ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২২ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৬ জুলাই ২০২০

এবার জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে যা কিছু
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 26

মূলত জীবন, জীবিকা আর সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক চাকা সচল করার উদ্দেশ্যেই রোববার থেকে সব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এমনকি শেয়ার মার্কেটসহ সব কিছুই খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের পরিবহনও চালু হবে। তবে সবই হবে সীমিত পরিসরে। বন্ধ থাকবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই কার্যক্রম চলবে ১৫ জুন পর্যন্ত। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। এবারের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে, সর্বক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে সবাইকে। তবে না মানলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে ব্যাপারে তেমন কিছু বলা হয়নি।
সরকারি এ সিদ্ধান্তে বিভিন্ন সেক্টর সম্পর্কে কম বেশি আলোচনা সমালোচনা থাকলেও কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তের ফলে সংক্রমণ আরও বেড়ে যাবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এই আশঙ্কা কতটা সত্য বা মিথ্যা হবে, তা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই বোঝা যাবে।
তবে এদিকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার কথা সরকার বলার পরই পরিবহন সেক্টরের নেতারা তাদের ব্যবসায়িক হিসাবকে আলোচনায় এনেছেন। তারা বলেছেন বা বলতে চাইছেন যে, যদি ৪২ সিটের গাড়ির আসন সংখ্যা ২০-এ আনতে হয় তাহলে তার জন্য ভাড়াও পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। না হলে লাভতো দূরের কথা খরচও পোষাবে না। ঠিক এই ধরনের কথাবার্তা আসছে নৌপরিবহন এবং বিমান পরিবহন সেক্টর থেকেও।
তাহলে এর ফলে ঘটনা দাঁড়াল কী? ঘটনা দাঁড়াল এটাই যে এর ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বেশ বড় ধরনের অর্থদণ্ড হবে পাবলিকের।
আমরা জানি, ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই তাদের ব্যবসা ছাড়তে চান না। মানবতার বিষয়টি তারা মুখে বললেও তাদের ব্যবসার লাভ লোকসানের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়াতে চান না। এখানেও ঠিক একই ঘটনা ঘটবে, এটা নির্দ্বিধায়
বলা যায়।
শেষ পর্যন্ত ঘণ্টাখানেকের বৈঠকে বিআরটিএ’র স্থায়ী ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি রাজধানী ঢাকাসহ দূরপাল্লা রুটে বাসের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয় যা কার্যকর হয়েছে ১ জুন থেকেই। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সে এভাবে প্রকৃতপক্ষে সবদিক বিচার বিবেচনা না করেই তড়িঘড়ি বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার অনুমোদন দিল সেটা কতটা যৌক্তিক হয়েছে সেটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার এই বিষয়টি আপৎকালীন সিদ্ধান্ত তবে পরবর্তীকালে এ ভাড়া আবার কমানো হবে কি না সেটা কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছেন না।
এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩০০ ট্রেনের মধ্যে ১৯ জোড়া ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব ট্রেনের ৫০ শতাংশ আসন স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে ফাঁকা রাখা হবে। পাশাপাশি ট্রেন জীবাণুমুক্ত করা সহ স্বাস্থ্যবিধির প্রায় সবই মানার মূল দায়িত্ব থাকছে রেল কর্তৃপক্ষের। তবে রেল কর্তৃপক্ষ ভাড়া না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আর যা-ই হোক, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমবে।
পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ৩টি রুটে ১ জুন থেকে সে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে সেখানে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। ভাড়া নেওয়া হচ্ছে
আসার মতোই।
বিগত ১ জুন থেকে ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩টি রুটে মোট ২৪টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুর রুটে। প্রতিদিন এই রুটগুলোতে বাংলাদেশ বিমান, নভোএয়ার এবং ইউএস বাংলা প্রতিটি ফ্লাইটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৫০ শতাংশ আসন খালি রেখে যাত্রী পরিবহন করছে।
এবার অন্য প্রসঙ্গ, আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের নৈরাজ্য নিয়ে এই কলামে বেশ কয়েকবার লিখেছি কিন্তু তাতে কার কী এসে গেছে? অনেক পত্রপত্রিকায় দিনের পর দিন ব্যাংকিং সেক্টরের নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাতেই বা কী হয়েছে? কে শুনেছে, কার কথা। আমরা জানি না, কার ক্ষমতার জোর কোথায় এবং কতটা? আমরা দেখেছি বেসিক ব্যাংকের মহাক্ষমতাবান এমডি আব্দুল হাই বাচ্চুর ক্ষমতার দাপট। যার বিরুদ্ধে একটা আমরাও বোধ হয় করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মামলা খেয়েছেন ওই ব্যাংকেরই অন্যান্য কর্মকর্তারা। সেই বাচ্চু এখন কোথায়? কী বিচার হলো তার স্বেচ্ছাচার আর দুর্নীতির? এই প্রশ্নের উত্তর এখন কি আর পাওয়া যাবে? মনে হয় না। গণমাধ্যমের বদৌলতে এ রকম আরও অনেক ঘটনা জানে আমাদের দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ যিনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষপদ থেকে একদিন অবসর গ্রহণ করে পরবর্তীকালে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ করে কয়েক মাস আগে ওই পদ থেকে পদত্যাগ করে ঘরে উঠেছেন। করোনার কারণে তার সঙ্গে আড্ডায় বসে ভেতরের খবরটা জানার এখনও সুযোগ না হলেও এই কদিন আগে সিকদার গ্রুপের দুই পরিচালকের বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের এমডি এবং তার সঙ্গী ওই ব্যাংকেরই আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর চালানো যে ভীতিকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেখলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আমার বন্ধুটি যে কেন পদত্যাগ করেছেন তার কারণটা অন্তত অনুমান করতে পারি।
ওই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সিকদার গ্রুপের সেই দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল কোন অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তারাতাদের নিজস্ব উড়োজাহাজে করে সবার চোখের সামনে দিয়েই রোগী সেজে চলে গেলেন ব্যাংককে।
তুমুল আলোচিত এই ঘটনা প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেছেন, ব্যাংকাররা বরাবরই বলছেন তারা চাপের মধ্যে থাকেন। চাপটি সে কতটা ভয়ঙ্কর এ ঘটনায় তা প্রকাশ পেয়েছে। এক বেসরকারি ব্যাংকের এমডিকে গুলি করার ঘটনা চিন্তাও করা যায় না। এতে সকল ব্যাংকের ব্যাংকাররা আতঙ্কে থাকবেন। তারা হয় গুলি খাবেন অথবা চাকরি ছাড়বেন। এভাবে চলতে থাকলে জনগণের আমানত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। ঋণ দিয়ে তা আদায় করা যাবে না। বর্তমানে ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে জর্জরিত।
এই যদি হয় আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা তাহলে সাধারণ মানুষ কেমন করে ভরসা রাখবে কোনো ব্যাংকের ওপর। কী গ্যারান্টি আছে যেকোনো দিন যেকোনো ব্যাংকের অবস্থা এক সময় বেসিক বা ফার্মাস ব্যাংকের মতো হবে না?
এবারে সেই অনাকাক্সিক্ষত হৃদয় বিদারক ঘটনাটির কথাই বলতে চাই। তবে তার আগে ছোট্ট একটি প্রশ্নে করতে চাই আমাদের নিজেদের কাছেই। আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের জীবন কি এতই মূল্যহীন? কেন লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ঝরে গেল ২৬ জন অসহায় বাংলাদেশির প্রাণ। এর বিচার কোথায় পাব? মনে হয় না শেষ পর্যন্ত এই নিদারুণ মর্মস্পর্শী ঘটনার কোনো বিচার পাব। গত দু’তিন বছরের মধ্যে অসহায় বহু বাংলাদেশির জীবন গেছে এই সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারীদের হাতে। তারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছে মানবপাচার। যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে আমাদের দেশের এক বিশাল দুবৃত্ত চক্র।
আমরা থাইল্যান্ডের কথা ভুলিনি। সেখানে কেমন করে বাংলাদেশি শ্রমিকদেরকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে জঙ্গলের ভেতরে তাদের মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল। কত মানুষ যে তাদের প্রলোভনে পড়ে ইঞ্জিন বোটে করে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় সাগরের গভীর অতলে তলিয়ে গেছে, তার সঠিক হিসাব আমরা কোনোদিনই পাইনি।
কিন্তু অবাক বিষয়টি হচ্ছে, দিনের পর দিন এই মানবপাচারকারী চক্রগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলতে গেলে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে। কীভাবে এটা সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তর সহজে পাওয়া যায় না। আমার প্রশ্নটি আমি এখানেই তুলতে চাই। কেন তাহলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ধরনের নৃশংস ঘটনার বিবরণ দেখার পরও আমরা সেই মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের প্রলোভনে ভুলে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে পা বাড়াই। দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় বারবার বিভ্রান্ত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে শেষ পর্যন্ত
জীবনটাও বিসর্জন দেই? আমরা এত
বোকা কেন?
আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে লিবিয়ায় এবারে সে নৃশংস ঘটনাটি ঘটল যাতে প্রাণ গেল প্রায় ত্রিশজন অসহায় বাংলাদেশির কতিপয় দেশি-বিদেশি মানব পাচারকারীর হাতে, শেষ পর্যন্ত এর বিচার কতটা আমরা পাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ এদের ক্ষমতার হাত এতটাই লম্বা যে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া অতীব কঠিন কাজ। তা ছাড়া শুধু বাংলাদেশের সরকার আর মানুষই নয় বরং সারা পৃথিবীর মানুষ আজ করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত দিশেহারা। এর মধ্যে অন্য কোনো কিছু নিয়ে ভাবার সময় পাওয়াও দুষ্কর হয়ে উঠেছে। এদিকে ৩১ মে থেকে দেশে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রতিশ্রুতিতে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত এবং দোকানপাট খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১ জুন থেকে গণপরিবহন চলছে সর্বত্র। কিন্তু তাতে স্বাস্থ্যবিধি তেমনভাবে মানা হচ্ছে কই? মনিটরিংই বা করছে কে বা কারা? তাহলে আমরা কি কিছু ভুল বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি?

ষ কথাসাহত্যিক ও সাংবাদিক







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]