ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০ ২৫ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ২০২০

জনসংযোগ- একটি আধুনিক বিকাশমান পেশা
মো. আরাফাত রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 61

জনসংযোগ হলো একজন ব্যক্তি বা সংস্থা এবং জনসাধারণের মধ্যে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাপনার অনুশীলন। জনসংযোগের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে একটি সংগঠনের জনস্বার্থ বিষয়ক তথ্যসমূহ তাদের শ্রোতাদের কাছে প্রকাশ পেতে পারে। এটি বিপণন যোগাযোগের একটি অংশ যা বিজ্ঞাপন থেকে এটিকে পার্থক্য করে। জনসংযোগ হল বিপণন বা বিজ্ঞাপনের পরিবর্তে বিনামূল্যে ক্লায়েন্টদের জন্য কভারেজ তৈরির ধারণা। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞাপন বৃহত্তর জনসংযোগ কার্যক্রমেরই একটি অংশ। জনসংযোগের উদ্দেশ্য হলো জনগণ, সম্ভাব্য গ্রাহক, বিনিযয়োগকারী, অংশীদার, কর্মচারী এবং অন্যান্য অংশীদারদেরকে প্রতিষ্ঠান, তার নেতৃত্ব, পণ্য বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো এবং ইতিবাচক বা অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থাকা। জনসংযোগ কর্মকর্তারা সাধারণত পিআর এবং মার্কেটিং ফার্ম, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, বেসরকারি সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে।
‘জনসংযোগ’ শব্দটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ১৮০৭ সালে তার কংগ্রেস ভাষণের খসড়ায় প্রথম ব্যবহার করেন। তখন থেকেই জনসংযোগ একটি আধুনিক, জরুরি এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে। একটি সৃজনশীল ও কুশলি বিদ্যা হিসেবে ‘জনসংযোগ’ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পেতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বহু স্থানে ‘জনসংযোগ’ একটি পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পায় ইদানীং জনসংযোগ কর্মসূচিতে ভিডিও মাধ্যমটির চেয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত সস্তা, সহজতর ও দ্রুততর নির্মাণ পদ্ধতি এবং দেশে সহজলভ্য সকল কারিগরি সুবিধা থাকায় এ মাধ্যমটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইন্টারনেট এবং ই-মেইল সার্ভিসও এখন দেশের প্রয়োজনীয় জনসংযোগ উপকরণে পরিণত হয়েছে।
জনসংযোগ অনেক ধরনের হয়ে থাকে, উদাহরণস্বরূপ আর্থিক জনসংযোগ শেয়ারহোল্ডার এবং গ্রাহকদের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে। করপোরেট জনসংযোগ গ্রাহকদের কোম্পানির মূল ধারণা সম্পর্কে জানাতে সহায়তা করে। এটি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের সুনাম বৃদ্ধির জন্য, ওই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘জন’ যথা শ্রমিক, কর্মচারী ও ক্রেতাসহ সমাজের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত রাখার প্রক্রিয়া। জনসংযোগ হচ্ছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত প্রকৃত ঘটনাভিত্তিক উদ্দেশ্যমূলক একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে জনসংযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে এ বিষয়টি মানুষের কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার পাশাপাশি তাদের সেবা ও বাণিজ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে জনসংযোগ কর্মী নিয়োগ করে থাকে। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও রক্ষার জন্য জনসংযোগ কর্মসূচি প্রণয়ন, সংগঠন ও সমন্বয় করতে হয়। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যাবলি সম্পাদনসহ এসব দায়িত্ব পালনে নিজ সংগঠনের প্রতিটি ব্যক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
জনসংযোগ বিশেষজ্ঞরা শ্রোতা, মিডিয়া, এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং সম্পর্ক বজায় রাখেন। সাধারণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ, প্রচারণা, ডিজাইন করা, সংবাদ প্রকাশ, সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা, কোম্পানির মুখপাত্রদের সাক্ষাৎকার প্রচার, কোম্পানির পরিচালকদের জন্য বক্তৃতা লেখা, সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা, মিডিয়া সাক্ষাৎকার এবং প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা করা। এছাড়াও ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠনের নিউজ আপডেট করা, কোম্পানির সঙ্কট ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ড সচেতনতা এবং ইভেন্ট পরিচালনার মতো মার্কেটিং কার্যক্রমগুলি পরিচালনা, সাফল্যের সাথে কোম্পানির স্বার্থ এবং উদ্বেগের বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝা। জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে জনসংযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করে উদ্বেগগুলো কার্যকরভাবে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা জানা আবশ্যক।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি জনসংযোগকর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও জনসংযোগে কাক্সিক্ষত পেশাদারিত্ব এখনও অর্জিত হয়নি। এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছে একটি জাতীয় জনসংযোগ নীতিমালা না থাকা, জনসংযোগ পেশাজীবীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সুবিধার অভাব এবং জনসংযোগ শাখাকে কর্তৃপক্ষের কম গুরুত্ব প্রদান। অনেক সংস্থায় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও জনসংযোগ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করতে দেয় না। মূলত এসব কারণে এখনও কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি এবং প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে।
বর্তমান সময়ে মানুষ ওয়েবকেন্দ্রিক হওয়ায় জনসংযোগ কাজের গতিধারায় বিগত কয়েক বছর এ অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্ত হয়েছে নতুন কৌশল। প্রতিষ্ঠানের সফলতা দক্ষ যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে। জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আপনার থাকতে হবে দক্ষ যোগাযোগের কৌশল। লেখালেখির দক্ষতার মাধ্যমে আপনি হতে পারেন দক্ষ জনসংযোগ কর্মকর্তা। লেখালেখির দক্ষতা আপনার জনসংযোগ কাজে ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে। মনযোগ দিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকলে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে তাড়াতাড়ি সফল হতে পারেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে, গণমাধ্যম নিয়ে ভালো জ্ঞান থাকলে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে তাড়াতাড়ি সফলতা পেতে পারেন। সৎভাবে কাজ করার মানসিকতা জনসংযোগ কাজে সফল হতে আপনাকে সাহায্য করবে। কৌতূহলী মনোভাব জনসংযোগ কর্মকর্তাকে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে সাহায্য করবে। যে প্রতিষ্ঠান এ জনসংযোগ কর্মকর্তা হবেন সে প্রতিষ্ঠান আর কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ সামাজিক মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় জনসংযোগ কর্মকর্তাকে সামাজিক মিডিয়ার টুলস সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
জনসংযোগ কর্মকর্তাকে ইংরেজিতে বলা হয় পাবলিক রিলেশন অফিসার। সংক্ষেপে পিআরও। পিআরও বা জনসংযোগ কর্মকর্তার কাজই হচ্ছে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করা। জনসংযোগ বলতে বোঝায় জনসাধারণের সঙ্গে কোনো পণ্য বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সংযোগ স্থাপন করে দেওয়া অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কাজ কিংবা কোনো উদ্দেশ্যে জনসমর্থন জোগাড় করা। বস্তুত জনসংযোগের উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়ানো তথা বাজার তৈরি করা, পুরনো গ্রাহক ধরে রাখা এবং নতুন ভোক্তা বা ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা। তবে যদি পণ্য বা পরিসেবার মান ভালো হয় তাহলে বাজার সৃষ্টি অনেক সহজ হয়। মোট কথা প্রত্যেক পেশাতেই সমৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সম্পর্কে মানুষের মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অর্জনের জন্য এটা করতে হয়। এ জন্য জনসংযোগের চাহিদা অত্যধিক। আমরা সহজ কথায় বলতে পারি, পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠা করাই হলো জনসংযোগ, আর তা যাতে স্থায়ী হয় তার প্রচেষ্টা করা হলো জনসংযোগের উদ্দেশ্য। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন দক্ষ জনসংযোগবিদ হতে হলে বহুমাত্রিক যোগ্যতা ও গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। থাকতে হয় প্রখর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা। একজন জনসংযোগ কর্মকর্তার মাঝে কয়েকটি গুণ থাকলে সে একজন দক্ষ এবং সফল জনসংযোগবিদ হতে পারে। গুণগুলো হলোÑ ইতিবাচক মনোভাব, স্মার্ট ও কঠোর পরিশ্রম, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ও প্রভাবিত করার ক্ষমতা। প্রতিটি পেশা বা কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকতে হয়। না হলে সে কাজে তৃপ্তি আসে না। একজন দক্ষ কর্মকর্তার অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত। যখনই প্রাতিষ্ঠানিক কাজ করার কমিটমেন্ট দেখাবেন তখনই পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে অনেকগুলো বাধা এসে সামনে দাঁড়াবে, সবগুলোকে তুচ্ছ করে আপনার সৎ মনোভাব নিয়ে স্বাধীন ও ঝুঁকিমুক্তভাবে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন সামনের দিকে।
আজকাল বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রচার কার্যক্রম শুধু প্রিন্ট মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বর্তমানে তারা দৃষ্টিপাত করছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দিকে। নিজেদের পরিচিতি বাড়ানো এবং ভোক্তা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের তথ্যচিত্র ও ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি, প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড, টিভি মিডিয়াতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে স্পন্সর করা, কনসার্টের আয়োজন করাসহ নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। ফলে জনসংযোগ পেশায় কাজের পরিধি এখন অনেক বেড়ে গেছে। কোনো সংস্থা বা কোম্পানি এখন জনসংযোগ বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারে না। পেশা হিসেবে জনসংযোগ অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর পেশা। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে জনসংযোগ বা যোগাযোগের মাত্রা সম্প্রসারিত হওয়ায় এই পেশার প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। জনসংযোগ জ্ঞান বা দক্ষতা থাকলে যে কেউ এ পেশায় আসতে পারেন। কর্মক্ষেত্র, ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক সব ক্ষেত্রেই জনসংযোগের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আপনার যদি ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে আর থাকে মানুষের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলার ও মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাহলে আপনি জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।

ষ সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার অ্যান্ড
       প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ,
        সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]