ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৩ জুন ২০২০ ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৩ জুন ২০২০

কেনাকাটা নাকি জীবন কোনটি বেশি প্রয়োজন?
ফারাবী বিন জহির
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 10

দেখতে দেখতে রমজান শেষ হয়ে এলো। সামনে খুশির ঈদ। রমজানের সারা মাস রোজা রাখার পর ঈদ মানুষের মনে নিয়ে আসে নির্মল আনন্দ, ঘরে ঘরে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী ঈদ উৎসবে মেতে ওঠে। ঈদকে কেন্দ্র করে শুধু ঈদের দিন নয়, ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় বিশাল আয়োজন। ধনী-গরিব যে যার সাধ্য অনুযায়ী ঈদের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ঈদকে ঘিরে যে বিশাল আয়োজন চলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন, এবারে আমরা ঈদ উদযাপন করবো সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। কারণ মার্চ মাস থেকে আমরা ভয়ানক এক ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলছি। করোনা নামের ভাইরাসটি শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো পৃথিবীকেই তটস্থ করে রেখেছে।
পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে এই ভাইরাস তার পদচিহ্ন ফেলেনি। করোনা নামের এই ভাইরাসের কারনে পৃথিবী জুড়ে মানুষ আতঙ্কিত দিন কাটাচ্ছে। স্থবির হয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতি। এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে মানবজাতি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও এসেছে। থমকে গেছে জীবনের গতি, থমকে গেছে অর্থনীতির চাকা। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় তারপর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ করোনার সংক্রমণের আশঙ্কায় এক অস্থির সময় পার করছে। প্রতিদিন শনাক্ত হচ্ছে করোনা রোগী এবং দিন কে দিন এই শনাক্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলছে।
তবে এত কিছুর পরও জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে কোন ভ্রæক্ষেপ নেই। আমরা যেন রামের হরধনু ভাঙার মতো পণ করেছি, আমরা সব স্বাস্থ্যনীতি অবজ্ঞা করে করোনাকে জয় করেই ছাড়ব। আমরা এক রকম প্রতিজ্ঞাই করেছি যে আমরা প্রমাণ করবই আমরা করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কাদম্বিনী কে যেমন মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল তিনি মরেন নাই আমাদের ভাবখানাও ঠিক সেই রকম যে, আমরা মরে গিয়ে হলেও প্রমাণ করব আমরা করোনাকে ভয় পাই না। এই যে করোনা নামক ভাইরাস দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পরেছে তার পুরো কৃতিত্ব কিন্তু আমাদের। করোনা ভাইরাস একা একা কোথাও যেতে পারে না তার সংক্রমণের জন্য মাধ্যম প্রয়োজন হয়।
আমরা বরং এই ভাইরাসকে দাওয়াত দিয়ে আমাদের জেলাগুলোতে নিয়েছি। দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর যখন সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করা হলো তখন আমরা সদলবলে সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে গিয়েছি, ছুটি পাবার আনন্দে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি, কারণে অকারণে বাসা থেকে বের হয়ে জমায়েত সৃষ্টি করেছি, আড্ডা জমিয়েছি।
স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে সৃষ্ট আপদকালীন ছুটিকে রীতিমতো উৎসবের ছুটি বানিয়ে আমরা এক প্রকার নিমন্ত্রণ করে করোনাভাইরাসকে প্রতিটি জেলায় আসার পথ সুগম করেছি। এ যেন বহুদিনের কাক্সিক্ষত অতিথিবরণ করে নেওয়া।
আমাদের স্বাস্থ্যবিধিকে তোয়াক্কা না করে করা গোয়ার্তুমির কারণে যখন করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে চলছিল তখনও আমাদের হুঁশ ফেরেনি। বরং আমাদের গোয়ার্তুমির পরিমাণ এতই বেড়েছে যা অষ্টম সপ্তাহ থেকে দশম সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণের সংখ্যাকে তিনগুণ করেছে। এমনকি সংযমের মাস রমজানেও আমরা চরম অসংযমের পরিচয় দিয়েছি। যেহেতু রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা রোজা রাখে তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং দেশের ভ্রাম্যমাণ লোকদের ইফতারের কথা চিন্তা করে দেশের হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো ইফতার বিক্রির জন্য খোলা ছিল।
সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাহারি ইফতার করার জন্য দোকানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে লাইন দিয়েছি। অপ্রয়োজনে শুধু রসনার তৃপ্তির জন্য এবারে খাবার কিনতে যাওয়া ছিল সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। রসনা মেটাতো কেনা খাবারের জন্য আমরা শুধু নিজেকে না, বরং নিজের পরিবার এমনকি প্রতিবেশী অন্যান্য রোজাদারদেরও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে দ্বিধা করিনি। এত দিনে কারোই অজানা ছিল না যে কেউ করোনা আক্রান্ত হওয়া মানে তার পরিবার এমনকি প্রতিবেশীও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পরে। এসব জানা সত্বেও আমরা সংযমের মাসে চূড়ান্ত অসংযমের পরিচয় দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করিনি।
সর্বশেষ যে কাজটিকে কেন্দ্র করে আমাদের দিতে হচ্ছে চরম মূল্য তা হচ্ছে ঈদের কেনাকাটা। যে সময়ে দেশে শনাক্তকৃত সংক্রামিত ব্যক্তির সংখ্যা ২০ হাজারের অধিক সেই সময় যেন কেনাকাটার ঢল নেমেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। আমরা যে কত অবিবেচক হতে পারি তা এই ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি লালমনিরহাটে করোনা আক্রান্ত এক যুবকের ঈদের কেনাকাটা করার ঘটনা কিংবা নোয়াখালীতে করোনা আক্রান্ত দোকানদারের দোকান খুলে ব্যবসা করার ঘটনা।
এই ধরনের ঘটনা জাতির জন্য কি ভয়াবহ দিন আনতে পারে ভাবলেই গা শিউড়ে ওঠে। আমরা যারা দিনের পর দিন নিজেকে, পরিবারকে এবং সমাজকে ঝুঁকির মুখে ফেলে একের পর এক বদ্ধউন্মাদের মতো আত্মঘাতী কাজ করে চলেছি তারা কি কখনও ভেবে দেখেছি আমাদের এই কাজের কারণে জাতির কাছে আমরা এক আত্মঘাতী নর
কীট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হব?
হয়তো একটি নতুন জামা ছাড়া এই বারের ঈদ আমরা পার করতে পারব কিন্তু কোনো কারণে ঈদের কাপড় কিনতে গিয়ে যদি স্বজন হারাতে হয় তাহলে সেই স্বজন হারানোর বেদনায় আমরা আর জীবনের কোনো ঈদই ঠিকমতো পালন করতে পারব না। তাই সময় থাকতে সিদ্ধান্ত নিতে
হবে যে, আমাদের কাছে কোনটি বেশি মূল্যবান? নিজের এবং নিজের পরিবারের জীবন নাকি নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কেনাকাটা নামক ধু ধু মরীচিকা?

ষ লেখক ও গবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]