এই অচলায়তন ভাঙবে কে?

শাহনেওয়াজ

রাজধানী

মালিবাগ থেকে বাংলামোটরে সহজে কোনো রিকশা আসতে চায় না। কারণ বাংলামোটর আসতে রিকশাওয়ালাকে দুটো বড় সিগন্যাল পার হতে হয়। এতে

2022-04-07T14:22:29+00:00
2022-04-07T14:22:29+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
রাজধানী
এই অচলায়তন ভাঙবে কে?
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০২২, ২:২২ পিএম 
মালিবাগ থেকে বাংলামোটরে সহজে কোনো রিকশা আসতে চায় না। কারণ বাংলামোটর আসতে রিকশাওয়ালাকে দুটো বড় সিগন্যাল পার হতে হয়। এতে সময় চলে যায় ১ ঘণ্টা। একই অবস্থা হয় ফকিরাপুল মোড় থেকে শাহজাহানপুর মোড় কিংবা মতিঝিল পীরজঙ্গি মাজার থেকে মালিবাগ। ফকিরাপুল থেকে কাকরাইল মোড় আসতেও একই অবস্থার শিকার হতে হয়। মালিবাগ থেকে কাকরাইল কিংবা মালিবাগ থেকে মৌচাকের পথ অল্প হলেও, সময় নেয় আধা ঘণ্টার বেশি। আজিমপুর থেকে নিউমার্কেটের পথ যেন যোজন যোজন দূর। আবার তেজগাঁও লিঙ্ক রোড থেকে বিজয়সরণি কিংবা বিজয়সরণি থেকে ফার্মগেট; অল্প দূরত্বের পথ যেন শেষ হতে চায় না। ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর আসতেও একই অবস্থা।

ঢাকার মতো বিদেশে এত রাস্তার মোড় নেই। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে ৫০টির বেশি রাস্তার মোড় রয়েছে। গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, টিঅ্যান্ডটি কলোনি, শহীদবাগ, মালিবাগ, শান্তিনগর, শাপলা চত্বর, কাঁটাবন, সার্কুলার রোড, মগবাজার, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, মিরপুর, কাকরাইল মোড়সহ আরও বেশকিছু ইন্টারসেকশনে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গাড়ি একসঙ্গে চলে আসছে, যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। 
দ্রুত চলাচলের জন্য ঢাকার বুকে তৈরি হয়েছে ফ্লাইওভার। খিলগাঁওয়ের ফ্লাইওভারে গাড়ি চলাচলের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শান্তিনগর থেকে বাংলামোটর ফ্লাইওভারে যে পরিমাণ গাড়ি চলাচল হওয়ার কথা, তা হয় না। বাস তো মোটেই ফ্লাইওভারের রাস্তা মাড়ায় না। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, মৌচাক, শান্তিনগর, মগবাজারে কোনো ধরনের বাসস্ট্যান্ড না থাকা। এ ফ্লাইওভার তৈরিতে ত্রুটি রয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন নগর পরিকল্পনাবিদ। ফ্লাইওভারটি যদি বাংলামোটর পর্যন্ত এসে দুদিকে যাওয়ার জন্য দুটো উইং করে দেওয়া হতো তা হলে দীর্ঘ জট লেগে থাকত না।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীর সড়কগুলোতে এখন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ যানবাহন চলছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা দ্বিগুণে উঠে যাচ্ছে। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এক সহায়তা প্রকল্পের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পিক আওয়ারে ঢাকার প্রায় সব সড়কে যানবাহন চলছে সক্ষমতার ২০ শতাংশ বেশি। ফ্লাইওভার, ওভারপাসের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যানজট কমছে না; বরং দিন দিন যানবাহনের গড় গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কমে যাচ্ছে। 
কোটি মানুষের মেগাসিটি ঢাকায় জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন। এখন প্রতিদিন গড়ে ৫৫টি নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামছে। ঢাকায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ যাত্রী ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশা ব্যবহার করছে। অথচ এই যানবাহন বিদ্যমান সড়কের ৬৫ শতাংশ দখল করে রাখে। ৬০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করলেও গণপরিবহনের দখলে আছে মাত্র ১০ শতাংশ সড়ক। 

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কের কম করে হলেও ৩০ ভাগের বেশি দখল করেছে অবৈধ পার্কিং ও নানা ধরনের দখলদার। ক্রেতাদের সমাগম রাস্তা ও ফুটপাথের প্রশস্ততা কমিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন ঢাকার আশপাশ থেকে ৫ লাখ মানুষ রাজধানীতে আসা-যাওয়া করে। ৮৭ শতাংশ বাস, মিনিবাস ট্রাফিক আইন মানে না। 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যানজট নিরসনের কৌশল হিসেবে প্রথমে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে নৌপথ, কমিউটার ট্রেন রয়েছে। কিন্তু এই গণপরিবহনকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা গেলাম ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলে। এখন শুনছি পাতাল ট্রেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে গণপরিবহন। পথচারীবান্ধব ফুটপাথও নেই ঢাকা শহরে। এমনকি নৌপথ এখনও রয়ে গেছে অবহেলিত। নৌপথ যে গুরুত্বপূর্ণ তা হাতিরঝিল দেখলেই বোঝা যায়। 

সম্প্রতি উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম জোড়-বিজোড় নম্বরের গাড়ি বের করার কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে নানাজনের নানামত রয়েছে। ইকবাল হাবিব বলেছেন, কোনো কোনো দেশে এ নিয়ম চালু করা হলেও, তা কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে তা দেখার বিষয়। 

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে ফিলিপাইনে, ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায়, ২০১৫ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এ পদ্ধতি চালু করেন। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্কুলে যে পরিমাণ প্রাইভেট কার চলাচল করে তা অন্যদের তুলনায় কম। কেবল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোডের শাখায় প্রায় ২০ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি শিক্ষার্থীদের নামায়। রাজধানীর যানজট নিরসনে স্কুলশিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য ২০০৯ সালের ৯ আগস্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১১ সালের ১৫ জানুয়ারি ১৪টি বিআরটিসির বাস সার্ভিস চালু করা হয়। অবশ্য কয়েকদিন পর এই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। এই বাস উদ্বোধন করেন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। এ ব্যাপারে তিনি সময়ের আলোর প্রতিনিধিকে বলেন, মনে পড়ে আমি সেই বাস উদ্বোধন করি; কিন্তু সেই বাসগুলো গেল কোথায়? 

ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আমাদের ত্রুটির কোনো শেষ নেই। প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা নিয়ে কাজ করেও যানজট কমাতে পারছি না। হাতের ইশারায় কত আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়? 

ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে সনাতন পদ্ধতি যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন পুরোপুরি যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। ২০১৬ সালে রাজধানীর চারটি ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়; কিন্তু তা সফলভাবে কার্যকর হয়নি। তা হলে এই অচলায়তন ভাঙার উপায় কী? 

অনেকে বলছেন, সরকারের অফিসগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করা, যাতে মানুষকে ঢাকায় আসতে না হয়। আর পরিবহনকে আরও গণমুখী করা। এক্ষেত্রে রেল, নৌ ও সড়কপথকে আরও বিস্তৃত কাজে লাগানো, যেন ব্যক্তিগত গাড়ির প্রাধান্য কমে আসে। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিকায়ন করা। স্কুল ও সরকারি অফিস সময়সীমায় পরিবর্তন আনা। যেন একসঙ্গে সবাইকে ঘর থেকে বের হতে না হয়। অবৈধ রিকশার দৌরাত্ম্য কমানো, ফুটপাথ মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি।

নাগালের বাইরে যাচ্ছে বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানগুলো। 

/এমএইচ/


Loading...
Loading...
রাজধানী- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: