ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৩ জুন ২০২০ ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৩ জুন ২০২০

ঈদের খুশি
জুয়েল আশরাফ
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 10

পাশের বাসার বুশরা। ছয় বছর বয়স। চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে। আমি বললাম, এ কী রে বুশরা! রোজার দিনে এসব কী?
বুশরা বরফ শীতল গলায় বলল, আমি ইফতার করছি এখন।
অবাক হয়ে বললাম, দুপুর একটায় ইফতার!
সে বলল, আম্মু বলেছে এক দিনে আমার তিনটা রোজা হবে। সকালে নাস্তার পর একটা। দুপুরে খাবার পর একটা। সন্ধ্যায় খেলে হবে একটা। মোট তিনটা।
ও আচ্ছা এই কথা!
সে চিপসের প্যাকেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিল, তুমিও খাও।
আমি বললাম, না রে, খাব না। তুই খা।
সে পাশে বসে চিন্তিত মুখে বলল, দেশের অবস্থা কী? আর কতদিন করোনা থাকবে?
যেন বড় মানুষ প্রশ্ন করে যাচ্ছে। আমি জবাব দিই না। চুপ করে থাকি। সে বলতে থাকে, চিন্তা করো না। রহমতের মাস এটা। আমি রোজা রেখে করোনা তাড়িয়ে দেব। আম্মু বলেছে রোজা রাখলে আল্লাহর রহমত হয়।
চিপসের পুরো প্যাকেট শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, আজ তোমার সাথে ইফতার করব। আমার জন্য একটা আলাদা প্লেট রেখো।
এই কথা কানে কানে বলার কী হলো! সে চলে গেল ফ্রক দুলিয়ে। আছর নামাজের পর একটা তরমুজ নিয়ে এলাম। মা সেটাকে কেটে ফ্রিজে তুলে রাখলেন। ঠান্ডা তরমুজ খেতে আরাম। বারান্দায় বসে আছি। ইফতারের আর বাকি পঁচিশ মিনিট। বুশরা অস্থির হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা শোনো, একটা ব্যাপার ঘটে গেছে।
আমি জানতে চাইলাম, কী ঘটেছে?
সে বলল, আমি তো ভুল করে একটা আলুর চপ খেয়ে ফেললাম। এখন কি আমার রোজা থাকবে নাকি ভেঙে গেছে?
বুশরাকে খুব চিন্তিত দেখতে পাচ্ছি। চিন্তিত আর বিচলিত। রোজা ভঙ্গের সন্দেহে তার কান্না কান্না অবস্থা। আমি বললাম, তোর রোজা ভাঙেনি। ভুলে কিছু খেয়ে নিলে রোজা ভাঙে না।
সে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল। উত্তেজনায় এতক্ষণ দম আটকে রেখেছিল। আমি আশাসুলভ কথা শোনাতেই সে হাসিমুখে বলল, জানো আমি নিয়ত করেছি একটা রোজাও ভাঙব না। যদি এই রোজাটা ভেঙে যেত তাহলে নুসরাত আমার থেকে বেশি রোজা রেখে ফেলত।
আমি বললাম, ও আচ্ছা। নুসরাত কে?
নুসরাত আমার বান্ধবী। আমার সঙ্গে পড়ে। খুব ঢং করে। আমি তাকে বেশি পাত্তা দেই না।
আচ্ছা চল ইফতার করব। সময় হয়ে এসেছে। আজান পড়বে এখন।
আমার কথা শেষ হতেই বুশরা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললাম, ‘তুই তো বললি আমার সাথে ইফতার করবি?’ সে পিছু ফিরল না। ভাবলাম তার মা তাকে খোঁজ করবে। মাকে জানিয়ে হয়তো আবার আসবে। আজানের তেরো মিনিট বাকি। ইফতার করব খাবার সামনে বসে আছি। বুশরা এসেছে। সাথে একটি মেয়ে। বুশরার থেকে বয়সে বড় হবে। পরনে ময়লা ফ্রক। মেয়েটির হাত ধরে ঘরে নিয়ে এলো। লাজুক মুখে মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বললাম, এটা কে?
বুশরা বলল, আমাদের বাসায় রোজ ইফতারির জন্য আসে। আজকে তোমাদের বাসায় নিয়ে এলাম।
একটা প্লেট আলাদা করে রাখার রহস্য এখন বুঝলাম। বললাম, ভালো করেছিস। আয় বস।
আমাদের ইফতার খাওয়া শেষ প্রায়। বুশরা আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, আমাকে অনেকগুলো টাকা ধার দিবা? আমি বড় হয়ে দিয়ে দেব।
আমি বললাম, তুই বড় হয়ে গেছিস বুশরা। ফ্রক পরে থাকিস তো এজন্য বুঝতে পারিস না। আচ্ছা শুনি টাকা ধার নিয়ে কী করবি?
এই মেয়েকে দেব। ঈদে ওর জন্য জামা কেনা হবে। দেবে টাকা?
ঠিক আছে দেব।
এত সহজে রাজি হয়ে যাব, হয়তো ভাবেনি সে। আমাদের পাশের বাসার বুশরা, কোমল খুশিতে মাথা নেড়ে খেয়ে চলল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ঈদের চেয়েও বেশি খুশি। মেয়েটি আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ঈদে একজনকে সুখী করবে। অন্যকে সুখী করার মাঝেও নিজেকে সুখী করা যায়। নিঃস্বার্থ মন বলেই বুশরার চোখেমুখে সুখের ছায়া ঘন হয়ে এসেছে, দেখতে পাচ্ছি। আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি, সত্যি তাহলে মেয়েটা বড় হয়ে গেল।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]