ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

ঈদ বাজার অর্থনীতিতে ধস, এবার ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়নি
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৩.০৫.২০২০ ২:৫০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 33

ইউসুফ একজন লন্ড্রি ব্যবসায়ী। ঈদের আগে চুল কাটাতে যেত পাশের সেলুনে। কিন্তু সেই সেলুন কখন খোলে, আবার এই কখন বন্ধ। যিনি চুল কাটতেন প্রচলিত নিয়মে ঈদের বকশিশ নেন। কিন্তু সেই বকশিশ থেকেও তিনি এবার বঞ্চিত হলেন।  এই মৌসুমে সেলুনের দোকানে চুল কাটানোর হিড়িক পড়ে যেত। আজ বেশিরভাগ সেলুনে ভিড় তো দূরের কথা, কেউ সহজে উঁকি দেয় না। ঢাকা শহরে সাধারণ সেলুনের বাইরে বেশ অভিজাত সেলুন রয়েছে। সেই সব অভিজাত সেলুনগুলোতে চুল কাটানোর মানুষের সংখ্যা কম। আর বকশিশ তো এখন পাওয়া না পাওয়ার শিকেয় চড়েছে। ঢাকা শহরে কয়েক হাজার সেলুন তাদের বকশিশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বকশিশের পরিমাণ হিসাব করলে টাকার অঙ্ক কত দাঁড়াবে কেউ বলতে না পারলেও এই সেলুনের বাজারে একটা মোটা অঙ্কের টাকা চলে যেত। কিন্তু সেই টাকা আসার পথও বন্ধের উপক্রম। প্রচলিত নিয়মে  ঈদ  মানেই আনন্দ। এই আনন্দ করতে গিয়ে প্রত্যেককে অনেক ধরনের আয়োজন করতে হয়। আর আনন্দের সঙ্গে অর্থের বিষয়টি চলে আসে। আর এই অর্থ জোগানের মূল উৎস বোনাস। কি সরকারি অফিস, কি বেসরকারি অফিস। সবখানেই বোনাস দেওয়া হয়। আর এই বোনাসের সব টাকাই ঈদ বাজারে চলে আসে। কিন্তু এবার সেই টাকার মোটা অংশ আর আসছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদ বাজারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা চলে আসে। কীভাবে আসে এই প্রশ্নে তাদের মন্তব্য হচ্ছে, প্রথমত ঈদবাজারে নতুন কাপড় কিনতে হয়। যে যার সাধ্য অনুযায়ী কাপড়-চোপড় কেনেন। এই কাপড় কিনতে কয়েক হাজার কোটি লেনদেন হয়। এর মধ্যে দর্জি বাড়ি একটি অংশ রয়ে যায়। বাকি টাকা তৈরি কাপড় কিনতে চলে যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধুমাত্র কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকা শহরে বিভিন্ন বিপনি বিতানে যে কাপড় আসে তার টাকার পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা। জিন্স প্যান্ট থেকে শুরু করে ছোটদের জামা কাপড়, পাঞ্জাবি, ফতুয়া চলে আসে ঈদের অনেক আগে। ঢাকা শহরে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি প্রস্তুতি অনেক আগে থেকে জানান দেয়। কিন্তু করোনাভাইরাস এই টাকা বাজারে আসার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এই টাকার বেশ কিছু অংশ চলে যাচ্ছে স্বাস্থ্য বিষয়ক বেশ কিছু পণ্য কিনতে। এর পাশাপাশি ফল ও শাকসবজির বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক।
আড়ংয়ের একটি পাঞ্জাবি ৮০০ টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু এই আড়ংয়ে ক্রেতা এখন পাঞ্জাবির কেনার মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন কয়েক হাজার পাঞ্জাবি বিক্রি হতো আর এখন দিনে পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ঢাকার বুকে সবচেয়ে বড় পাঞ্জাবি মার্কেট আয়েশা শপিং কমপ্লেক্স। এখানে প্রায় শখানেক দোকান রয়েছে। প্রতিদিন বিক্রির পরিমাণ কম হয় না। কিন্তু এই মার্কেট বন্ধ। এই মার্কেটের পাশাপাশি রয়েছে আরও অনেক মার্কেট। কোনটা খোলা আবার কোনটা বন্ধ। খোলা থাকলেও বেচাকেনা নেই বললেই চলে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি পরিবারে প্রতিটি সদস্য একটি করে পাঞ্জাবি কিনত। এই পাঞ্জাবির মূল্য কম পক্ষে ৫০০ টাকা করে হলেও সারা দেশে এই বাজারের মূল্য কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু  এই টাকা বাজারে আসছে না। পাঞ্জাবির সঙ্গে  অনেক ক্ষেত্রে যোগ হয় পায়জামা। এই পায়জামার সংখ্যাও কম নয়। যারা কিনতেন তারা মূলত বোনাসের টাকা দিয়েই কিনত। অর্থাৎ বোনাসের টাকা এই বাজারে চলে আসে। এবার সেই টাকার বেশিরভাগ অংশ বাজারে আসছে না।
মেয়েদের শাড়ি আসে টাঙ্গাইল থেকে শুরু করে পাবনা, নরসিংদী পর্যন্ত। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে জামদানি ও তাঁত বস্ত্র মেলা হয়। এই মেলায় নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রচুর পরিমাণ শাড়ি আসে। ঈদের সময় প্রতিটি ঘরে নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে শাড়ি যোগ হয়। এই শাড়ির বাজারে টাকা আসে প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। এবার এই টাকা আসছে না। শ্রমজীবী মানুষেরা নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে একটা করে নতুন লুঙ্গি কেনে। এই লুঙ্গির দাম সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে শুরু করে একেবারে ৫০০ টাকা। তবে যারা রিকশাচালক তারা একটু রঙের লুঙ্গি পরতে বেশি পছন্দ করেন বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। তবে এবার অনেকই এই লুঙ্গি কেনা থেকে বঞ্চিত হবেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, ঈদের সময় এই বাজার বেশ সম্প্রারিত হয়। কারণ অনেকে জাকাত হিসেবে এই লুঙ্গিকে বেছে নেন। তবে এখন শাড়ির প্রচলন বেশি। এই মৌসুমে লুঙ্গির বাজারে কয়েক হাজার কোটি টাকা চলে আসে। কিন্তু এবার সেই টাকার বিরাট অংশ আর আসছে না। তবে নিম্ন মধ্যবিত্তদের এখনও লুঙ্গির কেনার দিকে আগ্রহ রয়েছে।
কাপড়-চোপড়ের পর চলে আসে খাওয়া-দাওয়া। ঈদের কম-বেশি সবাই সেমাই, পোলাও, মাংস খান। শুধু তাই নয়, অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও অনেকের বাড়িতে আরও বেশি কিছু আয়োজন করা হয়। পোলাও চাল এই সময়ে চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি সেমাই, বিভিন্ন ধরনের মাংসের চাহিদাও বেড়ে যায়। আর এই সুযোগে অনেকে বাড়তি দাম চেয়ে বসে। এ যেন বোনাসের আরেক ধরন। মুরগি অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় দাম বেশি রাখে মুরগি বিক্রেতা। কিন্তু এবার এই খাওয়া-দাওয়ার বাজেট কমিয়ে দেবেন। এর মূল কারণ, মেহমানদারি কমে যাওয়া।
কাপড়-চোপড়ের পর আসে যাতায়াত খরচ। কি ঢাকায়, কি ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য। এই ঈদে বেশিরভাগ ছোটে গ্রামের বাড়িতে। কেউ লঞ্চে, কেউ বাসে আবার কেউ ট্রেনে। এই তিন মাধ্যমে টিকেট পেতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। এবারে সেই ঝামেলা যেমন নেই। তেমনি নেই ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর রেশ। তবে অনেকে এখনও লকডাউনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চোরাপথে দেশে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সংখ্যাও খুব কম।
ঈদের সময় পরিবহন খাতে কত টাকা আসে কেউ সঠিক বলতে না পারলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চলে আসে এই বাজারে। কিন্তু সেই টাকাও বাজারে আসছে না।
ঈদে অনেকে বোনাসের টাকা দিয়ে নতুন আসবাবপত্র কিনতে চায়। এ সময় তাই এ খাত বেশ কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তবে অনেকে মূল্য ছাড়ের ঘোষণা দিলেও কৌশলে তাদের প্রাপ্যটুকু আদায় করে নেয়। এই বাজারে চলে আসে বোনাসের টাকার একটি অংশ। আসবাবপত্রের সঙ্গে দরজা-জানালার পর্দা কেনার হিড়িক পড়ে যায়। এর পাশাপাশি ঘর সাজানোর জন্য ফুলের বাজার কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কসমেটিক্স বাজার সারা মাস ঝিমিয়ে থাকলেও এ সময় আবার নতুন করে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস সব কিছু যেন অচল করে দিয়েছে।
ঢাকার গাউছিয়া ও চাঁদনি চক মার্কেটে এই সময়ে লেনদেন হয় প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। এই তথ্য খোদ মার্কেটের সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু সব কিছু কেনাকাটায় যেন স্থবির।
ঈদের দিন শুরু না হতেই রিকশাচালকদের শুরু হয় বোনাস চাওয়ার। এবার তারা সেই বোনাস থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানেও বোনাসের কিছু অংশ চলে আসে যাতায়াত বাজারে। আর ঈদের দিন ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য যে সেলামি তাও ক্ষুদ্র পরিসরে আসে এই খাতে। কিন্তু এবার সেই সেলামির টাকা বন্দি হয়ে যাচ্ছে।
বিনোদন ঈদের একটি বিশেষ অনুষঙ্গ। বিনোদন খাতে বাজারে বেশ টাকা চলে আসে। অর্থাৎ ঈদে অর্থনীতির চাকা কীভাবে সম্প্রসারিত হয় তার নমুনা পাওয়া যায়। যে কারণে দেখা যায় ঈদে টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু এখন যেন বিনোদন ঘরে বসেই নিতে হবে। বিনোদনের বাজেটের টাকা ব্যয় করতে হবে না।
শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় যোগ হয় টুপি, আতর আর জায়নামাজ। এবার সেই বাজার এখন প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে। কোথাও খুব বেশি বিক্রির নমুনা নেই। এই ঈদের বাজার অনেক সম্প্রসারিত হয়। মানুষের ভোগ ব্যয় বেড়ে যায়। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি অনেকাংশে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তাই ঈদের বাজার শুধু একটি স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে না। এর অন্তঃনিহিত একটা মূল্য হচ্ছে, ঈদকে ঘিরে অর্থনীতির চাকা সচল হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার বন্দি জীবনের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। আনন্দ নেই কারও মনে, নেই নতুন কিছু কেনাকাটা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঈদ যখন এসেছিল, তখন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে একটি গান বেজে উঠেছিল, চাঁদ তুমি ফিরে যাও...ফিরে যাও।








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]