ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২২ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৬ জুলাই ২০২০

বাস্তবতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ বাঞ্চনীয়
স্বপ্না রেজা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 10

গল্প দিয়ে লেখা শুরু করছি। গল্পটা প্রাসঙ্গিক মনে হলো। আমার গৃহ ব্যবস্থাপক মর্জিনা। সাত বছরের সন্তান নিয়ে আমার সঙ্গে তার বসবাস। করোনাকালে কোথাও তার যাবার জায়গা নেই। স্বামী তার খোঁজ রাখেন না। মরলে আপনার সঙ্গেই মরব এমন কথায় সে রয়ে যায় ছেলে নিয়ে। প্রায় প্রতিদিন করোনার খবর শোনে সে। কতজন আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে বা সুস্থ হয়েছে প্রতিদিন দুপুর আড়াইটার আওয়াজ ঘড়িতে বেঁজে উঠলে টিভির সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু জিনিস শিখেছে সে করোনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য। যেমন ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক ও হ্যান্ড গøাভস পরে কাজ করা, লেবু পানি খাওয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। তবে টিভিতে জনগণের ঘোরাফেরা দেখে সে আৎকে ওঠে।
লকডাউন শব্দের মানে না জানলেও আন্দাজ করে নেয় এমন সময় ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি করলে করোনায় ধরতে পারে। করোনায় মানুষের মৃত্যু হয়। আমার মতো মর্জিনা টিভির সংবাদে শুনল। জনপ্রশাসন থেকে বলা হয়েছে ৩১ মে থেকে সীমিত সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সড়কে গণপরিবহন চলাচল করতে পারবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীবাহী নৌযান এবং ট্রেনও চলাচল করবে। জনপ্রশাসন থেকে আরও বলা হয়েছে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিসে কাজ করবে। সংবাদ শুনে সে কিছু ভাবছে বুঝলাম। প্রশ্ন করলাম, বাড়ি যাবি? উত্তর দিল, না। এখন তো রোগ বাড়তেছে, তাহলে সবাইকে ছাইড়া দিল যে! মর্জিনাকে প্রশ্ন করলাম, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলেছে সবাইকে। তাই হালকা করেছে নিয়ম। স্বাস্থ্যবিধি কী জানিস? আজব লাগল প্রশ্নটা তার কাছে। আকাশ থেকে পড়ল। তারপর মুচকি হেসে জবাব দিল, স্বাস্থ্য তো এইসব হাত-পা। আর বিধি তো কপাল যা আল্লাহ লিখে দেন। মর্জিনা তার জ্ঞানানুযায়ী জবাব দিয়েছে।
যাই হোক স্বাস্থ্যবিধি শব্দটা যুক্ত করে অর্থনৈতিক প্রয়োজনের অজুহাতে লকডাউন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো স্বাস্থ্যবিধি বলতে জনসাধারণ কী বুঝেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনসাধারণকে কী বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন। যখন ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা বাংলাদেশে ফিরলেন তখন কিন্তু খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি মানানো সম্ভব হয়নি। অথচ বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমণ ছড়ায় প্রবাসীদের থেকেই। বিদেশফেরতদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অব্যবস্থাপনা, অগোছালো প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সম্পন্ন করা হয়। যাতে করে এক পর্যায়ে প্রবাসীদের খুঁজে ফিরতে হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। বিদেশফেরতরা কোথায় থাকবে, থাকছে সেই তথ্য পাসপোর্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়। অথচ পাসপোর্টের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা যে ব্যক্তিকে খুঁজে পাবার জন্য যথার্থ নাও হতে পারে এই চিন্তা মাথায় রেখে বিদেশফেরতদের ঠিকানাটা লিখে রাখবার প্রয়োজনীয়তা ছিল না কারও মধ্যে।
সেই সময়ে সংশ্লিষ্টদের এতটা উদাসীনতা, শিথিলতা ও খামখেয়ালিপনার ফলাফল কিন্ত আজকের বেড়ে যাওয়া এই সংক্রমণ। এই ব্যর্থতা, শিথিলতার কারণে কমিনিটিতে ট্রান্সমিশন বা সংক্রমণ বেড়েছে বহুগুণে।  শুরুর গাফলতির খেসারতই বর্তমান পরিস্থিতি। তখন জনগণ সিরিয়াসলি নেয়নি বিষয়টি। এখনও নিচ্ছে না। তাই সতর্কতা, সচেতনতা ও বিধি আরোপ, সড়কে, অলিগলিতে পুলিশ দাঁড় করিয়েও সম্ভব হয়নি জনগণকে স্বাস্থ্যবিধিভাবে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলায় অভ্যস্থ করা। বরং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন।
এখন প্রশ্ন হলো কেনো জনগণকে নিয়মের ভেতর, নিয়ন্ত্রণের ভেতর আনা সম্ভব হচ্ছে না? এক কথায় উত্তর, জনগণ দায়িত্বশীলদের কান্ডজ্ঞান সম্পর্কে অবগত আছেন। দায়িত্বশীলরা কখন কী বলেন, করেন, কতটা তা যুক্তিযুক্ত ও জনগণের জন্য কল্যাণকর হয়, জনগণ তা বেশ বোঝেন। এদেশে অর্থ দিয়ে ক্ষমতা কতভাবে পকেটজাত করা হয় এমন অনেক গল্প জনগণের মুখে মুখে। ফলে জীবনের জন্য ঝুঁকির কঠিন বিষয়টাও পাতলা লাগে সাধারণের কাছে। এই যে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিসে কাজ করছে এবং ৩১ মে থেকে সীমিত সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সড়কে গণপরিবহন, নদীতে নৌযান ও ট্রেন চলচলা করার  ঘোষণা দেওয়া হয়, ঘোষণাটি কতটা ঝুঁকিমুক্ত জনগণের জন্য? ভেবেছি? ৩১ মে তারিখ থেকে অফিসে সবাই কাজ করছে, আর সেদিন থেকেই গণপরিবহন, নৌযান ও ট্রেন চলতে শুরু করেছে। সবাই যে ঢাকায় আছেন, সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কী  করে নিশ্চিত হলেন! প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাইরে থেকে যেভাবে মানুষজন ঢাকায় ছুটে এসেছে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব না মেনে, এটা কী সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসা, নাকি স্বাস্থ্যবিধি মেনে আসার পথ দেখানো? দায়িত্বশীলরা বুঝেন তো স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব কী? ৩১ মে যদি অফিসে সবাইকে কাজ করতেই হবে তাহলে কেনো গণপরিবহন, নৌযান ও ট্রেন চলাচলের উপযোগী ব্যবস্থা স্বাস্থ্যবিধি মতো আরও আগে করা সম্ভব হলো না? একটা ট্রায়াল হতে পারত জনগণ কীভাবে, কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে এবং পরিবহন, নৌযান ও ট্রেন কর্তৃপক্ষ সেই বিষয়টি কতটা নিশ্চিত করতে পারবেন কিংবা পারছেন কিংবা সেই উপযোগী ধ্যান, জ্ঞান আদৌও তাদের আছে কি না জেনে নেওয়া যেত। পরিবহন ব্যবসায়ীরা টাকা ছাড়া কখনও কিছু চিনেছেন এমন দৃষ্টান্ত খুবই কম। বাড়তি লাভে ফিটনেস ছাড়া গাড়ি, নৌযান যেমন চালিয়েছেন তেমনি যাত্রী ধারনের ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে যাত্রীদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি করোনা থেকে যাত্রীদের নিরাপদ চলাচলে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনুভব করতে পারতেন কতটা কড়া কৌশল, শাসন প্রয়োগ দরকার। তা ছাড়া যানবাহনের চালকদের, হেলপারদের, কর্মচারীদের, মালিকদের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়টি শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া দরকার ছিল কি না তা তো ভাবার জন্য সময় নেওয়া যেত। তারা আদৌও বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন, সতর্ক কি না সংশয় আছে। মালিকরা বরাবরের মতো ব্যবসাকেই প্রাধান্য দেবেন বলে ধারণা। প্রচারমাধ্যমে যেভাবে ঢাকামুখী মানুষের স্বাস্থ্যবিধিকে তুড়ি মেওে ছুটে আসার দৃশ্য দেখানো হচ্ছে, সংক্রমণের ভয়াবহ কথা বলা হচ্ছে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা সেসব দেখেন কি না জানা নেই। তবে যদি দেখতেন তাহলে নির্ঘাত তাদের চেতনার বদ্ধ জানালাটা খুলে যেত। বুঝতেন করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটা ভয়াবহ দিক হলো জীবিকার তাগিদে সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনায় এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্মত নয়  না এমন প্রক্রিয়ায় ছুটে আসা।
যখন লেখাটা লিখছি তখন ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশে ২৪ ঘন্টায় এই সংখ্যা মৃত্যুর। হয়ত আমরা সেইদিকেই এগুচ্ছি। উন্নত বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা চিন্তা করে লকডাইন শিথিল করতে শুরু করেছে। নিঃসন্দেহে আমাদেরও আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থাকে ফিরিয়ে আনার কাজটি যারা করবেন সেই মানুষগুলোর সুরক্ষার কথা না ভাবলে কাকে দিয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা উদ্ধার হবে, প্রশ্নের উত্তর হাতে নিয়ে পরিকল্পনা করলে পরিকল্পনাটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হবে। বাঁশি বাজিয়ে একাধারে সবাইকে অফিস করতে বলা, সীমিত আকারে পরিবহন, নৌযান, ট্রেন চলাচল সব শুরু করতে বলা রিলেরেস হয়ে গেল না? ধাপে ধাপে পরীক্ষিত উপায়ে, পর্যবেক্ষণ করে কাজগুলো করলে সম্ভবত জীবনের ঝুঁকি কমত। শত্রæ তো অদৃশ্য। ক্ষুদ্র অণুজীব। অস্ত্রের আঘাতে এই শত্রæকে তো পরাস্থ করা সম্ভব নয়। ক্রসফায়ারে তো নয়ই। এখানে দরকার বিচক্ষণতার। যে বিচক্ষণতা জনগণকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকায় জীবনমুখী করে তুলতে সক্ষম হবে। সুস্থতার অভ্যাসে, নিয়মে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে সফল হবে। তেমন বিচক্ষণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় খুব দরকার। যার কোনো বিকল্প নেই। জীবিকার টানে সাধারণ মানুষগুলো কেনো এমন দিশেহারা হয়ে ছুটে যায়, ছুটে আসে তার কারণ শুধুই তাদের সীমিত জ্ঞান নয়, বরং এর একটা বড় কারণ দায়িত্বশীলদের কারও কারও চেতনার অপরিপক্কতা।
পরিশেষে বলব, উন্নত বিশ্বের দিকে তাকিয়ে নয়, বরং নিজ দেশের বাস্তবতা, সক্ষমতা, পরিবেশ, সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই নিজ দেশের পরিকল্পনা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। তাহলে অন্তত স্বপ্নপূরণ সহজ হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

ষ কথাসাহিত্যিক






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]