
সারা দেশের আদালতগুলোতে ৩৮ লাখের মতো মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ উচ্চ আদালতে বিচারাধীন ‘রিট’ মামলা। বছরের পর বছর ঝুলে আছে এসব রিট। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলার অধিকাংশ রায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ ও উদাসীনতায়।
চলতি বছরের ১৮ মে পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ১১ হাজার ২০৭টি রিট করা হয়েছে। এর মধ্যে রুল জারি হয়েছে ৪ হাজার ৬০৯টির। ২০২০ সালে রিট হয়েছে ৩৬ হাজারের কিছু বেশি এবং এসব রিটের মধ্যে রুল জারি হয়েছে ১৬ হাজার ৩০৬টিতে। এ ছাড়া ২০১৯ সালে প্রায় ৪০ হাজার রিটের বিপরীতে রুল জারি হয়েছে ২৬ হাজারটিতে। অর্থাৎ এফিডেভিট হওয়া রিটের একটি বিরাট অংশ হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যায়। যেসব রিটে রুল জারি হয় সেগুলোর বেশিরভাগেরই শেষ পরিণতি কনটেম্পটে বা আদালত অবমাননায় গিয়ে দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। তারা জানান, রুল নিষ্পত্তি হলেও হাইকোর্টের সেই আদেশ বা রায় মানা হয় না।
কোনো কোনো আইনজীবী মনে করেন, অনেক রিটে রুল জারি না হওয়ার একটি অন্যতম কারণ রিট করার পেছনে রিটকারীর প্রচার-পরিচিতি পাওয়ার বিষয় জড়িত থাকা। এমন বেশ কয়েকজন আইনজীবী রয়েছেন যাদের অপ্রাসঙ্গিক রিট করার কারণে জরিমানা গুনতে হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও রায় না মানার প্রবণতার পাশাপাশি বাদীপক্ষের তৎপরতার অভাবে রায় ও নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না বলেও জানান একাধিক আইনজীবী। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় যথাযথভাবে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তা না হওয়া দুঃখজনকÑ বলেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। গত ১০ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা কনটেম্পট (আদালত অবমাননার রুল জারি) করে হয়রান। কনটেম্পট করেও পুরোপুরি রায় কার্যকর যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। এটা এখন দুঃখের বিষয়।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘রায় কার্যকরে রুল দিতে দিতে আমরা হয়রান। এর জন্য কেন বারবার রুল জারি করতে হবে? আশা করি, নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রত্যেকটি রায় বাস্তবায়িত হবে।’
বেতন-ভাতায় বৈষম্যের প্রতিকার চেয়ে ২০১৮ সালে রাশেদুল ইসলামসহ কয়েকজন বিসিএস কর্মকর্তা আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে রিট করেন। পরে আদালত রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারি করে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে সেটি নিষ্পত্তি করে দেন। কিন্তু রায় প্রকাশের তিন বছর পেরিয়ে গলেও মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানিয়েছেন রিটকারী।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বেতনের উচ্চতর ধাপে যেতে না পেরে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন ১ হাজার ১৩ জন চিকিৎসক। আদালত রায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে তাদের সে সুযোগ-সুবিধা দিতে বলেন। মন্ত্রণালয় পরে আপিল করলেও তা টেকেনি, কিন্তু চিকিৎসকদের ফাইলটিও নড়েনি।
ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (আইএনএসটি) বেশ কয়েকজন চিকিৎসক রিট করেছিলেন তাদের নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতির বিষয়ে। এই রিটে হাইকোর্ট চিকিৎসকদের পক্ষে রায় দেন, যা পরে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে। কিন্তু পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেই আদেশ তোয়াক্কা না করায় তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়। এই মামলায় আপিল বিভাগ বেশ কয়েকবার আদেশ দিলেও কাজ হয়নি। এখনও মামলাটি চলমান।
এদিকে ঢাকার পাশর্^বর্তী বিপন্ন চার নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা রক্ষায় সীমানা চিহ্নিত করে পিলার স্থাপন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদী খনন ও পলি অপসারণ এবং নদীর তীরে গাছ লাগানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ২০০৯ সালে ওই রায়ের পর পেরিয়ে গেছে এক যুগ। এতদিনেও রায় পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক বছর আগে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাথ দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কিন্তু ২০১২ সালের এই রায় এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
শব্দ দূষণরোধে করা এক রিটের রায় সারা দেশে গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট; কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। যানজট ও ধুলাবালির এই ঢাকা শহরে গৃহস্থালির বর্জ্য অপসারণ ও পরিবহনের সময় পথচারীরা দুর্ভোগে পড়ে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৮ নির্দেশনা দেন। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন তা এখনও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ ব্যাপারে সময়ের আলোকে জানান, ‘সরকার ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং আন্তরিকতার অভাবে জনস্বার্থবিষয়ক ও সাধারণ রিট মামলার রায় ও নির্দেশনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয় না।’ আবার যারা মামলা করেন তাদের দায়িত্ব হলো রায় বাস্তবায়নের জন্য তৎপর থাকা। দুদিক থেকেই অনাগ্রহের কারণে অধিকাংশ রিটের রায় বা আদেশ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।’
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক বলেন, ‘অধিকাংশ রিটের রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়কে তোয়াক্কা করেন না অনেক কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান। একবার সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাকে বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্ট তো কত কিছুই বলেন। এসব মানার সময় নেই!’ মাহবুব শফিক বলেন, ‘এ কথা শোনার পর আইনজীবী হিসেবেই নিজেকে ছোট মনে হয়। কত বড় ঔদ্ধত্য থাকলে প্রধান বিচারপতিকে নিয়েও সরকারের এক কর্মকর্তা তাচ্ছিল্য করতে পারেন।’
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ‘শুধু রিট নয়। সুপ্রিমকোর্টের (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) যেকোনো রায় ও আদেশ পালনে সবাই বাধ্য। এটা সংবিধানেই আছে।’ রিটের রায় অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘যারা সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ পালন করবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। রিটের রায় বা আদেশ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘অনেক রিট মামলার রায় ও নির্দেশ উপেক্ষিত থাকছে। বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটা আদালত অবমাননার শামিল। এ ধরনের কাজ যারা করেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’