আপনার পরিবার নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন? কোনো সুযোগ নেই! নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় কীভাবে?

প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের মানবিকতাবোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতাবোধ, ঔচিত্যবোধ এমন তলানীতে গেল কবে? এগুলো কিসের আলামত? এসব ঘটনা থেকে আমরা কি অনুমান করতে পারি? আমাদের এই জাতির মানবতাবোধ কি এতই ঠুনকো? কোথায় গেল আমাদের এতকাল ধরে মাঠে-ঘাটে-সাহিত্যে প্রদর্শিত মনুষ্যত্ববোধ? কোথায় গেল আমাদের সেই সামাজিক বা ধর্মীয় ভাতৃত্ববোধ?

নাকি যা ছিল তা শুধু বাহ্যিক প্রলেপ, প্রগল্ধসঢ়;ভতা আর আত্মশ্লাঘা? যদিও এই সময়ে আশাপ্রদ ঘটনাও আছে অসংখ্য। এই সংকটে সহযোগিতার হাত প্রশ্বস্ত করে এগিয়ে আসছেন একে একে অনেকেই। আমরা ধরে নিতে চাই ঘটে যাওয়া স্থলিত এগুলো সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা, যেগুলো আমাদের সমগ্রতার প্রতিফলক নয়।

তবে ক্রমে যদি এরূপ বিচ্ছিন্নতা সমগ্রতার জায়গাটি দখল করে নেয় তাহলে নিশ্চয়ই এর প্রতিফল ভুগতে হবে আমাদের সকলকেই, অচিরেই, অনিবার্যরুপে। শেষে রবীন্দ্রনাথের ‘সরোজিনী’ নাটকে রমণীরা চিতায় আত্মাহুতি দেবার মুহূর্তের গাওয়া গানটি দিয়ে পরিতাপযোগে শেষ করছি- “শোন রে যবন! - শোন্ধসঢ়; রে তোরা,


যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে,

সাক্ষী র’লেন দেবতা তার

এর প্রতিফল ভুগিতে হবে ।। ”

লেখক: অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ঢাকা।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]