ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৩ জুন ২০২০ ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৩ জুন ২০২০

করোনা-আম্ফান আক্রান্ত ঈদ
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 112

রমজান শেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঈদ। এবার ঈদের কোন আমেজ নেই, উৎসব হওয়ারও বাস্তবতা নেই। পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মানব সভ্যতাকে ঘরবন্দি করে ফেলেছে। মুসলিম দেশগুলো এ বছর অস্বাভাবিক পরিবেশে রোজার এক মাস কাটিয়ে দিচ্ছে। কেউই রমজান শেষে ঈদের উৎসব আগের মতো পালন করতে পারবে না। আমাদের দেশেও খুব সীমিত পরিসরে মসজিদ কেন্দ্রিক ঈদের জামাত হওয়ার কথা। ফলে এবার ঈদে ঈদগাহে মানুষ সমবেত হবে না, নতুন পোশাকে সাজবে না, কোলাকুলি করবে না, শিশুরা ঈদ শেষে আত্মীয়-স্বজনের বাসায়, চিড়িয়াখানায় ও শিশুপার্কে বেড়াতে যাবে না।
এ বছর গোটা রমজান মাসে কেনাকাটার ওপর বিধি-নিষেধ ছিল, নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেন, বাস ও যানবাহনের হুড়াহুড়ি নেই। অদৃশ্য করোনাভাইরাস আমাদেরকে কতটা ঘরবন্দি করতে পেরেছে তার হাতেনাতে প্রমাণ এখানেই পাওয়া যায়। তারপরেও কিছু মানুষ মরিয়া হয়ে কেনাকাটার জন্য শহরের ফুটপাথ, ছোট-মাঝারি মার্কেটে ছুটে বেড়াচ্ছে, গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য অনেকেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এপথ ওপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের যেন এবার ঈদটা আগের মতো না করলেই নয়! নানা খোঁড়া যুক্তি দিয়ে রাস্তায় কঠোর পরিশ্রম করে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা তারা করছে। তারপরেও খুব বেশি সংখ্যক মানুষ ঢাকা বা শহরগুলো ছাড়তে পারেনি। ঈদ তাদের এবার কর্মস্থলেই
 করতে হচ্ছে।
এবার ঈদের আগে আকস্মিকভাবে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান হানা দিল। তাতে  সমুদ্র তীরবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় জলোচ্ছ্বাস ও মাঝারি ঘূর্ণিঝড়  আঘাত হানে। অন্যান্য বেশ কিছু অঞ্চলেও এর ফলে মানুষের সম্পদ, বাড়ি-ঘর তলিয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের এমন মারাত্মক প্রকোপের সময় এ যেন নতুন করে আরেক বিপদ। আম্ফানের তাণ্ডব ও আঘাত বলতে গেলে অনেকটাই মানুষ সমবেতভাবে মোকাবিলা করেছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের আক্রমণ শুধু বাংলাদেশের ব্যপার নয় গোটা বিশ্বের মানুষকে গত ৫ মাস ধরে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ খুব সহসা হচ্ছে নাÑ এটি পৃথিবীর সব দেশেই এখন স্বীকৃত বিষয়। আম্ফানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পশ্চিমবাংলা এবং বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবেÑ এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে করোনার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা আরও অনেক দিনের এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতির হতে পারে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে এবার বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রতিবছর আমাদের ৩টি পার্বণ অর্থনীতিতে বেশ ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আসে। এর একটি হচ্ছে বৈশাখী অর্থনীতি ওপর দুটি হচ্ছে দুই ঈদ অর্থনীতি। এর বাইরেও আরেকটি মাঝারি পার্বণ অর্থনীতি পরিচিতি পেয়ে উঠছিল। সেটি হচ্ছে দুর্গাপূজার অর্থনীতি। এই ৪টি উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের লক্ষ লক্ষ শিল্পবণিক, কারিগর, নানা পণ্য সামগ্রীর উৎপাদক ও প্রতিষ্ঠান যে বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত করে আসছে তার পেছনে থাকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও রুটিরুজির আয়োজন, একই সঙ্গে সব শ্রেণি পেশার মানুষের বণিীল উৎসবকে নতুন প্রাণ দেওয়ার ও পাওয়ার আয়োজন থাকে, এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে শুধু উৎসবই বর্ণিল হয় না জাতীয় অর্থনীতিও নতুনভাবে প্রাণ খুঁজে পায়।
করোনাভাইরাস এবার আমাদের বাংলা নববর্ষের উৎসব কেড়ে নিয়েছে, এখন ঈদের আনন্দও হারিয়ে গেছে। একই সঙ্গে গোটা সমাজ ,রাষ্ট্র ও অর্থনীতিও স্পন্দন হারিয়েছে, আমাদের কোটি কোটি মানুষ এবার ঈদে আয় উপার্জন থেকে বঞ্চিত হয়েছে, অনেকের ঘরেই এবার সেভাবে ঈদ পালন করা হবে না, অনেকেই তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, অনেকেই হাসপাতালে করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। একই সঙ্গে গত দুই তিন মাস অনেকেরই কষ্টে দিন কাটছে, অনেকেরই কমাস আগেও বেশ আয়Ñ উপার্জন ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য, রুটিরুজি মিলিয়ে
ভালোই কাটছিল।
কিন্তু তাদের প্রায় সবারই এবারের ঈদ কাটবে শুধু নিরানন্দেই নয় , হতাশার মধ্যেও। অনেকের ব্যবসা বাণিজ্য, দোকানপাট, প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস বন্ধ। তারা জানেন না করোনাভাইরাসের এই সংক্রমণ কবে শেষ হবে, কবে আবার তারা কর্মজীবনে ফিরে আসতে পারবে, আসলেও কেমন পরিবেশ পরিস্থিতি কর্মক্ষেত্রে তৈরি হবে সেটি এখনও অজানা। তেমন এক পরিস্থিতিতে এবার ঈদকে কতটা ঈদের মতো লাগবে সেটি অগ্রিম অনুমান করা যেতে পারে। সেটি যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক ঈদের আনন্দ নিয়ে পালিত হবে নাÑ তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
করোনাভাইরাসের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এবার রমজানটি ভিন্নভাবেই পালিত হচ্ছে। ঈদ উদযাপনও তাই খুব একটা আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে না। ধারণা করা হয়েছিল রমজানের মাঝামাঝিতেই করোনা সংক্রমণ আমাদের দেশে কমে আসবে। কিন্তু সেটি আমাদের ভাগ্যে ঘটেনি। এর জন্য অবশ্য আমাদের সমাজের একটি বিশেষ অংশের মানুষ নিয়ম নির্দেশনা না মেনে চলার কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণটি প্রলম্বিত হয়েছে। অনেকেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সামাজিক জায়গাগুলোতে চলাফেরা করছেন না। আমাদের শিল্প মালিকদের একটি অংশ শ্রমিকদের দুবার ঢাকায় আনার যে উদ্যোগটি নিয়েছিলেন সেটি লকডাউন ভাঙার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এরপর দোকান মালিক সমিতি ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটা করার যে সুযোগ চাইলেন সেটি ক্রেতাদের একটি অংশকে বাজারমুখী করে ফেলল। এটি বড় শহরগুলোতে কোথাও কোথাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সুযোগ করে দেয়।
উপজেলা শহরগুলোতে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করার পর ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সাধারণ পুলিশ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে প্রত্যন্ত গ্রামের বাজারগুলোতে পসরা সাজিয়েছে। শহরের ফুটপাথ এবং অলিগলির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। এসব দৃশ্য বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছে। ঈদের কেনাকাটার এমন সব দৃশ্য দেখে সচেতন মহল হতবাক হয়েছেন, কেনাকাটায় মানুষের অসচেতনতা দেখে হতাশ হয়েছেন, মানুষের হাতে টাকা নেই, আয় নেই, রুজি নেই এমন দাবিও তখন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। শহরগুলোতে যানবাহনের অবাধ চলাচল ও জট দেখে বোঝার উপায় ছিল না করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে এই মানুষদের কোনো ভয় ও আতঙ্ক আছে কি না? এটি সত্যি বিস্ময়কর বিষয় যে এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে একটি বড় সংখ্যক মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে কোনো আতঙ্ক নেই, সংক্রমিত হওয়ার ভয় যেন নেই! বিষয়টি শুধু দুঃখজনকই নয় ভাববারও।
এই মানুষদের ওপর জরিপ করা হলে তাদের এমন নির্লিপ্ত বেপরোয়া ভাব সম্পর্কে একটি সঠিক ধারণা এবং চিত্র ফুটে উঠত। যেমন দোকান খুলে দেওয়ার পর বেশ কিছু উপজেলায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ পরিবারের শিশু কিশোরদের নিয়ে জামা-কাপড়ের দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। এই দৃশ্য ঢাকা শহরের ফুটপাথেই শুধু নয় অনেক অভিজাত এলাকায় অভিজাত-অঅভিজাত  দোকানপাটেও লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন সাংবাদিকের করা প্রশ্নের উত্তরে তারা যা বলেছেন তার সারমর্ম ছিল এই, ঈদে কেনাকাটা করতেই হবে, করোনার সংক্রমণ হবে না, হলে কিছু করার নেই, তবুও ঈদ করতে হবে, ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড়, জুতা দিতে হবে।
কেউ কেউ করোনা নিয়ে প্রশ্ন করায় রুষ্ট হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ আরও প্রলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। অথচ যত দ্রুত করোনাভাইরাসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে তত দ্রুত আমাদের অর্থনৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়সহ সকল প্রকারের কায কর্ম কী কী নির্দেশনা ও শৃঙ্খলায় শুরু করা যাবে সেই দুশ্চিন্তাই সকল সচেতন মহলে প্রতিদিন বাড়ছে। দুই মাসের অধিক সময় ধরে অনেকেই নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে ঘরবন্দি জীবনযাপন করছেন, কাজকর্ম বন্ধ রাখছেন। কিন্তু বিরাট সংখ্যক মানুষ এর কিছুই মানছেন না। তাদের কারণেই সংক্রমণের গতি রুদ্ধ হচ্ছে না।
বাংলাদেশ এভাবে কতদিন করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে প্রলম্বিত করে টিকে থাকতে পারবে সেটি মস্ত বড় প্রশ্ন। এখন এই ঈদ উপলক্ষে সব বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে বিপুল সংখ্যক মানুষ যদি গ্রামে যান, ঈদের দিন সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে নিজেদের ইচ্ছেমত গ্রামে ঈদের অনুষ্ঠান, সামাজিক মেলামেশা করেন, আবার শহরে দল বেধে ফিরে আসেন তাহলে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোখার সামর্থ্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হাতে থাকবে বলে মনে হয় না। সেকারণে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহল এবারের ঈদের নামাজ ও অনুষ্ঠানাদিতে সতর্ক নজর রাখবেন-এটি সকলের প্রত্যাশা।

ষ শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]