
বাবার
প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়াকে সবচেয়ে নিরাপদ ও সবশেষ
আশ্রয়স্থল মনে করতেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক।
পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। জামিয়া
রাহমানিয়া আরাবিয়া হচ্ছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কওমি মাদ্রাসা। কওমি
মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম নানা কারণে এটিকে তাদের ‘সেকেন্ড
হোম’ মনে করে।
মোহাম্মদপুরের রাহমানিয়া মাদ্রাসার একাধিক ছাত্র ও
দায়িত্বশীলরা সময়ের আলোকে জানায়, মূলত বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘রিসোর্ট
কাণ্ডে’র পর থেকেই রাহমানিয়া মাদ্রাসায় রাত-দিন অবস্থান করতেন আল্লামা
মামুনুল হক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজদারির পর সেখানেই তিনি আশ্রয় নেন।
হেফাজতের শীর্ষ মুরব্বিরা মামুনুলকে আপাতত এই মাদ্রাসায় থাকতে নির্দেশ দেন
এবং বাইরে যাতায়াত বিরত রাখতে বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,
করোনাভাইরাসে লকডাউনের পর থেকে ঘোষণা দিয়ে বন্ধ ছিল জামিয়া রাহমানিয়া
মাদ্রাসা। তবে বন্ধ থাকলেও যেকোনো সময় মাদ্রাসা ‘পাহারার’ জন্য ৪০-৫০ ছাত্র
মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান করে। বিভিন্ন কাজে তারা সেখানে থাকে। আল্লামা
মামুনুল হকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক দুয়েকজন খাদেম, একজন ব্যক্তিগত সহকারী ও
তার গাড়ির ড্রাইভার মাহমুদুল হক মেরাজ থাকতেন। সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও একান্ত ভক্ত
কিছু ছাত্র থাকত হেফাজতের বিতর্কিত এই শীর্ষ নেতার আশপাশে। সে সঙ্গে
মামুনুলের ভাগ্নে ও হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরীর সহপ্রচার সম্পাদক মাওলানা
এহসানুল হকও সঙ্গে থাকতেন।
মামুনুল হককে আটকের সময় সামনে ছিলেন
রাহমানিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম বা অধ্যক্ষের অফিস সহকারী মাহফুজ হাবিব।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে থাকতেন মামুনুল
হক। হঠাৎ দুপুর ১টার দিকে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মামুনুল হকের কক্ষে
যান। সেখানে কতক্ষণ কথা বলেন তার সঙ্গে। এরপর বেরিয়ে সোজা গাড়িতে উঠিয়ে
নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, মামুনুল হক তাদের সঙ্গে শেষমুহূর্তে কোনো কথা
বলতে পারেননি। তবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের সঙ্গে গাড়িতে ওঠেন।
জামিয়া
রাহমানিয়া আরাবিয়া বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য কওমি মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি
১৯৮৬ সালে মামুনুল হকের বাবা শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ঢাকার
মোহাম্মদপুরে প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লামা আজিজুল হক হচ্ছেন প্রখ্যাত ইসলামী
স্কলার এবং বাংলা ভাষার সহিহ বুখারির প্রথম অনুবাদক। সবশেষ তথ্য অনুসারে,
মাদ্রাসাটিতে প্রায় ১৫০০ ছাত্র এবং প্রায় ৭০ জন শিক্ষক রয়েছেন। এই
মাদ্রাসার পরীক্ষাগুলো হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন
জায়গা থেকে এখানে ছাত্ররা পড়তে আসে। জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসায় মক্তব ও
হিফজ থেকে শুরু করে কওমির সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত
কার্যক্রম চালু আছে। পাশাপাশি বিশেষ কিছু শাখা যেমনÑ মুফতি ডিগ্রি অর্জনের
জন্য ইফতি বা ফতোয়া বিভাগ ও মুফাসসিরদের জন্য তাফসির বিভাগ চালু রয়েছে।
এখানে এতিম ও নিম্নবিত্তের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। আর অর্থ আসে সমাজের
বিত্তবান শ্রেণির দান থেকে।
মাদ্রাসার কয়েকজন সাবেক ছাত্র যারা
বর্তমানে হেফাজতের কর্মী এবং বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেহেতু
সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা আল্লামা মাহফুজুল হক ও মামুনুল হক এই মাদ্রাসার
শিক্ষক তাই অনানুষ্ঠানিকভাবে হেফাজতের অনেক প্রাথমিক মিটিং হয় জামিয়া
রাহমানিয়ায়। মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিসের দায়িত্বে থাকা আল্লামা মামুনুল
হক সেখানে দাওরাতে হাদিসের ক্লাস নেন। আর তারই বড়ভাই মাহফুজুল হক মাদ্রাসার
প্রিন্সিপাল। তিনি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া
বাংলাদেশের মহাসচিবও।
এদিকে হেফাজতের সাংগঠনিক কার্যক্রম ঘিরে
মাঝেমধ্যে কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর নেতারা মাদ্রাসার তিনতলায় মিলিত হতেন।
রিসোর্ট কাণ্ডের পর এই মাদ্রাসায় একাধিক মিটিং হয়েছে। রোববার মামুনুল হককে
আটকের পর বাদ জোহর সেখানে জরুরি বৈঠক হয়। মামুনুল হকের সঙ্গে থাকা একজন
জানান, রিসোর্ট কাণ্ডের পর দুদিন মাদ্রাসার বাইরের কর্মসূচিতে যান মামুনুল
হক। এরপর আর মাদ্রাসা থেকে বের হননি। মাদ্রাসায় অবস্থান করেই সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। মাদ্রাসার পাশেই তার বাসা হওয়ায়
একদিন বাসায় ছিলেন মামুনুল হক। কিন্তু গভীর রাতে কে বা কারা তার বাসায়
আক্রমণ করে। এরপর তিনি আর বাসায় যাননি। পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে রেখে
মাদ্রাসায় চলে আসেন। মাদ্রাসার ঠিক পাশেই সাতগম্বুজ মসজিদ রয়েছে। সেখানে
ছাত্ররা নামাজ পড়লেও মামুনুল হক বিরত থাকতেন। মাদ্রাসার ভেতরেই নামাজ ও
তারাবি পড়তেন তিনি।