আলো ঝলমলে বিদ্যুৎ খাত

সঞ্চিতা সীতু

সম্পাদকীয়

১৯৭১ সাল। সদ্য স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তখন ছিল মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। দেশের ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জের সঙ্গে কাপ্তাই

2021-03-06T22:13:00+00:00
2021-03-06T22:13:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
আলো ঝলমলে বিদ্যুৎ খাত
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশ: শনিবার, ৬ মার্চ, ২০২১, ১০:১৩ পিএম   (ভিজিট : ২৪০)
 ১৯৭১ সাল। সদ্য স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তখন ছিল মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। দেশের ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জের সঙ্গে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পই ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু ভরসার জায়গা। গ্রামের কথা তো বাদই দিলাম সব শহরেও ছিল না বিদ্যুৎ। আবার যে শহরে বিদ্যুৎ ছিল সেই শহরের সব জায়গাতেও বিদ্যুৎ ছিল না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং তো ছিলই। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে দেশ এখন ৫০-এ। সুবর্ণজয়ন্তী পালনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। লোডশেডিং নেই বললেই চলে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাইলফলক স্পর্শের অপেক্ষা এখন। বাংলাদেশ থেকে দুই যুগ আগে স্বাধীন হওয়ার পরও ভারত এবং পাকিস্তান শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দিতে পারেনি।
বিদ্যুতের ইতিহাস থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সরকার দেড় বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু তখন আমাদের দেশে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নজর দেয়নি। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার বঙ্গবন্ধু রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে দেশে নতুন করে বিদ্যুৎ খাত পুনর্গঠন করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগক্ষক্ষমতায় আসার পর আইপিপি নীতি গ্রহণ করা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রæত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বার্জ মাউন্টেন্ড বিদ্যুৎ নিয়ে আসেন। এ ছাড়া ক্যাপটিভ নীতি করে শিল্পে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। এরপর জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকারের সব উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০০৯ সালে আবার বিদ্যুৎ সঙ্কটের মধ্যে সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু গত ১১ বছরে সেই পরিস্থিতি সরকার বদলে দিয়েছে।
আগামী মার্চের মধ্যে দেশের শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ শেষ হবে। শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে দেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশা করা হচ্ছে। অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে বেরিয়ে আসায় গ্রামীণ জনপদে এর মধ্যেই অর্থনৈতিক চালচিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে।
দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা আরইবির আওতাধীন গ্রিডভুক্ত ৪৬১টি উপজেলা এবং অফগ্রিডে একটি উপজেলাসহ (পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা) মোট ১ হাজার ৫৯টি গ্রাম রয়েছে। আরইবি তার ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে গ্রিডভুক্ত ৪৬১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে ২৮৮টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্বোধন করেন এবং অবশিষ্ট ১৭৩টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া অফ গ্রিড এলাকার সব গ্রামে শতভাগ বিদ্যুতায়ন চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হবে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বলছে সারা দেশে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি অনেকটা সফলভাবেই করেছে তারা। এখন তাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত বিদ্যুতের সেবা পৌঁছে দেওয়া। সরকার প্রত্যেকটি গ্রামে-শহরের যে সেবা সম্প্রসারণ করতে চাইছে। সেই কাজ করতে হলে সবার আগে সেই গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে। আরইবি বলছে ইতোমধ্যে তারা ৮৪ হাজার ৮০০ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে গত ১১ বছরে। এই ১১ বছর বিভিন্ন খাতের অর্জনে বলা হচ্ছে এখন দেশে ১৪০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। নতুন নতুন আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের ৯৮ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎসুবিধা ভোগ করছে। দুর্গম চর কিংবা পাহাড়ি জনপদেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো। এতে করে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে। ঘটছে কৃষির সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র এবং কুটিরশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে মানুষ। যাতে করে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতের এই সম্প্রসারণে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটছে।
প্রমত্তা পদ্মার বুকে অর্ধশতাব্দী আগে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। চরগুলো ছিল অন্ধকারে। সেখানে এখন আলোর ঝলকানি দেখা যায়। গত বছর থেকেই এসব চরে সাবমেরিন ক্যাবলে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। গত ১ মার্চ ফরিদপুরের দুর্গম পদ্মার চরে অন্ধকার কাটিয়ে জ্বলছে বৈদ্যুতিক লাইট। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে নদীর অপর প্রান্তে থাকা ঘরে পৌঁছানো হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। এভাবে একের পর এক চরে আলো জ্বলছে। গত বছর জানুয়ারিতে স›দ্বীপে একইভাবে সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
বিদ্যুতের সম্প্রসারণের ফলে কৃষি এবং শিল্প ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। আগে
কৃষি সেচের জন্য ডিজেল নির্ভরতা থাকলেও এখন প্রায় প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়াতে উল্লেখযোগ্য হারে সেচ সংখ্যা বেড়েছে। হিসাব বলছে ২০০৯-এ যেখানে সারা দেশে সেচ সংযোগ ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার, সেখানে এখন সেচের গ্রাহক ১ লাখ ২৮ হাজার বেড়ে ৩ লাখ ৬২ হাজার। প্রবৃদ্ধি ৫৬ ভাগের ওপরে। এর বাইরে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ইডকল ৫০ হাজার সৌর সেচপাম্প স্থাপন করছে। এতে করে বিদ্যুতে পানি উঠলেও গ্রিডের বিদ্যুতের খরচ কম হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে সেচ ছাড়াও ক্ষুদ্র এবং বাণিজ্যে গ্রামীণ জনপদে ১৯ লাখ ৫১ হাজার ১১৩টি সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্পে সংযোগ সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৪টি। অর্থাৎ গ্রামের মানুষ এখন আর শুধু চাকরির আশায় বসে থাকছে না, তারা কোনো না কোনোভাবে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
সারা দেশে এখন ৩ কোটি ৮৪ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। গত ১০ বছরে মাথাপিছু বিদ্যুতের উৎপাদন ২২০ কিলোওয়াট থেকে বেড়ে হয়েছে ৫১২ কিলোওয়াট। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯২ কিলোওয়াট।

ষ সাংবাদিক

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: