প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২১, ৯:৩৮ পিএম
আমাদের দেশে লাখ লাখ রেকর্ড সংশোধনের মোকদ্দমা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা, আদালতে দীর্ঘসূত্রতা সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিচারিক কর্তৃপক্ষের অভাবে এ মামলায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। সিএস, আরএস, এসএ বা বিএস খতিয়ান আমাদের দেশে রয়েছে। এসব খতিয়ানে বিশেষ করে শেষেরটিতে প্রচুর পরিমাণ ভুল রয়ে গেছে। একজনের জমি আরেকজনের নামে রেকর্ড হয়ে গেছে, জমির পরিমাণ ভুল উল্লেখ করা হয়েছে কিংবা জমির দাগ ভুলভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। খতিয়ানে ভুল থাকার কারণে জমি কেনাবেচার সময় নানারকম জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এসব জটিলতা নিরসনে সরকার ভ‚মি জরিপ ট্রাইব্যুনালসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পদে পদে রয়েছে নানা রকম বিড়ম্বনা। এবার খতিয়ানগুলো সম্পর্কে জেনে নিই।
সিএস খতিয়ান : ১৮৮৮ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের তত্ত¡াবধানে বাংলায় একটি ভ‚মি জরিপ হয় যাকে সিএস জরিপ বলে। কক্সবাজারের রামু থানা থেকে শুরু হয়ে দিনাজপুরে এ জরিপ শেষ হয়। প্রথম হলেও এ জরিপকে নির্ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই জরিপের মাধ্যমে তৈরি নকশাকে সিএস নকশা এবং খতিয়ানকে সিএস খতিয়ান বলা হয়। সিএস খতিয়ান বাংলাদেশে প্রচলিত খতিয়ানসমূহের মধ্যে প্রথম। অধিকাংশ সময় মামলা-মোকদ্দমায় কিংবা বিবাদ মীমাংসার ক্ষেত্রে এ খতিয়ানকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। সিএস শব্দের পূর্ণ রূপ হচ্ছে ক্যাডাস্টারাল সার্ভে যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় তফসিলভুক্ত জরিপ।
এসএ খতিয়ান : রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর মাধ্যমে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পর জমিদারদের নিকট থেকে অধিগ্রহণকৃত জমির হিসাব নির্ণয়, বিলুপ্ত জমিদারির ক্ষতিপূরণ প্রদান, জমির দখলদার রায়তদের জমির মালিক হিসেবে সরকারের অধীনে আনয়ন ও মালিকানার স্বীকৃতি প্রদান প্রভৃতি কারণে ভ‚মি জরিপের প্রয়োজন দেখা দেয়। সিএস রেকর্ড সংশোধনের লক্ষ্যে জমিদারদের নিকট থেকে কাগজপত্র সংগ্রহের পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ এর মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত জরিপের মাধ্যমে যে রেকর্ড প্রস্তুত হয়, তাকে এসএ জরিপ বা এসএ খতিয়ান বলে। সংক্ষিপ্ত সময়ে জমিদারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ জরিপের মাধ্যমে খতিয়ান প্রস্তুত হয় বলে এতে প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ফলে মধ্যস্বত্ব প্রথার বিলোপ হয় এবং পরিবারপ্রতি ভ‚মির সর্বোচ্চ সীমা ৩৭৫ বিঘা নির্ধারিত হয়। এসএ শব্দের পূর্ণ রূপ হচ্ছে স্ট্রেট অ্যাকুইজিশন যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ।
আরএস খতিয়ান : রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর পরবর্তী প্রস্তুতকৃত এসএ খতিয়ানে প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয় বিধায় তা সংশোধনের লক্ষ্যে সরকার একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৎকালীন সরকার ১৯৬৩ সাল থেকে যে সংশোধনী জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে খতিয়ান প্রস্তুত করে, তাই আরএস খতিয়ান নামে পরিচিত। ইতোমধ্যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় এ জরিপ শেষ হয়েছে এবং কিছু এলাকায় এখনও চলছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বিএস খতিয়ান, বিআরএস খতিয়ান, সিটি খতিয়ান মূলত আরএস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশ আমলে জরিপ শুরুর পর এর মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত আরএস খতিয়ান অনেক অঞ্চলে বিএস খতিয়ান নামে পরিচিত এবং কোনো কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় সিটি খতিয়ান নামে পরিচিত। আরএস শব্দের পূর্ণ রূপ হচ্ছে রিভিশনাল সার্ভে যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সংশোধিত জরিপ। বিএস বলতে বোঝায় বাংলাদেশ সার্ভে এবং বিআরএস বলতে বোঝায় বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে।
রেকর্ডে ভুল সংশোধনের উপায় ও সীমাবদ্ধতা : চ‚ড়ান্তভাবে রেকর্ড প্রকাশ হওয়ার পর সেটি সংশোধনে ভ‚মি জরিপ ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হতে হয়। স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট-১৯৫০’র ১৪৫(এ) ধারা অনুযায়ী ২০১২ সালে ভ‚মি জরিপ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে। এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ পরিচালনা করেন যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারক। কিন্তু ট্রাইব্যুন্যালেও রয়েছে জটিলতা। সব জেলাতে এ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি। আবার কোথাও অতিরিক্ত বিচারক দিয়ে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আবার রেকর্ড সংশোধনের মামলা করে আদালত থেকে কোনো ব্যক্তি ডিক্রি পেলে সেই মোতাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেবেন এটাই আইন। আদালতের রায় বা ডিক্রিমূলে নামজারি করতে গেলে আবেদনকারীর স্বত্ব সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি রাজস্ব কর্মকর্তা করতে পারেন না। কারণ রাজস্ব কর্মকর্তা বা এসি ল্যান্ডের কোনো বিচারিক ক্ষমতা নেই। তিনি জমির স্বত্ব নির্ধারণ করতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ডিক্রি পাওয়ার পরও দখল ও স্বত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে রাজস্ব কর্মকর্তা আবেদনকারীকে হয়রানি করেন ও উৎকোচ প্রদানে বাধ্য করেন। আবার আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা ভ‚মি জরিপ ট্রাইব্যুনালের কোনো রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করতে পারছেন না। আপিলের পরিবর্তে হাইকোর্টে রিট মামলার মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হচ্ছে।
তবে চ‚ড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড সংশোধনের বিষয়ে তিন ধরনের কর্তৃপক্ষ তিন ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে আইনত ক্ষমতাবান। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা বা সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) স্টেট অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ১৪৩ ধারা মতে এবং প্রজাস্বত্ব বিধিমালা ১৯৫৫-এর বিধি ২৩(৩) অনুযায়ী চ‚ড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের করণিক ভুল (ক্ল্যারিকাল মিসটেকস) যেমনÑ নামের ভুল, অংশ বসানোর হিসাবে ভুল, দাগসূচিতে ভুল, ম্যাপের সঙ্গে রেকর্ডের ভুল ইত্যাদি নিজেই সংশোধন করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, স্টেট অ্যাকুইজেশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ১৪৯(৪) ধারা মতে ভ‚মি প্রশাসন বোর্ড বোনাফাইড মিসটেক যেমনÑ জরিপকালে পিতার মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নামে সম্পত্তি রেকর্ড হওয়ার কথা থাকলেও জরিপকারকদের ভুলে তা হয়নিÑ এমন ভুল সংশোধন করতে পারেন। আবার ভ‚মি আপিল বোর্ডেরও এ ধরনের ভুল সংশোধনের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনো প্রয়োগ নেই। ভুক্তভোগীরা এসব জায়গার প্রতিকার চাইতে গেলে তাদের ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
খাস জমি হিসেবে রেকর্ড হলে ভোগান্তির শেষ নেই : ভুলক্রমে কোনো ব্যক্তির জমি ১ নাম্বার খাস খতিয়ানে (গ্রামের ভাষায় ডিসির নামে) অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে অর্থাৎ সরকারি খাস জমি হয়ে গেলে তাকে আদালতের মাধ্যমেই নাম সংশোধন করতে হয়। এতে ডিক্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তি অহেতুক লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হয়। প্রশাসনের কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বছরের পর বছর মূল মালিক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আদালতের রায় মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও এডিসি (রেভিনিউ) অনুমোদনের জন্য অহেতুক সময়ক্ষেপণ করেন। অথচ এ বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে যে দেওয়ানি আদালতের রায় সরকার মানতে বাধ্য, যদি না তা উপযুক্ত আদালত দ্বারা বাতিল হয়। (৪৫ ডিএলআর-৫)।
মামলা দায়েরের পর অনেক সময় সমন পাওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে (জেলা প্রশাসনের পক্ষে) কেউ আদালতে হাজির হয় না। ফলে সরকারের বিপক্ষে একতরফা ডিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু সরকারের বিপক্ষে একতরফা ডিক্রি গ্রহণযোগ্য নয় বলে এডিসি (রেভিনিউ) নামজারি প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে আপিল দায়ের করেন। যেসব কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে একতরফা ডিক্রি হয়, তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো নেওয়াই হয় না বরং ডিক্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মামলার ডিক্রির ফলভোগ হতে বিরত রাখা হয়।
জরিপ চলাকালীন ভুল ধরা পড়লে : জরিপ চলাকালে খতিয়ানে কোনো ভুল ধরা পড়লে তখন সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট ৩০ ধারা/৩১ ধারায় আপিল করে খুব সহজেই ভুলগুলো সংশোধন করে নেওয়া যায়। কিন্তু যদি এই সময়ের মধ্যে ভুলগুলো সংশোধন করা না হয় এবং চ‚ড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশিত হয়ে যায়, তবে উক্ত খতিয়ান সংশোধনের ক্ষমতা আর সেটেলমেন্ট অফিসারের থাকে না তখন এই খতিয়ান সংশোধন করতে হয় কোর্টে মামলা করে। তবে চ‚ড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশিত হয়ে গেলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটেলমেন্ট অফিসার রেকর্ড সংশোধন করতে পারে, যেমনÑ ওই ভুলগুলো যদি হয় শুধু করণিক/প্রিন্টিংয়ে ভুল, সেক্ষেত্রে এ ধরনের সামান্য ভুলগুলো অবশ্য সেটেলমেন্ট অফিসার সংশোধন করতে পারেন। খতিয়ান বা খসড়া খতিয়ানে কোনো ভুল-ত্রæটি থাকলে বা এ সম্পর্কে কারও কোনো আপত্তি বা দাবি থাকলে, প্রজাস্বত্ব বিধি ৩০ অনুযায়ী আপত্তি দাখিল করতে হবে।
এই আপত্তি দাখিল করতে হবে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে ৪০ টাকার কোর্ট ফি দিয়ে। অফিসার প্রয়োজন মনে করলে খতিয়ান ও নকশা সংশোধন, পরিবর্তন বা পূর্বাবস্থায় বহাল রাখার বিষয়ে রায় প্রদান করবেন এবং অবশ্যই রায় মোতাবেক রেকর্ড সংশোধন করবেন। আপত্তি কেসের রায়ে যদি কেউ অসন্তুষ্ট হয় তবে সেই প্রেক্ষিতে তিনি প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩১ বিধি অনুসারে রায় প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে ও নির্ধারিত ফি প্রদান করে সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট আপিল করতে পারেন। আপিল আবেদনের সঙ্গে আপত্তি কেসের রায়ের কপি দাখিল করতে হবে। সেটেলমেন্ট অফিসার বা তার মনোনীত অন্য কোনো আপিল অফিসার সংশ্লিষ্ট পক্ষগণকে নোটিস প্রদান করে শুনানির মাধ্যমে দ্রæত আপিল নিষ্পত্তি করবেন। সর্বশেষ আপিল রায় মোতাবেক খতিয়ান ও নকশা সংশোধন করা হয়।
খতিয়ান সংশোধন করতে যা দরকার : ওই জমিতে আপনার মালিকানার সব দলিলপত্র (যেমনÑ মূল দলিল, বায়া দলিল, পূর্বের খতিয়ানের কপি)। চ‚ড়ান্তভাবে প্রকাশিত ভুল রেকর্ডের কপি। নিজের আইডি কার্ডের ফটোকপি। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে এখতিয়ারধীন কোর্টে গিয়ে একজন দক্ষ সিভিল ল’ইয়ারকে ওই খতিয়ানটি সংশোধানের দায়িত্ব দিতে হবে। তিনি এক্ষেত্রে ভ‚মি জরিপ ট্রাইব্যুনালে কিংবা দেওয়ানি আদালতে রেকর্ড সংশোধনীর জন্য একটি ‘ঘোষণামূলক’ মোকদ্দমা করবেন। খতিয়ান সংশোধন না করলে জমির নামজারি করা যাবে না, আর মিউটেশন না করতে পারলে জমি বিক্রি করা যাবে না।
ষ বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী