ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০ ৩০ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০

করোনাপরবর্তী সমাজ ও আমাদের দায়বদ্ধতা
মোজাম্মেল হক লেনিন
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 24

করোনা গ্রুপের কোভিড-১৯-এর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সারা পৃথিবী; হুমকির সম্মুখীন মানবসভ্যতা। দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ওষুধ বিজ্ঞানের পারদর্শীরা, ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ আশা জাগানিয়া সৃষ্টি নিয়ে সামনে আসছেন আবার কেউ কেউ তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছেন। প্রত্যেকের প্রার্থনাতে আছে নতুন ভোরের স্বপ্ন। নতুন করে পৃথিবী সাজাবেন, চিরচেনা রাজপথ বেয়ে আবার সেøাগান হবে ভালোবাসার, সৌহার্দ্যপূর্ণ পৃথিবীর বুকে আলোক প্রদীপ জ্বালাবেন, আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে স্নেহ মমতা কিনে আনবেন আগামী প্রজন্মেও জন্য। আরও কত শত মানবিক পরিকল্পনা আপনার-আমার।আমরা বিশ্বাস করতে ভালোবাসি সব প্রতিকূলতাকে জয় করে আমরাই গড়ে তুলব আগামীর বসুন্ধরা, হাতে হাত রেখে গাইব সাম্যেও গান। কিন্তু পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করছি একশ্রেণির সমাজসেবক এই সঙ্কটকালীন সময়েও চুরি করছে ত্রাণের চাল, কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে বাড়িয়ে দিচ্ছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, কিছু ডাক্তার পেশার মর্যাদাকে পদদলিত করে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, কিছু শিল্পপতি সরকারকে বিপদে ফেলে দাবি করছেন ভর্তুকি, আবার কেউ কেউ জরুরি সেবা দিতে আসা মানুষজনদেও করছেন হয়রানি। সে কী এক বীভৎস দৃশ্য। কেউ কেউ নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের শ্রমটুকুকে সরকারি পরিসেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন আর অন্যদের কাজটাকে অমর্যাদা করেই চলছে। যদিও যারা পরিসেবার অধিভুক্ত তাদেও প্রতি আমার শ্রদ্ধার অন্ত নাই। স্যালুট জানাই তাদের প্রতি যারা জীবন বাজি রেখে প্রিয় স্বদেশের এই দুর্দিনে সামর্থ্যওে সবটুকু দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন তাই বলে অন্যদেও শ্রমটাকে ন্যূনতম সমীহ করবেন না সেটা বড়ই বেমানান। করোনাপরবর্তী পৃথিবীকে আমরা যারা সুন্দরতম দেখতে আগ্রহী তারা কতটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে করোনা নামক অদৃশ্য জীবাণু থেকে আপনার প্রিয় পৃথিবী মুক্তি পেলে আপনি আর অন্যদের অনিষ্ট করবেন না, নেতৃত্বেও প্রতিযোগিতায় নিজের সামর্থ্য অনুসারে কাজ করে সংগঠনের কল্যাণ করবেনÑ অন্যের গীবত করে নয়, কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতনের মোসাহেবি করে নয় বরং দেশপ্রেমের অঙ্গীকারে নিজের নেওয়া শপথ রক্ষা করবেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়া ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেটাকে টার্গেট করে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য করবেন না, কোনোরূপ স্বজনপ্রীতি-এলাকাকরণ করবেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে অবস্থান করা ছেলেটা কে গ্রামের বাড়ির মিথ্যা ছিনতাই-লুটপাট মামলার আসামি করবেন না, ঠুনকো অপরাধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আত্মীয়ের অভিযোগে কলেজপড়ুয়া ছেলেটা দীর্ঘ ২১ দিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখবেন না, বিপদের দিনে বুক চিতিয়ে লড়াই করা লোকটাকে হাতকড়া পরিয়ে মেডিকেলের বিছানায় কাতরাতে দেবেন না, অসহায় মায়ের বুকটাকে খালি করে দেবেন না, মানুষকে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দেবেন কথা দিতে পারেন?
আপনি, আপনার সন্তানের জন্য করোনামুক্ত নির্মল পৃথিবী চান, ভবিষ্যতে আপনার সন্তান যেন ব্লুব্লাড হিসেবে স্বীকৃত হয়Ñ এ লক্ষ্যে আপনার কত প্রাণান্ত প্রচেষ্টা! সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দিনরাত, এতে যদি অন্যেও সন্তানকে পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হয় এমনকি পিতৃহারাও হতে হয়ে তাতেও আপনার কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’Ñ ঈশ্বরী পাটণী কিন্তু শুধু তার নিজের সন্তানকে বোঝাননিÑ এটা কিন্তু আপনাকে অনুধাবন করতে হবে। আপনার নিজের সন্তানকে সেরা প্রমাণ করতে গিয়ে যদি পুরো পৃথিবীকে আপনি ক্ষত-বিক্ষত করেন তবে করোনার মতো অদৃশ্য শক্তি কিন্তু আপনার সন্তানকে গ্রাস করতে একদমই কার্পণ্য করবে না। সুতরাং সবুজ পৃথিবী গড়তে হবে সবার জন্য, কল্যাণের জন্য, মানবিক পৃথিবীর অঙ্গীকারে। তবেই সৃষ্টির আসল স্বার্থকতা!
আপনার প্রত্যাশার সবুজ পৃথিবীটা আমিও খুব করে চাই। আমিও চাই নির্মল পৃথিবীর বুকে আবারও প্রগতির সেøাগান দিতে, শান্তির পতাকা উড়িয়ে প্রেমের জয়গান গেয়ে গ্রামের মেঠোপথে উল্লাস করতে। সন্তানের অসহায় চোখের জল মুছে তাকে নিয়ে কীডস জোনে খেলতে যেতে চাই, চাই প্রেয়সীর হাতে হাত রেখে শিমুল বনে ফটোধারণ করতে কিংবা রমনার বটমূলে বসে স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে জড়িয়ে ভালোবাসার গল্প শোনাতে, আঙুলে-আঙুল জড়িয়ে হেঁটে যেতে চাই বিরাণ পথে , সেখানে গাঙচিল উড়ে
যাওয়া দেখব, শাপলার বিলেও দৌড়াব, মাছরাঙার শিকার দেখব, জ্যোৎস্না বিলাস করব, ঝিঁঝি পোকাদের গান শুনব। আরও কত শতরঙিন স্বপ্ন।
আমি করোনামুক্ত পৃথিবীতে প্রত্যাশা করি কাউকে চিকিৎসার অভাবে মরতে না হয়। আমি করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই যখন দেখি একজন কিশোর ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আত্মহত্যা করে, গ্রামের মধ্যম সারির পরিবারের কর্তা যখন ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে থাকেন যাতে তার সন্তানের সহপাঠী দেখতে না পায়, যখন করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় ২১ বছরের সংসার করা স্ত্রী তার স্বামীকে পুলিশ হেফাজতে আইসোলেশনে পাঠায়, যখন দিনরাত পরিশ্রম করে ত্রাণ বিতরণ করা, এমনকি জনজীবন স্বাভাবিক রাখার জন্য রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে যে পুলিশ সদস্য কাজ করে চলছে তার চিকিৎসায়ও আমাদের অনেকের ভীষণরকম অবহেলা, সারা দিন বিভিন্ন হাসপাতাল ছুটে চলা করোনার খবর সংগ্রহ করা সংবাদকর্মী করোনা আ্যাফেক্টেড, যখন দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কথা চিন্তা করে উন্নত বিশ্বের দেশ জার্মানির অর্থমন্ত্রী সুইসাইড করে, প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ব্যাংককর্মী যখন সন্তানকে বুকে না নিতে পারার তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মতুষ্টি খোঁজে, করোনা রোগে মৃত স্বামীর সৎকারে যেতে যখন কেউ তার সন্তানকে ঘরে আটকে রাখেন, পৃথিবীর এই অসুখটাকে বিদায় বলে দিতে খুব ইচ্ছে করে। যখন পরিচিতজনদের পাহাড় সমান বিপদ দেখেও নিজের সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতার কারণে শুধু বসে বসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যখন জায়নামাজের পাটিতে মায়ের অশ্রু সজল চোখের চাহনি, বোনের প্রার্থণাতে স্বজনের জন্য দোয়া, সন্তানের দিনকে দিন নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া, নববধূর হাতের মেহেদির রঙ শুকাতেই যত ভয়, চারিদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, শ্রমজীবী মানুষের হাহাকার, বেকার যুবকের হঠাৎ করেই নীরব হয়ে যাওয়া। এত এত কারণে আমি পৃথিবী থেকে করোনা নামক জীবাশ্ম বোমার বিতাড়ন চাই। চাই পৃথিবী আবার জেগে উঠুক স্বমহিমায়, আবার কোকিল কুহু সরে গান গেয়ে যাক, আবারও সব স্বাভাবিক হয়ে উঠুক প্রিয় বসুধা। চলুন তবে বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য প্রার্থনা করি। সব হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নির্মল পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিই। আবারও জমবে মেলা ওই শিমুলতলে যেখানে সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন হবে শর্তহীনভাবে, বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকারে।

ষ ব্যাংক কর্মকর্তা







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]