ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১ ৫ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার  বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১

কী লেখা আছে হাজার বছরের পুরনো ভিমের পান্টিতে?
অরিন্দম মাহমুদ নওগাঁ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৯.০৫.২০২০ ২:৪৪ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 340

ধামইরহাট উপজেলার পূর্ব প্রান্তে জয়পুরহাট জেলার সীমানা ঘেঁষে জাহানপুর ইউনিয়নের মুকুন্দপুর হরগৌরী এলাকায় দেখা যায় একটি মাঝারি আকারের ঢিবি। সেখানে ১৪টি বিভিন্ন আকারের পুকুরও রয়েছে। ধামইরহাট উপজেলা থেকে ৭-৮ কিলো পূর্বদিকে মঙ্গলবাড়ী নামক বাজার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে মুকুন্দপুর গ্রামে হরগৌরী মন্দির বা ভিমের পান্টি অবস্থিত।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই হাজার বছর আগে বীরেশ্বর-ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক এ ঢিবিতে একটি কালো পাথর উৎকীর্ণ মাঝারি আকারের মূর্তি পেয়েছিলেন। তাই তিনি ওই ঢিবির ওপর ছোট আকারের চারটি মন্দির নির্মাণ করে ওই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে সময় ঢিবির ওপর উত্তর-পশ্চিম কোণে ২ দশমিক ৩৯ মিটার ও ৯১ সেন্টিমিটার পরিসরের এক কোঠা বিশিষ্ট একটি পূর্বমুখী স্থাপনা ছিল। ১৯৭৮ সালে ওই ঢিবি থেকে একটি চোকলাতলা কালো পাথরের উমা মহেশ্বর মূর্তি উদ্ধার করে তা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ওই ঢিবির দক্ষিণে ৫৮ সেন্টিমিটার দূরত্বে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা অনুরূপ আরও একটি ভাঙা দেওয়াল ছিল। সেই দেওয়ালের উচ্চতা ১.২২ মিটার। এগুলোকেই বীরেশ্বর ব্রহ্মচারী স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায়।
বর্তমানে এগুলোর নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করে সেখানে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। ঢিবির পাদদেশ থেকে চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি শুরু। দূরে একটি উঁচু পাড়ওয়ালা পুকুরও রয়েছে। তবে এ প্রত্নস্থলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো এক পায়ে দারিয়ে থাকা একখণ্ড একটি কালো পাথরের পিলার বা থোম্বা। এটির নামই ভিমের পান্টি। যা ঢিবিটি থেকে মাত্র ৮১ মিটার দক্ষিণে ফসলি জমির মাঝে সামান্য হেলে সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয়দের কাছে এটি ভিমের পান্টি আবার কেউ কেউ কৈবর্ত রাজার ভিমের লাঠি বলে থাকেন। ভিমের লাঠিটি দেখতে অনেকটা প্রলম্বিত মোচার মতো। এ থামের গা অত্যন্ত মসৃণ। পাদমূলে এর বেড় ১.৮০ মিটার বর্তমান উচ্চতা ৩.৭৯ মিটার। লোকমুখে জানা যায়, অতীতে এর ওপর একটি বিষ্ণুর বাহন অর্ধ নর ও অর্ধ পাখির মূর্তি বসানো ছিল। কিন্তু বজ্রপাতের আঘাতে সেটি নিশ্চিহ্ন হওয়াসহ পিলার বা থোম্বার মূল অংশের অর্ধেক একটি ফালি ধসে গেছে। তবে অক্ষত থাকা অংশের ৫৬.৭ সেন্টিমিটার ও ৪৯.৩ সেন্টিমিটার পরিমাপের একটি চতুষ্কোণাকার ওপরের অংশে আজও ২৮ পঙতির একটি সংস্কৃত ভাষ্য উৎকীর্ণ রয়েছে। এ পিলার বা থোম্বাটি নাকি বরেন্দ্রের পাল রাজা নারায়ণ পালের মন্ত্রী ভটুগুরুভ ৮৯৬-৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে ওই রাজবংশসহ মিশ্র বংশপঞ্জি বর্ণিত রয়েছে। এটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে। অযত্ন-অবহেলায় বিলুপ্তির পথে হাজার বছরের ঐতিহাসিক এই ভিমের পান্টির সঠিক ইতিহাস উম্মোচন না হওয়ায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি যতটুকু জানি এখানে রংপুর অথবা দিনাজপুরের কোনো এক রাজার রাজবাড়ির শাখা ছিল। তার একটা বরকন্দাজ ছিল, পাশের ওই উঁচু ঢিবিটি রাজবাড়ির মতো ছিল। সেই উঁচু ঢিবিতেই ছিল বরকন্দাজের বাসা। পাসেই তাদের একটি মণ্ডপ ছিল বর্তমানে সেখানে মন্দির গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ভিমের পান্টিটি ছিল তাদের নিশান। এখনকার মানুষ এটিকে বিষধর মহাদেবের ভিমের পান্টি বলে। ভিম রাজাদের এই নিশানের মাঝেই অজানা অনেক ইতিহাস রয়েছে। পিলারের নিচের যে লেখাটি রয়েছে তা আজও কেউ পড়তে পারেনি, অনেক বিদেশি লোকজন এসেছে কিন্তু এর সঠিক ইতিহাস এখন পর্যন্ত কেউ বের করতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, মজার বিষয় হচ্ছে বর্ষার সময় বিদ্যুৎ চমকালে এই নিশানের ওপরেই এসে বিদ্যুৎ পরে। সে কারনে ঐতিহাসিক ভিমের পান্টিটি অনেকটা ভেঙে ছোট হয়ে গেছে কিন্তু এর ভাঙা অংশ আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজেও পায়নি। এমনকি আমিও অনেক দেখার চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি। সত্যি কথা বলতে ভিমের পান্টিকে নিয়ে অনেক অনাবিষ্কৃত ইতিহাস রয়েছে।
বড় শিবপুর দীঘি পাড়ার বাসিন্দা যোগেন্দ্রনাথ বলেন, ছোটবেলায় বাপদাদারা বলতো এক সময় এখানে ভিম হাল চাষ করত। একদিন ভিমের পিপাশা লাগলে সে তার হাতে থাকা গরু খেদার লাঠিটি মাটিতে পুঁতে রেখে পানি খেতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন মাটিতে পুঁতে রাখা সেই লাঠিটি বিশাল আকৃতির পিলার বা খুঁটির রূপ ধারণ করে। এই পিলারটিতে অনেক চুম্বক শক্তি রয়েছে। যার ইতিহাস এখনও অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে।
মঙ্গলবাড়ী সাহিত্য আড্ডা সংগঠনের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভিমের পান্টি বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রাচীন নিদর্শনটি এখনই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এখানে কালীমন্দির, শিবমন্দির, হরগৌরী মন্দির এবং ভিমের পান্টি থাকায় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে।
ভিমের পান্টি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি বিজয় চন্দ্র মণ্ডল বলেন, হিন্দুদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থান। কিন্ত এখানে পাকা রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই এবং লোকজনের থাকার কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় পুণ্যার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণপতি রায় বলেন, ভিমের পান্টি সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া সেখানে তিনটি মন্দির থাকায় ওই রাস্তাটি অচিরেই পাকাকরণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং মানুষের থাকার সুব্যবস্থার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]