ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২২ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৬ জুলাই ২০২০

জীবিকায় সচ্ছলতা লাভের আমল
মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২০, ১১:৪০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 116

মানুষ বলতেই সবাই সচ্ছল জীবন ও জীবিকার অধিকারী হতে চায়। চায় সে জীবনের অনিবার্য অবলম্বন জীবিকার ব্যাপারে ভাবনামুক্ত হতে। আল্লাহ তায়ালা মুমিনের প্রাত্যহিক জীবনাচারেরই কিছু কর্মকাÐের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য রেখেছেন, সেসবের সুষ্ঠু অনুসরণের ফলে জীবিকার চেষ্টায় নিয়ত গলদঘর্ম হতে মুক্তি পেতে পারে। সহজে সচ্ছল জীবিকা লাভের কিছু আমলে কথা এখানে আলোচনা করা হলো।
তওবা ও ইস্তেগফার : আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকা লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো তওবা-ইস্তেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। হজরত নূহ (আ.) স্বীয় কওমকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অজস্র বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বৃদ্ধি করে দেবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নূহ, আয়াত : ১০-১২)। আয়াতটিতে আল্লাহ পরিষ্কার বলেছেন, তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে তিনি ধনসম্পদ বাড়িয়ে দেবেন। সুতরাং জীবিকার সচ্ছলতা প্রত্যাশীদের জন্য অধিক পরিমাণে তওবা ও ইস্তেগফার করতে থাকা উচিত।
তাকওয়া ও খোদাভীতি : তাকওয়া ও খোদাভীতি যে জীবিকা লাভের অন্যতম একটি উপায়, এ প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন।’ (সুরা তালাক, অয়াত : ২-৩)। হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) উপরোক্ত আয়াত দুটির তাফসির প্রসঙ্গে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশাবলি পালন করে এবং তার নিষিদ্ধ কার্যাবলি হতে বিরত থেকে তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সকল বিপদাপদ হতে মুক্ত হওার পথ করে দেবেন, যেখান থেকে রিজিক লাভ করার কথা সে স্বপ্নেও চিন্তা করে না।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৪০০)
আল্লাহর ওপর ভরসা : যেসব উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে জীবিকায় সচ্ছলতা লাভ করা যায়, তন্মধ্যে অন্যতম হলো মহান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিতÑ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার ওপর যেমন ভরসা করা উচিত তোমরা যদি তার ওপর তেমন ভরসা কর, তা হলে পাখিদেরকে যেভাবে রিজিক প্রদান করা হয়, অর্থাৎ সকালে তারা শূন্য উদরে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যায় পূর্ণ উদরে ফিরে আসে, তোমাদেরকেও ঠিক এভাবে রিজিক প্রদান করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)। তবে তাওয়াক্কুল অর্থ জীবিকা লাভের জন্য চেষ্টা-পরিশ্রম ত্যাগ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং যথারীতি মেহনতের পাশাপাশি ভরসা রাখতে হবে মহান আল্লাহর ওপর। আর এ বিশ^াস রাখতে হবে যে, সমস্ত কিছু তার হাতেই নিয়ন্ত্রিত এবং রিজিকের ব্যবস্থা একমাত্র তিনিই করে থাকেন।
ইবাদতের জন্য অবসর হওয়া : ইবাদত-বন্দেগির জন্য সময় বের করা। রবের ইবাদতের জন্য হৃদয়কে পরিপূর্ণ একাগ্র করার ক্ষেত্রে অধিক যতœবান হওয়ার দ্বারাও সচ্ছলতা লাভ হয়। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) একটি হাদিসে কুদসিতে বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে বনি আদম! তুমি আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে ফারেগ ও অবসর কর। তা হলে আমি তোমার হৃদয় ও আত্মাকে সম্পদশালী করে দেব এবং তোমার দরিদ্রতাকে দূর করে দেব। আর যদি তা না কর তা হলে তোমার হাত অর্থহীন কাজে ব্যস্ত করে দেব আর লোকের কাছে তোমাকে মুখাপেক্ষী করে রাখব।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৬)
ধারাবাহিকভাবে হজ ও ওমরা পালন : অর্থাৎ হজ সম্পাদনের পর ওমরার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং ওমরা শেষ হলে পুনরায় হজের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা প্রশস্ত রিকিজ ও সচ্ছলতা লাভের অন্যতম উপায়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘হজ ও ওমরা একের পর এক আদায় কর। কারণ, এ দুটি দরিদ্রতা ও গোনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয় যেমন হাপর (অগ্নি) লৌহ ও স্বর্ণ-রৌপ্যের ময়লা দূর করে দেয়। আর হজে মাবরুরের প্রতিদান শুধুই জান্নাত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮১০)। অতএব নিজেদের গোনাহের বোঝা এবং অভাব ও দরিদ্রতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত হজ ও ওমরা পালন করতে হবে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা : জীবিকায় সচ্ছলতা লাভের আরেকটি উপায় হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিতÑ নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রিজিকের সচ্ছলতা ও দীর্ঘজীবন পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৫)। তাই সাধ্যমতো আত্মীয়দের উপকার করা এবং যথাসাধ্য অনিষ্ঠ হতে তাদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করা।
আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করা : জীবিকায় সচ্ছলতা লাভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হল আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করবে, তাকে পারলৌকিক প্রতিদানের পাশাপাশি দুনিয়াতেও প্রতিদান দেওয়া হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেন।’ (সুরা সাবা, আয়াত : ৩৯)। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) একটি হাদিসে কুদসিতে বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমরা ব্যয় কর, তবে আমিও তোমাদের জন্য ব্যয় করব।’ (মুসলিম, হাদিস : ৯৯৩)। আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়কারীদের জন্য সচ্ছলতার এর চাইতে পোক্ত প্রতিশ্রæতি এবং রিজিক লাভ করার এর চাইতে সহজ ও নিশ্চিত মাধ্যম আর কি হতে পারে!
দ্বীনের শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করা : জীবিকায় সচ্ছলতা লাভের আরেকটি উপায় হল দ্বীনের শিক্ষার্থীদের পেছনে সম্পদ ব্যয় করা। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজির (সা.) জমানার দুই ভাইয়ের ঘটনা। তাদের একজন নবী করিমের (সা.) খেদমতে ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করার জন্য আসত এবং অপরজন জীবিকা-অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকত। যে ভাই জীবিকা অর্জনের জন্য মেহনত করত, একদিন সে নবী করিমের (সা.) নিকট এসে নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। জবাবে নবী করিম (সা.) বললেন, ‘হতে পারে তোমাকে তার অসিলাতেই রিজিক প্রদান করা হচ্ছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৫)। তাই পর্যাপ্ত রিজিক লাভে প্রত্যাশী ব্যক্তিদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনকারী ছাত্রদের পেছনে নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে আল্লাহর পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
 
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]