ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ মে ২০২০ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২৫ মে ২০২০

মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় উৎসব
ঈদুল ফিতর : করণীয় ও বর্জনীয়
আমিন ইকবাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 81

‘ঈদ’ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব। উৎসব মানেই হাসি-খুশি আর আনন্দ। ঈদের দিন মুমিন-মুসলমানরা আনন্দ উৎযাপন করে থাকেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে খুশি ভাগাভাগি করেন। উচ্ছ্বাস প্রকাশের মধ্য দিয়ে মেতে ওঠেন ঈদ আনন্দে। প্রায় সাড়ে ১৪শ বছর আগে থেকে এ উৎসব পালন করে আসছে বিশ^ মুসলিম সমাজ। হাদিসে বর্ণিত, রাসুল (সা.) হিজরত করে মদিনায় এসে দেখেন মদিনাবাসী বছরে দুদিন আনন্দ উৎসব পালন করে। সেই উৎসব সম্পর্কে রাসুল (সা.) জানতে চাইলে তারা জানায়, জাহেলি যুগ থেকে আমরা এ দুদিন উৎসব পালন করে আসছি। পরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের এই দুদিনের বদলে আরও উত্তম দুদিন দিয়েছেন উৎসবের জন্য। সে দুদিন হলোÑ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।’ (আবু দাউদ : ১/১৬১)। সেদিনের পর থেকে মুসলিম জাতি বছরে দুটি ঈদ উৎসব পালন করে আসছে স্বমহিমায়, সগৌরবে। ঈদ যেমন আনন্দের; তেমনি ইবাদতেরও। ঈদের দিন বেশ কিছু আমল রয়েছেÑ যার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। একই সঙ্গে সমাজে প্রচলিত কিছু কাজ রয়েছেÑ যার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব পরিহার করা চাই। নিচে ঈদুল ফিতরের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
করণীয় আমল
ঈদের দিন গোসল : ঈদের দিন সকাল সকাল গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। কারণ এ দিনে নামাজ আদায়ের জন্য মুসলমানরা ঈদগাহে একত্র হয়ে থাকে। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (বায়হাকি : ৫৯২০)
উত্তম পোশাক ও সাজসজ্জা : ঈদে উত্তম জামাকাপড় পরিধান করে ঈদ উৎযাপন করা। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) দুই ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার আগে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ (যাদুল মায়াদ)। সামর্থ্য থাকলে নতুন পোশাক পরবে, অন্যথায় নিজের পরিষ্কার উত্তম পোশাক পরবে। হজরত নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দিন উত্তমভাবে গোসল করতেন, সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করতেন, নিজের সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন। অতঃপর নামাজে যেতেন। (শরহুস সুন্নাহ : ৪/৩০২)
সদকায়ে ফিতর আদায় : সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য নিজের ও অধীনস্থদের পক্ষ থেকে ঈদুল ফিতরে সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। অভাবি মুসলমানরা এই সদকার হকদার। সদকায়ে ফিতর আদায়ের উত্তম সময় হলো (ঈদের) নামাজে যাওয়ার আগে আদায় করা।
ঈদের নামাজ আদায় : ঈদের দিন সকালে পুরুষদের জন্য ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। বিশেষ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত তাকবিরসহ জামাতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা এবং তারপর ঈদের খুতবা দেওয়া ও শ্রবণ করা। ঈদের নামাজ খোলা ময়দানে আদায় করা উত্তম।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় : ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরীয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যেমনÑ ১. হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরামরা ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেনÑ ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ অর্থ- আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন; ২. ঈদ মোবারক ইনশাল্লাহ; ৩. ‘ঈদুকুম সাঈদ’ বলেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।
মুসাফাহা ও মুয়ানাকা : মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলি (রা.) নবী কারিম (সা.)-এর কাছে এলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করলেন।’ (শারহুস সুন্নাহ)
ঈদের তাকবির পাঠ : তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়। তাকবির হলোÑ ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহ আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ বাক্যটি উচ্চঃস্বরে পড়া। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন।’ (মুসতাদরাক : ১১০৬)
ঈদে খাবার গ্রহণ : ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের নামাজ আদায়ের আগে খাবার খাওয়া এবং ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে কিছু না খেয়ে নামাজ আদায়ের পর কোরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী কারিম (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে খেতেন না।’ (তিরমিজি : ৫৪৫)
এতিম ও অভাবিকে খাওয়ানো : ঈদের দিন এতিমের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা দাহার : ৮)
আত্মীয়-স্বজনে খোঁজ নেওয়া : ঈদের সময় আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। পাশাপাশি প্রতিবেশীরও খোঁজখবর নেওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক কর না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পাশর্^বর্তী সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদের, যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ (সুরা নিসা : ৩৬)
মনোমালিন্য দূরীকরণ : জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারও কারও সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে, দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে প্রথম সালাম দেয়।’ (মুসলিম : ৬৬৯৭)
আনন্দ প্রকাশ : ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে এলেন, তখন আমার কাছে দুটি ছোট মেয়ে গান গাচ্ছিল বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এরই মধ্যে আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কথা শুনে বললেন, ‘মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (বুখারি : ৯৫২)
বর্জনীয় কাজ
ঈদে করণীয় বিষয়ের মতো বর্জনীয়ও কিছু বিষয় রয়েছে। সেগুলো হলো-
ঈদের দিন রোজা : রোজা রাখলে ঈদের দিনের কাজগুলো যথাযথ পালন করা যাবে না। সে জন্য হাদিসে ঈদের দিন রোজা রাখা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ এসেছে। হাদিসে আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম : ২৭৩০)
বিজাতীয় আচরণ প্রদর্শন : ঈদকে কেন্দ্র করে বিজাতীয় আচরণ মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদে, চাল-চলনে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে অমুসলিমদের অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে মুসলমানদের অনেকেই। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩৩)
খোলামেলা পোশাকে নারী : ঈদের দিন নারীরা ব্যাপকভাবে বেপর্দা অবস্থায় রাস্তাঘাটে খোলামেলা ঘোরাফেরা করে। এ থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের অধীন মেয়েদেরও বিরত রাখতে হবে। এ বিষয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন মুর্খতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব : ৩৩)
অপচয় ও অপব্যয় : ঈদের কেনাকাটা থেকে শুরু করে এ উপলক্ষে সব কিছুতেই অপচয় ও অপব্যয় করা হয়। অথচ কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা কোনোভাবেই অপব্যয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)। আরও বলা হয়েছে, ‘এবং তোমরা খাও, পান কর এবং অপচয় কর না।’ (সুরা আরাফ : ৩১)
মদ ও আতশবাজি : ঈদের আনন্দে মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, আতশবাজি করাÑ শরীয়তবিরোধী কাজ। শুধু ঈদ নয়, অন্য কোনো দিনও এসব করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তিরগুলো
তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা মায়েদা : ৯০)
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]