ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০ ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা জরুরি
এস এম নাজের হোসাইন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 578

নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি সম্প্রতি করোনা মোকাবিলায় বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ত্রাণ সমন্বয় কমিটি গঠন করা। বিভিন্ন দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সর্বদলীয় নাগরিক কমিটি গঠন, আবার ত্রাণ কার্যক্রমে নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে পাসকৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-তে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রস্তুতিতে সরকারের বড় অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই সেদিনও আমাদের এই ভূখণ্ডে এনজিও নামের উপস্থিতি তেমন ছিল না। তবে সমাজহিতৈষী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ দেশ ও সমাজে সবসময় ছিল এবং এখনও আছে। এরা মূলত অলাভজনকভাবে চ্যারিটিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত, কিন্তু কখনই ধারাবাহিকভাবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরূপ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজের ধরন ও চরিত্র প্রয়োজনের তাগিদেই বদলাতে থাকে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর কাজের সঙ্গে যোগ হতে থাকে উন্নয়নের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, বৈদেশিক সাহায্য, জন্মাতে থাকে পেশাদারিত্বের তাগিদ এবং উদ্যোগের ধারাবাহিকতা, নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার বিধান।
সাধারণ অর্থে এনজিও (অলাভজনক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন) বলতে সেইসব সংগঠনকে বোঝায় যারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে সম্পৃক্ত। তবে দেশে এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী সংস্থার এডাব-এর মতে, তাদেরকেই এনজিও বলে বিবেচনা করা হয় যারা সংগঠন হিসেবে সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত, নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত, যাদের নির্দিষ্ট অফিস আছে, পূর্ণকালীন কর্মী আছে, ধারাবাহিকভাবে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি, কর্ম এলাকা ও উপকারভোগী বা অংশীজন আছে, ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও এর প্রয়োগ আছে, বার্ষিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন আছে, বার্ষিক বাজেট ও আয়ের উৎস আছে, নিয়মিত বার্ষিক অডিট হয় এবং যাদের উন্নয়ন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ও পেশাদারিত্বের ছাপ আছে, আছে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এসব বিবেচনায় সক্রিয় বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন বা এনজিওর সংখ্যা সারা দেশে দুই-আড়াই হাজারের বেশি নয়। অথচ বুঝে বা না বুঝে অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশে লক্ষাধিক এনজিও কর্মরত আছে। অনেক সময় সমবায় সমিতি, মাল্টিপারপাস সোসাইটি, কোঅপারেটিভ সোসাইটি, ক্লাবকেও এনজিও বলা হয়ে থাকে। এতে জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রকৃত এনজিওর ভাবমূর্তি।
আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৮ সালের শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা, দক্ষিণাঞ্চলে সিডর-আইলা মোকাবিলা, চট্টগ্রামে ২০০৭ সালের ১১ জুনের পাহাড়ধসের ঘটনায় এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান এডাব অত্যন্ত সফলভাবে তার প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সেল স্থাপন করে সরকার, দাতা সংস্থা ও এনজিওদের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছিল। সর্বশেষ কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদের মানবিক ত্রাণ কাজেও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো সরকারের পাশে থেকে মানবিক আবেদনে সাড়া প্রদান করেছে।
রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তাসহ বর্তমান সংকট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসের বিপর্যয়সহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য যা যা করা দরকার, তার সবই করার দায়িত্ব সরকারের। কারণ, রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের হাতে এবং তার প্রশাসনিক-প্রাতিষ্ঠানিক সব কর্মকাণ্ডের ব্যয় নির্বাহ হয় জনগণের করের টাকায়। এই গুরুতর জাতীয় দুর্যোগে জনসাধারণ প্রধানত সরকারের ওপরেই ভরসা রাখতে চায়। ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ প্রত্যাশা করে যে নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে সরকার আন্তরিকভাবে সব বিষয়ে তৎপর হবে।
রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন বারবার তাগাদা দিয়ে আসছে এত বড় জাতীয় দুর্যোগ কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া সরকারের একার পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তবে সরকার নিজে এটা উপলব্ধি করেছে কি না তা বলা কঠিন। কারণ, সমাজের অন্য সকল শক্তিকে যুক্ত করার তেমন কোনো উদ্যোগ সরকারি তরফে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই যে রোগ সংক্রমণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও মৃত্যু সম্পর্কে তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ সরকার নিজের হাতে রাখতে চায়। অথবা অন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলের আস্থার অভাব। যদিও বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনসমূহের অন্যতম গণস্বাস্থ্য ইতোমধ্যেই করোনা শনাক্তকরণ কিট তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাক ১ লক্ষ লোকের খাবারের দায়িত্ব গ্রহণ, বিভিন্ন স্থানীয় এনজিওর করোনা আক্রান্ত কর্মহীন লোকের খাবার, স্যানিটাইজার বিতরণসহ নানা উদ্যোগের তথ্য মিডিয়াগুলোতে প্রচার হচ্ছে।
আজকের প্রেক্ষাপটে সরকারকে একা করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারির পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজের সকল পর্যায়ের অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে করোনাযুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা নিতে হবে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অবদান দেশে-বিদেশে বিপুল প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে এনজিও খাতের অবদানের বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রয়েছে বাংলাদেশেই। এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসসহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করছে ছোট-বড় অজস্র বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় আমরা তাদের সেই সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিলে বিষয়টি অবশ্যই সহায়ক হবে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় অধিকারভিত্তিক এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হলে সরকারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-এ সরকারের অন্যতম সহযোগী হিসেবে এনজিওগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তাই এখন প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে এনজিওগুলোকে আস্থায় নিয়ে আসা। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ক্ষুদ্র ঋণদান কার্যক্রমে জড়িত এনজিওদের মাধ্যমে বিতরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। বিশেষজ্ঞ মহল এটাকে ইতিবাচক এবং তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে বেশ সহায়ক হবে বলে মনে করছে। ঠিক একইভাবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ খাতকে সচল করতে এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সরকারেরই উচিত এনজিওগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করে কোন সংস্থা কোন ক্ষেত্রে সরকারকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারবে, তা নির্ধারণ করে তাদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। জাতীয় পর্যায়ে এনজিওদের শীর্ষ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান এডাবের সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারে। তাদের সদস্য সংগঠন ও সমমনা অনেকগুলো সংগঠন ও ইস্যুভিত্তিক সমন্বয়কারী সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক পুরো দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। আর এ সমস্ত সংগঠন তৃণমূল পর্যন্ত করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ ও সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজে সহায়তা করতে পারে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এই মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তানে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র খোলার কাজে এনজিওদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কাজ করে এমন সব এনজিও এই কাজে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ত্রাণ বিতরণে উপকারভোগী নির্বাচন, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও জনসচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক শিক্ষা কাজে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে। করোনাযুদ্ধের লড়াইয়ে আমাদের বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সহযোদ্ধা হিসেবে পেতে হবে। যেরকম এনজিওরা ইপিআইয়ের টিকা প্রদান, দুর্গম এলাকায় জন্ম নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবা, শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল। এ জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিতে এগিয়ে আসতে হবে। আশার কথা, ডায়রিয়ার প্রতিরোধ, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বরাদ্দ প্রদান, কৃষি উপকরণ, বীজ সার বিতরণ, শিশুর বিদ্যালয় ঝরে পড়া রোধ, শিশু শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ অনেকগুলো সামাজিক অগ্রগতি ও সামাজিক সূচকের উন্নয়নে সরকারের পাশে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
নিছক ক্ষুদ্র ঋণের সাথে এনজিওরা জড়িত এই ভ্রান্ত ধারণায় মানবজাতির অস্তিত্ব ও জাতীয় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার কঠিন সংগ্রামে করোনাভাইরাস মহামারি সংক্রমণ রোধ ও সামাজিক অগ্রগতি ধরে রাখতে সামাজিক উন্নয়ন ও তৃণমূলে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার অধিকারভিত্তিক ধারার এনজিওগুলোকে সরকারের করোনাভাইরাস মোকাবিলা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে জাতির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের স¦প্ন বাস্তবায়নে সহায়ক ক্ষেত্র তৈরিতে সকল মহল একযোগে এগিয়ে আসবে। দুর্যোগ, সঙ্কট ও ক্রান্তিকালে সকল মহল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

ষ ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস
      অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]