ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৩১ মে ২০২০ ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ৩১ মে ২০২০

রোগীশূন্যতায় ভুগছে হাসপাতাল
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০, ১১:৫২ পিএম আপডেট: ০১.০৪.২০২০ ১:৩৮ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 155

করোনাভাইরাসের ভয়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলো রোগী শূন্যতায় ভুগছে। বেশির ভাগ হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর বিভাগে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো খাঁ খাঁ করছে। কোনোটাতেই রোগীর দেখা মিলছে না। সাধারণ রোগীরাও করোনা ভয়ে যাচ্ছে না চিকিৎসা সেবা নিতে। রোগী সঙ্কটে ইতোমধ্যে অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক তাদের সেবা গুটিয়ে  নিয়েছে। সাময়িক বন্ধ রয়েছে অনেক হাসপাতালের কার্যক্রম। শুধু তাই নয়, নামি-দামি বেশির ভাগ হাসপাতালও তাদের ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ রেখেছে। চিকিৎসক ও নার্স স্বল্পতায় জরুরি রোগীরা বাধ্য হয়ে ছুটছেন সরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীরা স্বেচ্ছায় রিলিজ নিয়ে চলে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। হাসপাতালটিতে আগে রোগী আর স্বজনদের ভিড়ে গিজগিজ করত। সকাল থেকে দুপুর অবধি ভিড় লেগে থাকত। হাসপাতালটির আউডডোর ও ইনডোরে সেবা দিতেই হিমসিম খেতে হতো চিকিৎসক, নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের। কিন্তু সেই চিরচেনা দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ব্যস্ততাও কমেছে। আগে প্রতিদিন শুধুমাত্র আউটডোরেই (বহির্বিভাগ) তিন থেকে চারশ রোগী চিকিৎসা নিত। কিন্তু এখন সেটি কমে ৩০ থেকে ৪০-এ নেমে এসেছে। ২৬ মার্চ থেকেই এমন চিত্র এ হাসপাতালে।
হাসপাতালটির ওয়ার্ড মাস্টার মাহবুব হোসেন জানান, প্রতিদিন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন করে সেবা নিতে আসছেন। বাধ্য না হলে কেউ ভর্তিও হচ্ছেন না। রোগীর স্বজনরাও আগের মতো ভিড় করেন না। হাসপাতালটির পক্ষ থেকে বিকালে রোগীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি আপাতত বাতিল করা হয়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ভর্তি করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্র আরও নাজুক। ঢামেকে ২৬ মার্চ থেকে রোগী ভর্তির পরিসংখ্যান অনেক কমে গেছে। করোনার ভয়ে অধিকাংশ রোগীই বাড়ি চলে গেছে। হাসপাতালের ভেতর ও বারান্দাগুলো খাঁ খাঁ করছে। আগে শুধুমাত্র বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিত। কিন্তু এখন সেটি কমে মাত্র শরও নিচে এসেছে।
সম্প্রতি হাসপাতালটিতে দুজন চিকিৎসকের করোনায় আক্রান্ত এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আতঙ্ক বেড়েছে। করোনা ভীতিতে যারা ভর্তি ছিলেন তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী বাড়িতে চলে জানা গেছে। বেশির ভাগ বেড এখন খালি পড়ে আছে। তবে অতি জরুরি রোগীদের দুয়েকজন রয়েছে। রোগী কম থাকায় হাসপাতালের পরিবেশ এখন অনেকটা ভুতুড়ে।
অথচ অন্য সময় রোগী ও স্বজনের ভিড়ে গমগম করত ভেতর-বাইর। সিঁড়ি, ফ্লোরে রোগীরা শুয়ে শুয়ে চিকিৎসা নিতেন। সারাক্ষণ চিকিৎসক ও নার্সদের ছোটাছুটি চোখে পড়ত। কিন্তু এখন পুরোটাই বিপরীত। মঙ্গলবার ঢামেকের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। যেসব রোগী এখন ভর্তি আছেন তাদেরও নিরাপদ দূরত্বে রাখা হচ্ছে। কঠোর নিরাপত্তা মেনে রোগীদের দেখভাল করছেন নার্সরা।
ঢামেকের একজন ওয়ার্ড মাস্টার বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। কিন্তু এমন অবস্থা কখনও দেখিনি। রোগী ও স্বজনের ভিড়ে সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর থাকতে হতো কিন্তু এখন মোটামুটি বসে বসে সময় কাটছে।
নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে আসা সেলিম বেপারি গত চারদিন ধরে পেটের সমস্যায় ভুগছেন। মঙ্গলবার ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসক তাকে দেখে ওষুধ লিখে দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। হাসপাতালটিতে কাউকে খুব প্রয়োজন ছাড়া ভর্তি করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাসের জন্য সবার মনে একটু ভয় আছে। তাই রোগীরা ইচ্ছা করেই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। রোগী যদি স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান তাকে তো আর জোর করে আটকানো যাবে না। ঢামেকের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক এনায়েত কবির বলেন, যারা মোটামুটি সুস্থ তারা রিলিজ নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। তবে রোগী ভর্তির চিত্রটা আগের মতো নেই। ভিজিটরও কমে গেছে। আগে বার্ন ইউনিটে শয়ের ওপরে সেবা নিতে আসলেও এখন তা কমে ২০ থেকে ২৫-এ নেমে এসেছে বলেও জানান তিনি।
সোহরাওয়াদী হাসপাতালেও একই চিত্র। এ হাসপাতালে আগে (বহির্বিভাগে) প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজারের মতো রোগী চিকিৎসা নিত। কিন্তু সেটি এখন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে বলে দাবি করেছেন হাসপাতালটির পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া।
তিনি বলেন, রোগী আগের চেয়ে কমে গেছে এটা সত্য। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ভর্তি হন না। যান চলাচল কম থাকায় দূর-দুরান্তের রোগী কমে গেছে। সংক্রমণের ভয়ে অনেকেই ভর্তি হচ্ছে না। পাশাপাশি রোগীর স্বজনরাও অনেক কমে গেছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে সেবার মান রক্ষায় আমাদের চিকিৎসক ও নার্সরা মনোবল বৃদ্ধি করে প্রস্তুত রয়েছেন। হাসপাতালটির পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, আগে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিত। কিন্তু এখন তা হাজারের নিচে। আগে সাড়ে চার হাজারের মতো রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র ৮০৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালে মর্গের দায়িত্বে থাকা যতন কুমার বলেন, করোনার ভয়ে আগের চেয়ে ময়নাতদন্ত করার লাশের সংখ্যাও কমে গেছে। অন্যদিকে শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় ও পুরান ঢাকার মিডফোর্ট হাসপাতালের চিত্রও একই।
হাসপাতাল দুটির চিকিৎসকরা বলছেন, রোগী অনেক কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ভর্তিও করা হচ্ছে না। মঙ্গলবার বশেমুমেবির চত্বরে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো হাসপাতাল জুড়ে পিনপতন নীরবতা। কারও কোনো ছোটাছুটি নেই। ব্যস্ততা নেই। নিরাপত্তা কর্মীরা বসে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন।
সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। হাসপাতালগুলোতে বহিবির্ভাগে কোনো রোগীই আসছে না। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক আশিষ চক্রবর্তী সময়ের আলোকে বলেন, আগে থেকেই যারা চিকিৎসা নিতেন তারাই চিকিৎসা নিচ্ছেন। নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি হচ্ছে না।
মেরাদিয়ার আমেরিকা হাসপাতালের ইনচার্জ মারুফ হোসেন বলেন, আগে রোগীতে ভরপুর থাকত। কিন্তু রোগী আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ছোটখাট হাসপাতালগুলো তাদের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে বলেও তিনি জানান। একই চিত্র ল্যাবএইড, পপুলার, স্কয়ার, আদ্-দ্বীন ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালেরও। এসব হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা ৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও জানা গেছে।
তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী শূন্যতায় ভুগলেও কর্তা ব্যক্তিরা ইমেজ হারানোর ভয়ে মুখ খুলছেন না। শুধু তাই নয়, বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রমও বাতিল করেছে। বেশির ভাগ হাসপাতালগুলোতে মাতৃত্বকালীন ও জরুরিসেবা ছাড়া অন্য সেবা মিলছে না।













সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]