ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ মে ২০২০ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২৫ মে ২০২০

সংকুচিত হচ্ছে সুন্দরবন সেন্টমার্টিন ও চলনবিলসহ অসংখ্য জলাশয়
আলম শাইন
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রমুখী সীমানার নিকটবর্তী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনায় অবস্থিত বিশে^র সর্ববৃহৎ ‘ম্যানগ্রোভ’ অরণ্য সুন্দরবন। নিঃসন্দেহে বলা যায় এ বন প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি। দুই বাংলাব্যাপী এ বনের বিস্তৃতি হলেও বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ অংশের আয়তন ৩ হাজার ৯৮৩ বর্গকিলোমিটার। মোট দশ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন এই দুর্গম অরণ্যটির।
প্রকৃতির এ লীলাভূমি দর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক ছুটে আসে এখানে। ফলে পর্যটন খাতে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পেয়ে থাকি। শুধু পর্যটন খাতেই নয়Ñ মৎস্য, মধু ও জ্বালানি কাঠ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহৃত বহুবিধ জিনিসের মাধ্যমে সরকার প্রচুর রাজস্ব অর্জন করে সুন্দরবন থেকে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সুন্দরবনের আকর্ষণ যেমনি রয়েছে তেমনি রয়েছে বহু প্রাপ্তিও। সে প্রাপ্তিটিও বিরাট অঙ্কের। ২০১৭ সালের হিসাব মোতাবেক সুন্দরবনের বাৎসরিক আয় প্রায় ৫ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএফই এসসিইউ) এক সমীক্ষায় জানিয়েছে তথ্যটি। বিশদ ব্যাখ্যাও দিয়েছে, পর্যটন থেকে বছরে আয় হয় ৪১৪ কোটি টাকা। বনজীবীদের আয় ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। অপরদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে ৩ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার সম্পদ। অথচ আমাদের সেই গর্বের প্রতীক সুন্দরবন ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। বনের সীমারেখা কমে আসার প্রধান কয়টি কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নদীভাঙন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী কর্তৃক সুন্দরবন এলাকায় জেগে ওঠা চর দখল করে নেওয়া।
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। আবার উত্তাল পশুর ও ভোলা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ডিসিআরের নামে চর দখল করে নেওয়ায় আয়তনে ছোট হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় জাতীয় বনটি।
অন্যদিকে দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত একমাত্র প্রবাল রাজ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ। দ্বীপটির অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে। আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র সাড়ে ৮ বর্গকিলোমিটার। জোয়ারের সময় আয়তন খানিকটা হ্রাস পেয়ে ৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে এর
দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এ দ্বীপে রয়েছে প্রকৃতির অজস্র সম্পদ।
এখানে রয়েছে বিলাসবহুল হোটেল-মোটেলসহ বেশ কিছু পাকা-সেমিপাকা দালান; যা ছিল না বিগত এক যুগ আগেও। এসব গড়তে গিয়েই সেন্টমার্টিনের মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে হচ্ছে। ফলে ভরা বর্ষায় দ্বীপ ভাঙনের কবলে পড়ে সংকুচিত হয়ে দ্বীপের আয়তন হ্রাস পাচ্ছে।
অন্যদিকে চলনবিলের অবস্থাও তদ্রুপ। এই বিল রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এটি দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি। ৩টি জেলা, ৮টি উপজেলা, ৬০টি ইউনিয়ন, ১ হাজার ৬০০ গ্রাম এবং ১৪টি নদী নিয়ে চলনবিলের বিস্তৃতি। বিশাল এ বিলের আয়তন নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়ে গেছে আজও। ১৯১৯ সালে ‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’র হিসাব মতে, চলনবিলের আয়তন ৫০০ বর্গমাইল বা প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। অপরদিকে ১৯৬৮ সালের জরিপ মোতাবেক চলনবিলের আয়তন ৮০০ বর্গমাইল বা ২ হাজার ৭১ বর্গকিলোমিটার বলা হয়েছে।
এক সমীক্ষায় জানা যায়, বর্তমানে চলনবিল অনেকখানি হ্রাস পেয়ে আয়তন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটারে।
যতদূর জানা যায়, চলনবিল সংকুচিত হওয়ার পেছনে রয়েছে তিনটি বড় কারণ। প্রথমত চলনবিলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ২২২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করছে। তার মধ্যে বিলের আশপাশ বা সীমানা এলাকা থেকে ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিলে ঢুকছে। আর বাকি ১৬৯.৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি নদী দিয়ে বর্ষার মৌসুমে বিলে প্রবেশ করছে। এতে করে বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। (ড্রেজিং ব্যবস্থা থাকলে পলি ভরাট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত) দ্বিতীয়ত বিল এলাকায় অপরিকল্পিত বসতবাড়ি স্থাপনের কারণে ক্রমেই চলনবিল সংকুচিত হয়ে আসছে। তৃতীয়ত চলনবিল এলাকার আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ হওয়ায় বিলের পরিধি হ্রাস পেয়েছে অনেকখানি। উল্লিখিত কারণ ছাড়াও দেখা গেছে জাতীয় প্রয়োজনে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের একটি মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে চলনবিলের দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা দখল করে। এ দীর্ঘ রাস্তাটি নির্মিত হওয়ার ফলে এলাকাবাসী উপকৃত হলেও চলনবিলের আয়তন হ্রাস পেয়েছে বেশ খানিকটা। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা গেছে, এ ধরনের রাস্তা নির্মাণের পেছনে প্রথমে ভূমিকা নিয়েছেন স্থানীয় লোকজনই। তারা বিলের পানি শুকিয়ে গেলে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াত করতে প্রথমে মেঠোপথ তৈরি করেন। তারপর স্থানীয় সরকারের কাছে সেসব স্থানে সড়ক নির্মাণের দাবি রাখেন। একটা সময় এলাকাবাসীর দাবি পূরণ হয়ে জন্ম নেয় নতুন সড়কের। আর সেটি এক সময় পরিণত হয় মহাসড়কে।
আগেই বলেছি চলনবিল আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি। অবশ্যই বলা যায়, বাংলাদেশের নিম্ন জলময় ভূ-ভাগের মধ্যে একমাত্র চলনবিলই আয়তনের দিক দিয়ে সর্ববৃহৎ। এ অঞ্চলের মানুষের অভিমত চলনবিল হচ্ছে তাদের জন্য শস্যখনি, বাস্তবেও কিন্তু তাই। কারণ এখানকার মাটি বেশ উর্বরা। বিল শুকিয়ে এলে উর্বরা মাটিতে কৃষকরা ধানের চারা রোপণ করেই উল্লাস করে। কারণ তারা জানে স্বল্প ব্যয়ে তাদের গোলা ভরে যাবে সোনালি ধানে। শুধু তাই-ই নয়, বর্ষার শেষ নাগাদ পর্যন্ত চলে এখানে মাছ ধরার মহোৎসব। সেই হিসেবে বলা যায় চলনবিলকে মৎস্যখনিও। এখানে রয়েছে দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভান্ডার। কী মাছ নেই এখানে? রুই, কাতল, চিতল ও বোয়াল থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি পর্যন্ত এ বিলে কিলবিল করে। বিল এলাকার গৃহস্থদের এ সময় মাছ ক্রয়ের প্রয়োজন পড়ে না। জেলে সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তারাও মাছ শিকার করে নিজেদের পারিবারিক চাহিদার জোগান দেয়। চলনবিলে ইদানীং আরেকটি ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। সেটি হচ্ছে ঝিনুক-মুক্তার বাণিজ্য। জানা গেছে, এ বিলের জলে প্রাকৃতিক নিয়মে ঝিনুকের পেটে প্রচুর মুক্তার জন্ম হয়। এলাকার বেকার নারীরা ঝিনুক কুড়িয়ে পেট চিড়ে মুক্তা সংগ্রহ করে বড় বড় কারবারির হাতে তুলে দেয়। অপরদিকে মাছচাষিদের হাতে তুলে দেয় ঝিনুকের মাংস। বিনিময়ে তারা উপার্জন করে নগদ অর্থ।
সারা দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে যখন পানি সঙ্কট দেখা দেয়, তখন চলনবিলের গড় গভীরতা থাকে তিন ফুট। অপরদিকে নদীগুলোতে সারা বছরের গড় গভীরতা থাকে ৮-১২ ফুট, যা আমাদের জন্য প্রকৃতির একটি বিশেষ উপহার বলা যায় অথচ আমরা তার সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না।
সম্প্রতি জানা গেছে, পর্যটকদের সুবিধার্থে বিল এলাকায় কেউ কেউ মোটেল নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা করছে। সেটির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে এলাকার যুবসম্প্রদায়। তাদের ধারণা হোটেল-মোটেল জাতীয় কিছু হলে বিপর্যয় নেমে আসবে চলনবিল এলাকায়। আমরা জানতে পেরেছি বিষয়টি মাথায় এনে এলাকার যুবসম্প্রদায় কিছুটা সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আমাদের কামনা, চলনবিল রক্ষার্থে যেকোনো ধরনের বাধা মোকাবেলা করার শক্তি-সাহস অর্জন হোক তাদের। বাস্তবায়িত হোক তাদের দৃঢ়প্রত্যয়। পাশাপাশি আমরা প্রশাসনেরও শুভদৃষ্টি কামনা করছি যেন ঐতিহ্যবাহী চলনবিলকে সংকুচিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন তারা। কারণ এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটি শুধু রাজশাহী বিভাগবাসীরই অহঙ্কার নয়, এটি দেশবাসীর অহঙ্কার।
আর হ্যাঁ, শুধু চলনবিলই নয়, দেশের অন্যান্য স্থানের জলাশয়গুলোরও করুণ অবস্থা। গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করছে মানুষ। আবাসন, ফ্যাক্টরি ও দোকানপাট গড়ার মানসিকতায় নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করছে দ্রুত। মানুষের অধিক লোভের কারণে জলাশয়ের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন আজ। ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে জলাশয়গুলো। এসব রক্ষার্থে আমাদের যুবসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। জনমত গড়ে তুলতে হবে। প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে, তবে কিছুটা হলেও সুফল বয়ে আসবে। না হলে একদিন মানচিত্র থেকে জলাশয়গুলো হারিয়ে যাবে, তখন আপসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।

ষ কথাসাহিত্যিক






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]