ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০ ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০

দৈন্যদশায় ঝালকাঠির তিনশ পাটিকর পরিবার
আতিকুর রহমান ঝালকাঠি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ২৯.০৫.২০২০ ১:৫১ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 130

‘চন্দনেরি গন্ধভরা, শীতল করা, ক্লান্তিহরা, যেখানে তার অঙ্গ রাখি, সেখানটিতেই শীতল পাটি’। ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘খাঁটি সোনা’ কবিতায় বাংলার মাটিকে এভাবে শীতলপাটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের শীতলপাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু যারা এ শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত, বাংলার সেই পাটিকরদের এখন চরম দুর্দশা। করোনার কষাঘাতে ঝালকাঠির ৩ শতাধিক পাটিকর পরিবারের আগের মতো সচ্ছলতা নেই।  
শীতলপাটি ঝালকাঠির একটি ঐতিহ্য। একটা সময় গরমের দিনে মানুষকে অনাবিল শ্রান্তি এনে দিতে শীতলপাটির কোনো জুড়ি ছিল না। মোর্তা বা পাটিবেত বা মোস্তাক নামক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল দিয়ে তৈরি করা হয় এ পাটি। কোথাও কোথাও এ পাটিকে নকশিপাটি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এ নিপুণ হস্তশিল্প শহর-গ্রামে মাদুর ও চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি পাটি বাজারে সয়লাব হওয়ায় শীতলপাটি বাজার হারিয়ে ফেলছে। দিন দিন বাজার থেকে হারিয়ে যেতে বসছে শীতলপাটির চাহিদা। তপন ও বিজয় পাটিকর বলেন, সরকারি সহযোগিতায় অল্প সুদে ঋণ পেলে এবং সরকার বাজারজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করলে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির বাজার আবার ফিরে পাওয়া যাবে।
মঠবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদার বলেন, শীতলপাটির আগের মতো বাজারে চাহিদা না থাকায় পাটিকরা এমনিতেই মানবেতর জীবনযাপন করছে, করোনাভাইরাসের কারণে তারা আরও ক্ষতির মধ্যে পড়বে। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতদূর সম্ভব তাদের সাহায্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।
পাটিকরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার রাজাপুরের হাইলাকাঠি গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে ৯০ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৮-১০ বছরের শিশুরাও নিপুণ কারুকাজে পাটি তৈরি করে থাকে। এখানকার চিকনবেতির শীতলপাটির চাহিদাও প্রচুর। এ অঞ্চলে অতিথিদের সামনে একটি ভালো মানের শীতলপাটি বিছিয়ে নিজেদের আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়।
গরমের মৌসুমে এসব পাটি তাপে খুব বেশি গরম হয় না বলে একে শীতলপাটি বলা হয়। পাইত্রা বা মোর্তা নামে এক ধরনের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কাণ্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ক পাটি গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তারপর পাটির বেতি তোলা হয়। এরপর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির ওপরের খোলস থেকে শীতলপাটি, পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ ছোটার (চিকন দড়ি) কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ঝালকাঠি জেলায় তিনশর বেশি পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামে রয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। তারা সবাই পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু হাতে গড়া শীতল পাটির জন্য এ গ্রাম দুটিকে ‘শীতল পাটির’ গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমি জুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান। এখানে শীতলপাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। পাটির বুনন পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমত, পাটির জমিনে ‘জো’ তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা তোলে। দ্বিতীয়ত, পাটির জমিন তৈরি হলে তার চতুর্দিকে অন্য রঙের বেতি দিয়ে মুড়ে দেয়। পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাটিকরদের পেশা এগিয়ে চলছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুণ একজন পাটিয়াল নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র। একটি পাটি বুনতে ৩-৪ জনের দুই-তিন দিন সময় লাগে। যা বিক্রি করে পাঁচশ থেকে দেড় হাজার টাকা আসে। মহাজনরা প্রতি পাটিতে একশ থেকে পাঁচশ টাকা লাভ করেন। পাইত্রা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এ জন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওর কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পুঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। তা ছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত শীতলপাটি রফতানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি।
মঞ্জুরানী পাটিকর বলেন, আমাদের অন্য কোনো উপার্জন নেই। শুধু শীতলপাটি বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং ছেলেমেয়ের লেখাপড়া চালাই। শীত এবং বর্ষায় আর্থিক সঙ্কটে ভুগতে হয়। সরকার বিনা সুদে ঋণ দিলে বেশি পাইত্রা কিনে শীতলপাটি তৈরি করা যেত।
দশম শ্রেণির ছাত্রী মৌসুমি জানায়, তাদের পরিবারের সবাই পাটি বুনতে পারে। বাবা-মাকে সহযোগিতা করার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি পাটি তৈরি করেন।
পাটি শিল্পী সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘সরকার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটি শিল্পীদের সরকারিভাবে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই খাতের আওতায় ঋণ দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ জন পাটি শিল্পীকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। তবে বিনা সুদে ঋণ দিলে আমরা উপকৃত হব।’
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ‘চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পাটি বিপণন ত্রুটি থাকায় বছরের একটি সময় তাদের বসে থাকতে হচ্ছে। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র্য কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র্য পাটি শিল্পীদের কাজের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হয়তো এটি অচিরেই সম্ভব হবে।’ করোনার কারণে পাটিকরদের পাটি বিক্রি বন্ধ থাকায় তাদের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
                                
          
                




এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]