
মহামারি করোনার মধ্যেও খাদ্যে ভেজাল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা মানুষের প্রতিদিনকার বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপকরণ মেশাচ্ছে। এসব পণ্য কয়েক হাত ঘুরে আসে ভোক্তার হাতে। এগুলো খেয়ে মানুষ আক্রান্ত হয় নানা রকম জটিল ও কঠিন রোগে। ভেজাল খাদ্য খেয়ে রোগে ভুগে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু হয় অনেকের।
দেখা গেছে, বাজারের কোনো পণ্যে ৬৬ শতাংশ, কোনোটিতে ৪৩ শতাংশ, আবার কোনোটিতে ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ ভেজাল। দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চালেও ভেজাল মিলেছে প্রায় ৯ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভেজালের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে মিষ্টিজাতীয় পণ্য। যেমন চমচম, রসগোল্লা, কালোজাম, দই, ঘি, গুড় ও মধু। আবার তিনবেলা যেসব খাদ্য খায় মানুষ তার অনেক উপকরণও ভেজাল। যেমন- চাল, ডাল, আটা, লবণ, সয়াবিন তেল, হলুদ ও মরিচ। এমনকি শিশুখাদ্যও রেহাই পায় না ভেজালকারীদের হাত থেকে। শিশুখাদ্য গুঁড়া দুধেও মেশানো হয় নানা রকম বিষাক্ত কেমিক্যাল।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিবছর সারা দেশের বাজার কিংবা দোকান থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে। সম্প্রতি গত বছরের পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি, যা সময়ের আলোর হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, বাজারের কোনো পণ্যের ৬৬ ভাগই ভেজাল। কোনোটির ৪৫ ভাগ, কোনোটির ৪০ ভাগ, আবার কোনোটির ১০ ভাগ ভেজাল।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সারা দেশে থেকে সংগ্রহ করে শতাধিক প্রকারের পণ্যের ১ হাজার ৫৮টি নমুনা পরীক্ষা করে। এসব পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ভেজাল রয়েছে ঘিতে। শুধু তাই নয়, আগের বছরের চেয়ে ঘিতে ভেজাল এবার আরও বেড়েছে। এবার ঘিতে ভেজাল মিলেছে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আগের বছর ঘিতে ভেজালের হার ছিল ৫১ দশমিক ৭২ শতাংশ।
ভেজালের দিক দিয়ে এর পরেই আছে আরেক নিত্যপণ্য গুড়। এই পণ্যে ভেজালের হার ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এরপরই রয়েছে মধু। পণ্যটি সবার কাছেই খুব প্রিয়। কারণ এতে অনেক রোগ-ব্যাধি সারে। কিন্তু বাজার থেকে যেসব মধু কিনে আনছেন ক্রেতারা, তাতে রোগ সারবে না, উল্টো ক্রেতাকে আরও রোগী বানাবে। কারণ বাজারের মধুর ৩৩ দশমিক ৩৩ ভাগই ভেজাল। সুতরাং মধু কেনার আগে ভেবেচিন্তে কেনাই ভালো।
এর পর যে পণ্যটি রয়েছে সেটি হয়তো প্রতি পরিবারে প্রতিদিনই একবার খাওয়া হয়। তাছাড়া বাসাবাড়িতে মেহমান এলে পিরিচ কিংবা প্লেটে এই পণ্য থাকবেই। বলা হচ্ছে মিষ্টির কথা। মিষ্টির দোকানগুলোতে কাচের সেলফে যতই সুন্দর করে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হোক না কেন, এসব মিষ্টি খেয়েই হয়তো কারও কিডনি নষ্ট হচ্ছে, কারও লিভার নষ্ট হচ্ছে। কারণ বাজারের ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ মিষ্টিতেই ভেজাল মিলেছে। হোক সেটি রসগোল্লা, চমচম কিংবা কালোজাম। এগুলো খেতে যতই রসালো হোক না কেন, আসলে রসের সঙ্গে পেটে যাচ্ছে টেক্সটাইলের বিষাক্ত রঙ কিংবা নোংরা পানির জীবাণু।
ভেজালের দৌড়ে এরপরই রয়েছে আরেক নিত্যপণ্য হলুদ। হলুদে ভেজাল মিলেছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। লবণ ছাড়া কোনো তরকারিই রান্না করা যায় না। অথচ লবণেও ভেজাল মিলছে ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। শিশুখাদ্য গুঁড়া দুধে রয়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ এবং মরিচে রয়েছে ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ ছাড়া ধনিয়ায় আছে ৩ দশমিক ৪৫, সয়াবিন তেলে আছে ২ এবং সরিষার তেলে ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
চাল, ডাল, আটাতেও ভেজালদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল। এই মহামারিকালে চালে ভেজালের হার আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাব পরীক্ষার প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের বছরের পরীক্ষায় চাল, আটা ও ময়দার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে ক্ষতিকর কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি। তবে এবারের প্রতিবেদন তথ্য বলছে, এসব পণ্যেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এবারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চালে ভেজাল মিলেছে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ডাল ও ছোলায় ভেজাল মিলেছে ৫ শতাংশ, আটা-গম-ভুট্টায় ভেজাল মিলেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
ক্ষতিকারক কী কী উপাদান মেশানো হয়খাদ্যপণ্যে অনেক রকম বিষাক্ত উপাদান মেশানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল কেমিক্যাল ও টেক্সটাইল রঙ। এ ছাড়া ইউরিয়া, হাইড্রোজ, কার্বাইড, ফরমালিন ও প্যারাথিয়ন মেশানো হয় বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। বেকারি কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখতে ফ্যাটি অ্যাসিড, টেক্সটাইল রঙ। তাছাড়া এসব পণ্যে নিম্নমানের আটা, পচা ডালডা, তেল ও ডিমের ব্যবহার করা হয়।
মসলায় মেশানো হয় কাপড়ের বিষাক্ত রঙ, দুর্গন্ধযুক্ত পটকা মরিচের গুঁড়া, ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও নিম্নমানের সুজি। দীর্ঘ সময় সতেজ রাখার জন্য দুধে মেশানো হয় ফরমালিন। তাছাড়া পানি গরম করে তাতে অ্যারারুট মিশিয়ে তৈরি করা হয় নকল দুধ। শুধু তাই নয়, নকল দুধ তৈরিতে ছানার ফেলনা পানি, ময়লাযুক্ত পানি, থাইসোডা, পার-অক্সাইড, ময়দা ভাতের মাড় ও চিনি মেশানো হয়।
মানব শরীরের কী কী ক্ষতি হতে পারেবিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেক্সটাইল রঙ ও কেমিক্যাল খাদ্য বা পানীয়ের সঙ্গে মিশে মানব শরীরে প্রবেশের পর এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই যার ক্ষতি করে না। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর আ ব ম ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে লিভার, কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও অস্থিমজ্জার। এসব অঙ্গ শিশু ও বৃদ্ধদের নষ্ট হয় দ্রুত। তরুণদের নষ্ট হয় কিছুটা দেরিতে। খাদ্যে ভেজালের কারণে শরীরে বিভিন্ন রকমের ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেলিউর ও হাঁপানি বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, কেমিক্যাল মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের কারণে শরীরে বেশ কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে আছে- পেটব্যথা, বমি হওয়া, মাথা ঘোরা, পাতলা পায়খানা হওয়া, বদহজম হওয়া, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং হঠাৎ করে পালস রেট কম-বেশি হওয়া।
বছরে ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, কেবলমাত্র ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ৫০ হাজার জন। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় ২ লাখের ওপর মানুষ। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ভাষ্যজাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম সময়ের আলোকে বলেন, বিভিন্ন মেটাল বেইজড ভেজাল খাদ্যে কিডনি স্বল্পমাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিকল হতে পারে। আমাদের দেশে কিডনি রোগী বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ এই ভেজাল খাদ্য। বিশেষ করে শিশু কিডনি রোগী বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ভেজাল খাদ্য। তাছাড়া ভেজাল খাদ্য গ্রহণের জন্য মানুষ আরও যেসব জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তার মধ্যে আছে- অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথা ব্যথা, অরুচি, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, লিভার সিরোসিসসহ অনেক জটিল রোগ।
তিনি আরও বলেন, খাদ্যে ভেজাল যারা মেশান তাদের পরিবারের লোকজনও কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হন নানা রকম রোগে। তাই এ বিষয়ে তাদের সচেতন হওয়া দরকার এবং খাদ্যে বিষাক্ত উপকরণ মেশানো থেকে বিরত থাকা উচিত। সেসঙ্গে সরকারকে বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই খাদ্যে ভেজালের কারণে শরীরে বিভিন্ন জটিল ব্যাধি নিয়ে বেড়ে উঠছে এবং অনেকেই অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
/জেডও/