ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ৩১ মে ২০২০ ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ৩১ মে ২০২০

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ভাবনা
ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 25

এক ঘোর অমানিশারকালে জুন মাসে নতুন বাজেট আসছে। বাংলাদেশ সরকার বৈশ্বিক মহামারীকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চেষ্টা করছে মোকাবিলার জন্য। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট এক ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক তাণ্ডবের সময়ে দেশে ঘোষিত হতে যাচ্ছে। বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সম্প্রতি পত্রিকান্তরে যথার্থ করণীয় কী সে সম্পর্কে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে বক্তব্য রেখেছেনÑ যা থেকে কিছু সুপারিশমালা সরকার গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, জাতীয় বাজেট সামগ্রিক অর্থনীতির হালখাতা অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের দিকনির্দেশনা করে থাকে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশের বিত্তবানরা যখন ভালো সময়ে ব্যবসাবাণিজ্য, আয় করেন তখনও ঠিকমতো কর দেন না। ফলে কর আদায় করাটি খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। দেখা যাচ্ছে যে, মার্চ পর্যন্ত চলতি বাজেটের টার্গেটের ১০ শতাংশের কম আদায় হয়েছে। কিন্তু লক ডাউন ও বৈশ্বিক মহামারি শুরু হওয়ার পর কিছুই করার থাকে না। কেননা, কর্মহীন ও আয়প্রবণ মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অবস্থা একই। তারপর জাতীয় বাজেট যেটি ঘোষণা করা হতে যাচ্ছে, তাতে অর্থনীতিকে বাঁচানোর সব ধরনের প্রয়াস রাখতে হবে।
একদিকে মানুষের যেন মর্মান্তিক মৃত্যু না ঘটে সেদিকে সরকার যেমন সতর্ক, তেমনি অর্থনীতি এই আপৎকালীন দূরবস্থায় সচল রাখার দুরূহ কাজটিকে গতিময়তা দিতে বাজেটে দিক নির্দেশনা থাকতে হবে। এবারের বাজেট হতে হবে ভিন্নমাত্রার। এ বাজেটটি বঙ্গবন্ধুর আমলের প্রথম বাজেটের আদলে গঠিত হতে হবে। তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, উদারীকরণ নীতি, বিশ্বায়ন নীতি থেকে খানিকটা হলেও সরে আসতে হবে। এবারের বাজেটের মূল উপজীব্য হতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনীতিকে সচল করা এবং স্থানীয়ভাবেই কর্মহীনদের কর্মসংস্থান করা। আসলে গ্রামকে স্মার্ট শহর বানানোর আওয়ামী লীগ যে উদ্যোগ নিয়েছিল, এবার সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
কেননা, অভ্যন্তরীণ স্থানীয় পুঁজিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে কাজে লাগানোর জন্য প্রশাসনকে কাজ করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা স্থানীয় পর্যায়ে যাতে গড়ে ওঠে এবং আমদানি বিকল্পায়ন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যেহেতু সমগ্র বিশ্ব একটি সঙ্কটকালীন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেহেতু প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষে আগের মতো অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ অফিসিয়াল চ্যানেলে পাঠিয়েছিল, তা দুই-তৃতীয়ংশে নেমে আসার আশঙ্কা আগামী অর্থবছরে আছেÑ এটি মনে রাখতে হবে। কোথায় কোথায় অর্থ পাওয়া যাবেÑ তার বাস্তবতা মাথায় রেখে বাজেট প্রণীত হবে বলে আশা করা যায়। কেননা, এ বৈশ্বিক তাণ্ডবে ধনী-দরিদ্র উভয় শ্রেণিই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পর্যায়ে যতটুকু সম্ভব কৃচ্ছ্রতা সাধন করা বাঞ্ছনীয়।
সরকার যে দশটি যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে সেগুলোতেও এখন কাটছাঁট করতে হবে। এ দুঃসময়ে বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠী ও সাহায্য সংস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুদান ও ঋণ অর্থ-সংস্থানের একটি বড় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
এক্ষেত্রে এডিবির পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ব্রিকস ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে শর্তহীন ঋণ ন্যূনতম খরচে কতটুকু পাওয়া যায়, সে জন্য প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি বিদেশে ধনবান রয়েছেন তারাও যাতে একটি নির্দিষ্ট ফান্ডে অর্থ দেয় এবং তাদের প্রেরিত অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে মানুষের উপকারে আসে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
যখন কোনো প্রবাসী কোনো অনুদান দেয়, সে আশা করে তার অর্থটি যাতে সদ্ব্যবহার হয়। যারা এ দুঃসময়ে ত্রাণ তছরূপ করবেন তাদের জন্য কেবল অর্থ জরিমানা নয়, বরং মৃত্যুযোগ্য অপরাধের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করা দরকার। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে এদেশে পুঁজিবাজারের নামে কেবল শেয়ারবাজার কাজ করছে সেহেতু পুঁজিবাজারকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সব কার্যক্রম স্থগিত করা দরকার। শেয়ারবাজার ঠিক করার নাম করে কয়দিন পর পর অর্থ নিয়ে গিয়ে যে ধরনের ভেল্কি দেখাচ্ছে তার ধূম্রজাল কেটে বেরোতে হবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনে শেয়ারের অভিহিত মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া দরকার। যেসব খাতে দেশি প্রতিযোগীরা নেই, সেক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। যারা ঋণ খেলাপি তারা যে অংশটুকু এই দুঃসময়ে পরিশোধ করবে, তাতে তাদের ওপর কোন সুদ নেওয়া হবে না বিধান রেখে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে যারা বিদেশকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে বৈধ বা অবৈধ যে ভাবেই অর্থ প্রেরণ করে থাকুন না কেন, তারা সে অর্থ দেশে ফেরত আনতে চাইলে সে অর্থের জন্য আবার কোন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ বা জরিমানার আওতায় যাতে না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অন্যদিকে কালো টাকা সাদা করার বিধান, সে আবাসন খাতেই হোক কিংবা কর্মহীন মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কিভাবে ছোটখাটো শিল্প, কৃষিনির্ভর শিল্প অথবা মাঠে নির্দিষ্ট ফসলের বাইরে ও অন্যান্য ফসল তরিতরকারি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যাতে লাগানো যায়, সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা যুদ্ধকালীন সময়ে প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকার পার্সেল ট্রেন চালু করেছে, এটি একটি ভালো উদ্যোগ।
কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে যেসব উৎপাদনকারী আছেন তারা অনেকেই তা জানেন না। এ জন্য দরকার হচ্ছে বিনামূল্যে ইলেক্ট্রনিক-প্রিন্ট মিডিয়া ও রেডিওতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পার্শেল ট্রেনের মাধ্যমে শহরে পণ্য সরবরাহ করার সুবিধা সম্পর্কে জ্ঞাত করা। অনেক জায়গায় লকডাউনের কারণে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাজার খোলা না থাকায় পাইকাররা বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন না। এ দূরবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরাসরি সংগ্রহ করা যায়, তার জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকতে হবে। আবার কেউ যদি গ্রামীণ অঞ্চলে বা কোথাও নিজস্ব সম্পত্তিতে কোন শিল্প স্থাপন করতে আগ্রহী হয়, তা হলে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া দরকার। সরকার ডাক্তার এবং নার্স নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেÑ যা খুবই যুক্তিসঙ্গত। আগামী অর্থবছরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং বায়োটেকনোলজিস্ট নিয়োগ করার জন্য পদ সৃষ্টি করতে হবে। বর্তমানে ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ১৭টি জেলায় আইসিইউ আছে বাদ বাকি জেলাগুলোতেও আইসিইউ সৃষ্টির জন্য অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা আগামী বাজেটে করতে হবে।
বৈশ্বিক মন্দার ঢেউ যাতে দেশে না লাগে সে জন্য সরকার যেসব প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক বরাদ্দ আগামী বাজেটে রাখতে হবে। চলতি অর্থবছরে পিকেএসএফের অর্থ বরাদ্দ প্রায় নেই। অথচ পিকেএসএফের যেসব উদ্ভাবনীমূলক কার্যক্রম ও সৃজনশীল ধীশক্তি রয়েছে যেমন, সমৃদ্ধি কার্যক্রম, পেইসসহ সেগুলোর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া গেলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ৩১টি প্রণোদনা প্যাকেজের অনেকগুলোই টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যাবে। এদিকে বিএনএফ (বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন) সরকারি অনুদানের টাকা বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে উপকারভোগীদের মধ্যে দিয়ে থাকে। তারা অবশ্য কেবল ক্ষুদ্র এনজিও নিয়ে কাজ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির কোন ভিশন-মিশনও নেই, তবে তাদের অনুদান যথার্থ অর্থে দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছে। বিএনএফের জন্যে আর্থিক বরাদ্দ তিনগুণ করা দরকার। তাহলে তাদের যে উপকারভোগী ১১২০টি এনজিও আছে, যেগুলোর মধ্যে ৮০০ এর মতো এনজিও বাস্তবে কাজ করে থাকে- সেগুলো যেন দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করতে পারে। আবার গবাদি পশু লালন পালনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া দরকার, যেহেতু সামনে ঈদুল আযহা আসছে।
স্থানীয় পর্যায়ে যাতে মঙ্গা না হয় সে জন্য বাম্পার ধান উৎপাদন হলেই হবে না, বরং সরকার যেভাবে সংগ্রহ করছে তা যেন বণ্টন করা যায়। ৬৪টি জেলার যতগুলো উপজেলা আছে তার আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে কোনো একটি ব্যাংককে অথবা পিকে এসএফের কোন একটি সহযোগী এনজিওকে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
ওই অঞ্চলে যাতে টেকনোলজি ট্রান্সফার, অভ্যন্তরীণ পুঁজির প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সুন্দরভাবে ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যে ধারণাগুলো দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী বাজেট অর্থবরাদ্দ ও দিক-নির্দেশনা এবং বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। ত্রাণ কর্মসূচিকে আরও
গুরুত্বের সঙ্গে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। বাংলাদেশ এক্সটেনশন এডুকেশন সার্ভিসের ওপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালামের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল।
তিনি মনে করেন যে, এনজিওরা যেভাবে নতুন কারিগরি কৌশল ও লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার করছে, তা যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করা যায় তবে কর্মহীনরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
যদিও বাজেট হচ্ছে রাজস্বনীতির ওপর মূলত ভিত্তি করেÑ কিন্তু বাজেটে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের সংস্থান করতে হবে। যারা ফ্রন্ট লাইনে ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আর্মি, ব্যাংকার, পোস্ট অফিস, সাংবাদিক, জরুরি রফতানি কাজ করছে তাদের জন্য যেন বীমা কোম্পানি সুস্পষ্ট নীতিমালায় বীমার ব্যবস্থা রাখেন। বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্যÑ লাইফ এক্সপেনটেন্সি বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর। অথচ এদেশে বীমা কোম্পানিগুলো ৫৫ বছরের পর বীমা প্রকল্প নেই বললেই চলে। এ ব্যাপারে বাজেটে একটি দিকনির্দেশনা থাকতে হবে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত, আরেকটি ৬১ বছর থেকে ৭২ বছর পর্যন্ত বয়সের লোকদের বীমা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ষ অধ্যাপক, ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল
     ইকোনমিস্ট





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]