ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শুক্রবার ৫ জুন ২০২০ ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার শুক্রবার ৫ জুন ২০২০

করোনায় প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়াও এবাদত
রিয়াজুল হক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২০, ৪:৫৮ পিএম আপডেট: ৩১.০৩.২০২০ ৮:২৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 903

একটা ঘটনা দিয়েই লেখাটা শুরু করি। কথিত আছে, একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) হজ পালন করতে এসে কিছু সময়ের জন্য হারাম শরীফেই শয়ন করলেন। এমন সময় তিনি স্বপ্নে দেখলেন, দু’জন ফেরেশতা একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে, এবার হজে কত লোক শরীক হয়েছে বলতে পার কি? অন্যজন জবাব দিল, ছয় লক্ষ।

আবার প্রথম ফেরেশতা জিজ্ঞেস করল, কত লোকের হজ্জ্ব কবুল হয়েছে? দ্বিতীয় ফেরেশতা বলল, কারও হজই কবুল হয়নি।

হযরত আবদুল্লাহ (রহঃ) অনেকটা বিষ্ময় নিয়ে বলে উঠলেন, পৃথিবীর এত দেশ থেকে এত মানুষ কষ্ট করে হজ করতে এসেছে কিন্তু সব বৃথা হয়ে গেল। তখন ফেরেশতাদের একজন উত্তর দিলেন, দামেশক নগরে একজর মুচি আছেন। যদিও তিনি হজে আসেন নি, কিন্তু তার হজ কবুল হয়েছে। আল্লাহর রহমতে ঐ মুচির উছিলায় হজ পালন করতে আসা সকলের হজই কবুল হয়েছে।

এই স্বপ্ন দেখার পরই আল্লাহর অলীর ইচ্ছা হল সেই মুচির সাথে দেখা করার। তিনি দামেশকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন এবং সেখানে পৌছে  সেই মুচির বাড়ির সন্ধান পেয়ে তার বাড়ির বাইরে থেকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। ডাক শুনে ভিতর থেকে একজন লোক বের হলে আবদুল্লাহ (রহঃ) লোকটির পরিচয় পেলেন এবং নিশ্চিত হলেন ইনিই সেই মুচি। আবদুল্লাহ (রহঃ) লোকটিকে তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন।

লোকটি বললেন, প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমার মনে হজ করার করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা সফল হয়নি। এতদিন পরে বহু কষ্টে তিন হাজার মুদ্রা সংগ্রহ করে এবার হজের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে আমার গর্ভবতী স্ত্রী পাশের বাড়ি হতে রান্না করা গোশতের ঘ্রাণ পেয়ে তা খাওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। পাশের বাড়ি হতে গোশত নিয়ে আসার জন্য আমাকে অনুরোধ জানায়।

স্ত্রীর অনুরোধ রক্ষা করার জন্য নিজের লজ্জা ত্যাগ করে পাশের বাড়ি গিয়ে আমার উদ্দেশ্য প্রকাশ করলাম। আমার কথা শুনে পাশের বাড়ির গৃহকর্ত্রী জানালেন, আপনার ইচ্ছা আমি সানন্দে গ্রহণ করতাম কিন্তু বিশেষ কারণে তা সম্ভব নয়। কেননা এ গোশত আপনাদের জন্য নাজায়েয । গত সাত দিন ধরে আমি আমার সন্তানদের জন্য কোনও খাবার জোগাড় করতে পারি নাই। ক্ষুধায় তারা সংজ্ঞাহীন। এমন অবস্থায় একটি মৃত গাধার সন্ধান পেয়ে তা থেকে কিছু অংশ এনে সন্তানদের প্রাণ রক্ষার জন্য রান্না করেছি। এখন তাই তাদের খেতে দেব।

মুচি বলে যেতে লাগলেন, এই কথা শুনে আমার অন্তরে কষ্টের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। আমি আমার বাড়ি এসে হজের জন্য জমানো মুদ্রা ঐ মহিলার হাতে দিলাম তার এতীম সন্তানদের ভরণ পোষণের জন্য। ঘটনাটি শুনে আবদুল্লাহ (রহঃ) ফেরেশতাদের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলেন।

সারাবিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী, রাজকন্যা, রাজপুত্র, মন্ত্রী, এমপি অনেকেই রেহাই পাননি। বিশ্বের ১৯০টির অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। আমাদের দেশেও লকডাউন চলছে। বাইরে বের হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও মানুষজন নাই। সবকিছুই বন্ধ। করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের কাজ নাই বললেই চলে। এরা অনেকেই আবার চাইতে পারে না। না খেয়ে থাকবে, তবুও কাউকে কিছু বলবে না।

আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে, আমাদের উচিত প্রতিবেশীদের অধিকারেআদায় করা। মহানবী (সাঃ) বলেন, সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে রাত যাপন করল পরিতৃপ্ত অবস্থায় অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত এবং সে তা জানে।

আমাদের জীবনের স্থায়িত্ব কিংবা মূল্য কতটুকু, করোনাভাইরাস কিন্তু পরিষ্কার করে দিয়েছে। আমাদের উচিত মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করা। কারণ আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম প্রতিবেশী ঐ ব্যক্তি যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম। এ পৃথিবীতে কর্ম কখনও বিনষ্ট হয় না। প্রতিবেশী অনাহারে থাকলে আমরা আয়েশী ভোজন বিলাস সম্পন্ন করে কোন ইবাদত করলে আল্লাহর দরবারে কখনও কবুল হবে না। সম্পদ কখনও চিরস্থায়ী হয় না। এসব নিয়ে গর্ব করার কিছুই নেই। সবকিছুর মালিক তো এক আল্লাহ। আমরা তার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। এর বেশি কিছু নই। আমরা প্রতিবেশীর কষ্ট লাঘব করলে দয়াময় আল্লাহ আমাদের কষ্ট লাঘব করবে। আমরা প্রতিবেশীর কল্যাণের জন্য অর্থ ব্যয় করলে, আল্লাহ আমাদের সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেবেন।

আমরা অনেকেই হয়ত দূরে গিয়ে অনেক মানুষের জন্য সাহায্য সহযোগিতা করতে পারব না। কিন্তু বাড়ির পাশের কয়েকটি ঘরের মানুষ কেমন আছে, সেই খোঁজ-খবর খুব সহজেই নিতে পারি। আসুন, আমরা সেই কাজটি করি। কারণ ক্ষুধার্ত  প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করা অনেক বড় ইবাদত।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]