জীবের জন্মগ্রহণ মানেই সুনিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া। জীবনের পথ-পরিক্রমার অর্থও তা-ইৃ। মৃত্যুর চেয়ে বড় এবং কঠিন সত্য আর নেই! কার নেই মৃত্যুচিন্তা? অমোঘ এই সত্যকে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কাব্যরূপায়ণ করেছেন এভাবে : ‘মৃত্যু শুধু মৃত্যুই ধ্রুবসখা,/ যাতনা শুধুই যাতনা শুধুই যাতনা রুচির সাথী।’ মানুষ চিন্তাশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী বলেই বিশেষত জীবনচক্রের শেষ ধাপে সে মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত হয়- কোনো ইতর প্রাণীর তা নেই। রবীন্দ্রনাথও মানুষ ছিলেন এবং পরম উন্নত চেতনায় ঋদ্ধ মানুষ ছিলেন বলেই মৃত্যুচিন্তা তাঁর মধ্যেও প্রবল ছিল। যদিও তিনি ছিলেন পরিশুদ্ধ জীবনবাদী ও বৃক্ষের মতো প্রাণরসগ্রাহী তবু তাঁর মধ্যে গোপন ফল্গুধারার মতো মৃত্যুচিন্তা প্রবাহিত ছিল কবিজীবনের প্রারম্ভ থেকেই। রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি থেকে তাঁর মৃত্যু ভাবনা আঁচ করা যায়- যখন তিনি বলেন : ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান।’
মৃত্যু এমন এক নিষ্ঠুরতম সত্য, যা কেউ এড়াতে পারে না! তাই মানুষ মাত্রই মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত, সন্ন্যাসী থেকে বিজ্ঞানী পর্যন্ত। প্রাচীনকাল থেকে মৃত্যুচিন্তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর দর্শন। এই দর্শন পরবর্তী সময়ে পল্লবিত কাব্যে, সাহিত্যে, ধর্মে, সমাজের সর্বস্তরে, এমনকি বিজ্ঞানেও। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তায় কৈশোর থেকে প্রভাব বিস্তার করেছে তাঁর নিকটাত্মীয় ও প্রিয়জনের মৃত্যু। কৈশোরে তিনি মাকে হারান তারপর বাবাকে। যে ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতার পরম উৎস, জ্যোতিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী এবং কবির প্রিয়তম বৌদি কাদম্বরী দেবী, সে-ও অপমৃত্যু বরণ করে কবির যৌবনে। জীবনের চারটি দশক না-পেরোতেই তাঁর পত্নীরও মৃত্যু হয়। বাবা হিসেবে চার সন্তানের মৃত্যুর আঘাতও তাঁকে সইতে হয় জীবৎকালে। তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন কন্যা মীরা, বেলা, রাণী ও কনিষ্ঠ পুত্র শমীর মৃত্যু হয়। এসব অকালমৃত্যু তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয়। তা ছাড়া ঘনিষ্ঠ কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরও প্রিয়জনের মৃত্যুশোক কবিকে সইতে হয়েছে। এসব মৃত্যুর দুঃখবোধ তাঁর কবিচেতনাকে পল্লবিত করেছে দার্শনিকতায়। রক্তাক্ত ও বেদনা সিক্ত হয়েছে তাঁর হৃদয়, লেখনী ও রচনা। মৃত্যুর বেদনা থেকে বিকশিত এই দার্শনিক বোধ কবির কবিতা-গান, প্রবন্ধ, জীবনস্মৃতি এবং চিঠিপত্রে রূপলাভ করেছে। মৃত্যুকে তিনি কেবল দুঃখের মহাসাগর হিসেবে চিহ্নিত করেননি- এর নির্যাস থেকে জীবনবোধের পরম সত্য উপলব্ধি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-সম্পর্কিত দর্শন কোনোভাবেই তাঁর জীবনদেবতার জীবনবাদী দর্শনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর মৃত্যু-সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা এতই গভীর যে তা থেকে আমরা মৃত্যুর ভীতি, বিষণ্নতা, বেদনা ও হতাশায় আত্মবিনাশী না হয়ে বরং জীবনকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে ও ভালোবাসতে শিখি। রবীন্দ্রসাহিত্য-দর্শন আমাদের সমকালীনতা থেকে চিরকালীনতায়, বিশেষ থেকে নির্বিশেষে, সীমা থেকে অসীমে, ভূমি থেকে ভূমায় নিয়ে যায়। তেমনই তাঁর মৃত্যু-সম্পর্কিত দর্শনও আমাদের বোধের গভীরে নিয়ে দুঃখজয়ের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। মোটাদাগে কবির ‘মৃত্যু’, ‘মৃত্যুর পর ‘মৃত্যুঞ্জয়’, ‘জন্ম ও মরণ’ এবং ‘শেষ লেখা’ কাব্যের কবিতায় দার্শনিক আবহে মৃত্যুচিন্তা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তিনি মৃত্যুকে শিশুর এক মাতৃস্তন থেকে অন্য মাতৃস্তনে স্থানান্তরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্থানান্তরের মধ্যবর্তী বিরামটুকু কেবল বেদনার। মৃত্যুর মতো মহাসত্যের সামনে দাঁড়িয়ে কবি নিত্য থেকে অনিত্য ও বন্ধন থেকে মুক্তির ভাবনায় উদ্বেল হয়েছেন। তাই ‘মরণের পরে’ কবিতায় লিখেছেন : ‘সব তর্ক হোক শেষ-/ সব রাগ সব দ্বেষ,/ সকল বালাই/ বলো শান্তি, বলো শান্তি,/ দেহ-সাথে সব ক্লান্তি/ পুড়ে হোক ছাই।’
অজ্ঞাত মৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে কখনও ভীতসন্ত্রস্ত ও বিভ্রান্ত করেছে, ভয়ে বুক কেঁপে উঠেছে, চোখে এসেছে জল, বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়েছে মন। সর্বশক্তি দিয়ে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু অমোঘ মৃত্যুর হাত থেকে কাপুরুষের মতো পালিয়ে বাঁচতে চাননি। তাই মৃত্যুর সহজ সত্যকে কবি গ্রহণ করেছেন বন্ধুর মতো- আলিঙ্গন করেছেন সখারূপে। মৃত্যু যেন তাঁর ধ্রুবসখা- বৈষ্ণব দর্শনের সেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন তত্ত্বের মতো। তাই শঙ্কাকে উপেক্ষা করে, ভয়কে জয় করে কবি চিরসখারূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। তাই অকুণ্ঠ চিত্তে বলেছেন : ‘ভেঙে গেল ভয়/ যখন উদ্যত ছিল তোমার অশনি/ তোমারে আমার চেয়ে বড় বলে নিয়েছিনু গণি/ ‘আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়’/ এই কথা বলে/ যাব আমি চলে।’ মৃত্যু-সম্পর্কিত দর্শনে এখানেই রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব যে, মৃত্যুকে মেনে নিয়েও অহংবোধে আত্মশক্তিকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেছেন। তাই তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব : ‘এ বিশ্বরে ভালোবাসিয়াছি/ এ ভালোবাসাই সত্য,/ এ জন্মের দান।/ বিদায় নেবার কালে/ এ সত্য অমøান হয়ে/ মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার।’ এটাই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তার দর্শন, জীবনবাদিতা এবং বিশ্বকবি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব। তারপরও বলেছেন, ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’।
/জেডও