ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২২ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ৬ জুলাই ২০২০

গণপরিবহন, মার্কেট কোথাও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি
করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে ফের  সাধারণ ছুটি ও রেডজোনে লকডাউন!
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০, ১১:২৭ পিএম আপডেট: ০৪.০৬.২০২০ ১২:৩৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 357

সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজের চেনা রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকা। কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে যানবাহনের পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের চলাচল। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন ও মার্কেট খুলে দেওয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটা মানা হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানছে না রাজধানীর গণপরিবহনগুলো। আর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লঞ্চে শারীরিক দূরত্বসহ কোনো স্বাস্থ্যবিধিই মানা হচ্ছে না। এই অবস্থায় আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বেশি আক্রান্ত হওয়া জেলাগুলোকে রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত পুনরায় সাধারণ ছুটির পাশাপাশি লকডাউন করার কথা চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই টানা ৬৬ দিনের ছুটি শেষে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধিসহ বিভিন্ন নির্দেশনা মানা সাপেক্ষে সীমিত পরিসরে সরকারি-বেসরকারি অফিস খুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বন্ধ থাকা গণপরিবহনও (বাস, লঞ্চ, ট্রেন) চালু হয়। কিন্তু সব কিছু খুলে দেওয়ার পর করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। বুধবার
একদিনে আরও ৩৭ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭৪৬ জন। বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ হাজার ৬৯৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাতে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ১৪০ জনে। সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে আরও ৪৭০ জন।
দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর ১ জুন থেকে অর্ধেক যাত্রী নেওয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে। গণপরিবহনের ক্ষতি পোষাতে ভাড়া ৬০ ভাড়া বাড়ানো হলেও এর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি না মানার ঘটনাও ঘটছে। গণপরিবহন চালু হওয়ায় বেড়েছে মানুষের চলাচল। পরিবহনের অভাবে এতদিন যারা ঘর থেকে বের হননি তারাও এখন বাইরে বের হচ্ছেন। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চালু হওয়ায় রাজধানীর বাইরে থেকে আসা মানুষের চাপও বাড়ছে রাজধানীর ওপর। বুধবার রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, বাসে ওঠার সময় যাত্রীর তাপমাত্রা পরীক্ষা করার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাসই তা করছে না। বাসে ওঠার সময় জীবাণুনাশক স্প্রেও করা হচ্ছে না। এ ছাড়া বাসের হেলপার প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থেকে গায়ে হাত দিয়ে দিয়ে যাত্রী তুলছেন। এতে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়ার। এভাবে চললে গণপরিবহনের মাধ্যমেই করোনার ব্যাপক বিস্তার ঘটবে। রাজধানী ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ গণপরিবহনেই তাপমাত্রা পরীক্ষার থার্মাল স্ক্যানার নেই। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। শারীরিক দূরত্ব তো মানা হচ্ছেই না বরং অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে চলছে লঞ্চগুলো। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বুধবারও চাঁদপুর থেকে লঞ্চে করে রাজধানীতে ফিরেছে অংসখ্য যাত্রী। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটেও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যাত্রী পারাপার হয়েছে। গাদাগাদি করে চলেছে যাত্রী পরিবহন। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মার্কেটগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, এই প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতেও শ্রমজীবী, গরিব, খেটে খাওয়া, স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন তুলে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন ও সরকারি বেসরকারি অফিস ও মার্কেট খোলা যাবে। কিন্তু গত চার দিনের যে চিত্র তাতে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাই বেশি। তারা জানান, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন এই তিন জোনে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যেসব এলাকায় করোনার সংক্রমণ বেশি সে সব এলাকাকে রেডজোন  হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। তাই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে ও ভয়ঙ্কর পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বাধ্য হয়ে পুনরায় সাধারণ ছুটি ও বেশি আক্রান্ত এলাকাকে রেডজোন চিহ্নিত করে সেখানে লকডাউন দিতে হবে। ওই এলাকার লোকদের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। বাইরে থেকেও রেডজোনে লোকদের প্রবেশ সীমিত করা হবে। আর যেসব এলাকায় করোনার সংক্রমণ কম, সে সব এলাকাকে ইয়েলো জোন হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রান্তদের ঘরবাড়ি লকডাউন করে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো হবে। যেসব এলাকায় এখনও করোনা রোগী পাওয়া যায়নি, সে সব এলাকায় যাতে বাইরের কেউ ঢুকতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এমন সিদ্ধান্তই রয়েছে। তারা জানান, এই সময়ে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য পরীক্ষা আরও বাড়ানো হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সব কিছু খুলে দেওয়া হয়েছে ১৫ দিনের জন্য। এর মধ্যে আগামী এক সপ্তাহ কঠোরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। সংক্রমণের এই মাত্রা আরও বাড়লে পুনরায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও বেশি আক্রান্ত এলাকায় লকডাউন দিয়ে তা কার্যকর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকলে ফের সাধারণ ছুটি দেওয়া হবে কি নাÑ জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি দেখি ব্যাপক অবনতি ঘটছে তাহলে তো আমাদের (ছুটিতে যাওয়া ছাড়া) বিকল্প কিছু থাকবে না। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাÐগুলো চালিয়ে নেওয়ার জন্যই এটা খুলে দেওয়া হয়েছে। মানুষ যাতে মাস্ক পরে নিরাপদ দূরত্বে থাকে, আমরা সেটা বলছি। যখন মানুষ এটা করতে ব্যর্থ হবে এবং এটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তখন তো ঘরে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি যে ৮৫ শতাংশ করোনা আক্রান্ত রোগী ঘরে বসেই চিকিৎসা নিতে পারবে। সংক্রমণ যাতে না বাড়ে সে জন্য আমরা ব্যাপকভাবে চেষ্টা করছি। ছোট দেশ বিশাল জনসংখ্যা, ম্যানেজ করা কঠিন হচ্ছে। সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে সরকারি দফতরগুলোকে অফিস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা ১৫ দিনের জন্য সব খুলে দিয়েছি। আজ চতুর্থ দিন যাচ্ছে। প্রথম দিনের চেয়ে আরও কম সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে অফিস করছি। অফিস টাইমটাও খুবই ফ্লেক্সিবল। যার যখন কাজ শেষ হবে দ্রæত চলে যাবে। যদি কেউ ২ ঘণ্টায় কাজ শেষ করতে পারে সে চলে যাবে। যদি না এসে বাসায় বসে করতে পারে করে দেবে। কোনো কিছু আটকাবে না। কিন্তু মুভমেন্টটা কম থাকবে।
স্বাস্থ‌্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা সংক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনা প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। সরকার সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়ার সময় এবং আগে পরে স্বাস্থ‌্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন‌্য জনগণের প্রতি আহŸান জানিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও কিছু কিছু মানুষ স্বাস্থ‌্যবিধি মানতে শৈথিল‌্য প্রদর্শন করছে, যা সংক্রমণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আক্রান্তের সংখ‌্যাও বাড়ছে। এ অবহেলা নিজের জন‌্য শুধু নয়, পরিবার, সমাজ তথ‌া অন‌্যদের জন্যও ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সচেতনতার প্রাচীর গড়ে তোলার আহŸান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলে, আমাদের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানায় পরিস্থিতি যদি আরও অবনতি হয় এবং তা যদি জনস্বার্থের বিপরীতে চলে যায়, তাহলে সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনস্বাস্থ‌্য রক্ষায় সরকার আরও কড়াকড়ি, আরও কঠোর হতে বাধ‌্য হবে। দেশে করোনা ভাইরাসের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতিতে সরকার সংক্রমিত এলাকা এবং এর নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে এলাকাভিত্তিক বা জোনে বিভক্ত করার বিষয়টি ভাবছে বলে জানান তিনি। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নিজের সরকারি বাসভবন থেকে মেট্রোরেল প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে কাদের আরও বলেন, জনগণের ঘনত্ব, সংক্রমণেরর মাত্রা, রোগীর সংখ‌্যা, পাশর্^বর্তী এলাকার যোগাযোগ ব‌্যবস্থা, টেস্ট ফ‌্যাসিলিটি, চিকিৎসা সুবিধাসহ নানা বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। বিশেষজ্ঞগণ এই বিষয়ে কাজ করছে। কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। বিস্তারিত পরিকল্পনা পাওয়া গেলে যাচাই-বাছাই করে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একটা চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে। এই সময়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা হবে। এর পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জনগণ ও দেশের কথা চিন্তা করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]