ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২০ ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২০

প্রবাসফেরতরা ভালো নেই
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 17

সৌদিতে ১৯ বছর ধরে ছিলেন নোয়াখালীর মানিক মিয়া। সেখানে একটি দোকানে কাজ করতেন। গত ১২ মার্চ করোনার কারণে দেশে ফেরত এসেছেন। ফেরত আসার সময় টাকাপয়সা নিয়ে আসতে পারেননি বলে দেশে এসে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। ঋণ প্রায় লাখখানেক করেছেন। আগে যারা ধার দিয়েছে তারাও এখন দিচ্ছে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, স্বজনদের কাছে আর কত চামু, তারা তো নিজেরাই খাইতে পারে না, কয় তোমারে কী দিমু! কবে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন তা নিয়েই সন্দিহান তিনি। তবে সরকার থেকে ঋণ পেলে তিনি দেশে ছোট একটি ব্যবসা করবেন এবং সংসারটা সচল রাখবেন বলে জানান। নোয়াখালীর মাইজদীর আরেক মনির হোসেন। তিনি গত ১০ বছর থেকে থাকতেন ইতালিতে। সেখানে করোনা পরিস্থিতির কারণে তাড়াহুড়ো দেশে চলে আসেন। কিন্তু দেশে ফিরে এখন সরষে ফুল দেখছেন। তিন ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী ও তিনি মিলে পাঁচ জনের সংসার চালানো এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকের কাছে ঋণ করেছেন। তার ওপর বড় ঋণের বোঝা রয়েছে। বিদেশ যাওয়ার সময় একটি এনজিও থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিলেও এখনও তা শোধ হয়নি। যার মাসিক কিস্তি প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
নোয়াখালীর মানিক ও মনিরের মতোই এখন বিদেশফেরত প্রবাসীদের অবস্থা। করোনার কারণে দেশে ফিরে তারা বিপাকে পড়েছেন। বিদেশ থেকে আনা টাকা শেষ হওয়ায় ধারদেনা করেই চলছেন তারা। করোনায় ভালো নেই প্রবাসফেরত কর্মীরা। বাংলাদেশে ফেরার পর থেকেই এসব শ্রমিকের বেশিরভাগ বেকার সময় কাটাচ্ছেন। কর্মের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় চাকরিও মিলছে না। ফলে ঘরে বসে সময় কাটছে। বিদেশ থেকে যা এনেছিলেন তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ, সংসার চালানোয় এখন অনেকে চোখে সরষে ফুল দেখছেন। পরিবারকে রক্ষায় ভবিষ্যতের জমানো অর্থও অনেকে তুলে খরচ করছেন। অন্যদিকে শরীয়তপুরের শিউলী বেগমের অবস্থাও একই। তিনি ৫ ফেব্রুয়ারি দেশে আসেন। গত ১৯ এপ্রিল তার সৌদিতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে আটকে গেছেন। স্বামী না থাকায় এই সময়ে তার সংসার খুবই কষ্টে চলছে। মা, বাবা, একমাত্র মেয়ে ও তিনি মিলে গড়ে ওঠা সংসারের জন্য যা আয় করেছিলেন সব শেষ।
প্রবাসফেরতরা কেমন আছেন এ নিয়ে সম্প্রতি একটি জরিপ চালিয়েছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ। এতে উঠে এসেছে, দেশের ৮৭ শতাংশ বিদেশফেরত শ্রমিকই বেকার সময় কাটাচ্ছেন। তাদের আয়ের কোনো উৎস নেই। তবে ফেরত আসা শ্রমিকদের অর্ধেকের এখন জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। আর এসব কষ্টের কথা প্রবাসীরা মুখ ফুটে লজ্জায় কারও কাছে বলতেও পারছেন না। জরিপে আরও উঠে এসেছে, ২৯ শতাংশ অভিবাসীর প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনেরা তাদের ফিরে আসাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি এবং তাদের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রদর্শন করেনি। অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ জানান, তাদের নিজেদের সঞ্চয় বলতে এখন আর কিছু নেই, ১৯ শতাংশ জানান, তাদের যে সঞ্চয় আছে তা দিয়ে আরও এক-দুই মাস চলতে পারবেন। নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে তিন মাস বা তার বেশি সময় চলতে পারবেন এমন সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। আর ১০ শতাংশ জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে তারা ঋণ গ্রহণ করেছেন। তবে ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ হয়নি। শুধু মে মাসের ১৯ দিনে ১০৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা। আর জানুয়ারি থেকে ধরলে মোট তারা পাঠিয়েছেন ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

৮৭ শতাংশেরই আয়ের কোনো উৎস নেই : কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির সময়ে দেশে ফেরত আসা অভিবাসী কর্মীদের ৮৭ শতাংশেরই এখন কোনো আয়ের উৎস নেই। নিজের সঞ্চয় দিয়ে তিন মাস বা তার বেশি সময় চলতে পারবেন এমন সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। ৫২ শতাংশ বলছেন, তাদের জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।  বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির ‘বিদেশফেরত অভিবাসী কর্মীদের জীবন ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি দেশের ১০টি জেলার ৫৫৮ জন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জরিপ পরিচালনা করেছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের জরিপ বলছে, গত মার্চে দেশে ফিরেছেন এমন শ্রমিকের সংখ্যা ৮৬ শতাংশ। আর এই জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ ‍এসেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান এবং কুয়েত থেকে। বাকিরা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরেছেন। ব্র্যাকের ২০ জন কর্মী ঢাকা, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, নরসিংদী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, খুলনা এবং যশোরে রয়েছেন এমন প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জরিপটি পরিচালনা করেন।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, আমরা দেখছি অনেকে ফেরত আসছেন। সামনের দিনগুলোতে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়ে ফিরে আসতে পারেন। সরকার তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজটি শুধু সরকারের একার নয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলে কাজটি করতে হবে। কারণ এই প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতি সবসময় সচল রেখেছেন। এমনকি করোনার সময়ও তারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন। এই সঙ্কটকালীন তাদের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়ে শরিফুল হাসান মনে করেন, ফিরে আসা প্রবাসী ও তাদের পরিবারের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিরূপণ করে মনঃসামাজিক সহায়তাসহ টেকসই পুনরেকত্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে সহজ শর্তে বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা, গন্তব্য দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো বন্ধ করা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা যেন কাজে ফিরতে পারেন সেই উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]