আমাদের ছয় ঋতুর প্রতিটিরই রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ আর শরৎকে বলা হয় ঋতুর রানি। তাহলে গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত এদের মধ্যে কি ভালো লাগার কিছু নেই? অবশ্যই আছে। আসলে এই ছয় ঋতুর মধ্যে কে যে কার চেয়ে সুন্দর, কে যে কার চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এককথায় তা বলা মুশকিল। তাই যাদের বর্ষা পছন্দ, তারা নিশ্চয় বলবে না যে অন্য ঋতুগুলো তাদের পছন্দ না। অথবা যাদের শীতকাল পছন্দ তারাও বলতে পারবে না যে অন্য ঋতুগুলো তাদের একদম ভালো লাগে না। আসলে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের কারণে সবকটি ঋতুই সেরা। হবে না-ই বা কেন, আমাদের দেশটা যে সবসময়ের জন্য, সারা বছরের জন্যই সুন্দর।
কিন্তু শরৎ ঋতুর রানি হলো কেন?
শরতে আমাদের দেশে প্রচণ্ড গরম যেমন থাকে না, তেমনি শীতও থাকে না। বৃষ্টিও থাকে না বললেই চলে। সব দিক দিয়ে মাঝামাঝি আবহাওয়ার ঋতু আসলেই খুঁজে পাওয়া কঠিন। এর ওপর শরতে সাদা সাদা মেঘের ভেলা যেমন উড়ে বেড়ায় আকাশে, এমন দৃশ্য আর কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে প্রকৃতিতে এই ঋতুতে নানা রঙের, নানা বর্ণের ফুল ফোটে। কাশফুল মানেই যে শরৎ, এ তো সবার জানা। এ ছাড়া শরতে শাপলা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, গগনশিরীষ, ছাতিম, বকফুল, মিনজিরি, কলিয়েন্ড্রা, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা, বেলি, ছাতিম, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, নয়নতারা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরি, সন্ধ্যামণিসহ গাছে গাছে কত যে ফুল ফোটে তা বলে শেকরা যাবে না। সদ্যবিদায়ি বর্ষার জল পেয়ে গাছপালাও এ সময় নতুন সাজে সেজে ওঠে। গাছে গাছে সবুজ পাতা আর রংবেরঙের ফুলের কারণেই হয়তো শরৎকালকে বলা হয় ঋতুর রানি।
শরৎকালকে নিয়ে কবিতা লেখেননি বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এমন কবি খুঁজে পাওয়া যাবে না। শরতের কাশফুল, শিউলি ফুল আর শুভ্র মেঘমালার রূপে মুগ্ধ হয়ে কবিগুরু গেয়ে উঠেছেন :
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ
আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা।
সেই মধ্যযুগীয় কবি আলাওল লিখেছেন :
আইল শরৎ ঋতু নির্মল আকাশ
দোলায় চামর কাশকুসুম বিকাশ।
নবীন খঞ্জন দেখি বড়ই কৌতুক
উপজিত থামিনী দম্পতি মনে সুখ॥
শরতের শিউলি ফুল নিয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গান রচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন :
শিউলিতলায় ভোরবেলায়
কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।
শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে
খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা॥
কবি নির্মলেন্দু গুণ শরতের স্নিগ্ধতা, কমনীয়তা হৃদয়ে ধারণ করে তা প্রকাশ করেন এভাবে :
শরৎ, তুমি তোমার উদ্ধত সূর্যের উত্তাপে
নির্মল ঝিলের স্রোতগুলো আকাশে মিলিয়ে দাও;
আর আমি স্মৃতির দংশন থেকে মুক্ত হয়ে বাঁচি।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন শরতের রূপ বর্ণনা করেছেন এভাবে :
শরৎ সে কবে চ’লে গেছে তার সোনালী মেঘের ছটা,
আজো উড়িতেছে মোর এই খেতে ধরিয়া ধানের জটা।
মাঝে মাঝে এর পাকিয়াছে ধান, কোনখানে পাকে নাই,
সবুজ শাড়ীর অঞ্চলে যেন ছোপ লাগিয়াছে তাই।
শেকরার আগে একটা গল্প বলছি সংক্ষেপে। পরিদের রানির কাছে একবার তার ছয় মেয়ে বায়না ধরল তারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ নামের দেশটি দেখতে যাবে। পরিরানি একেক মেয়েকে দেশটি দেখতে পাঠালেন বছরের একেক সময়ে। সবার দেখা শেহলে পরিরানি সবার কাছে জানতে চাইলেন-কার কী ভালো লেগেছে এবং কার কেমন লেগেছে দেশটি। সবাই বলল যে, দেশটির প্রকৃতি তাদের খুব ভালো লেগেছে।
তারা প্রত্যেকেই একে একে তাদের দেখা প্রকৃতির রূপও বর্ণনা করল। সবার বলা শেহলে দেখা গেল, তারা প্রকৃতির যে রূপ বর্ণনা করেছে তা কারো সঙ্গে কারো প্রায় মিলছেই না। তারা পরিরানির কাছে জানতে চাইল, তাহলে আমরা সবাই কি এক দেশেই গিয়েছি নাকি একেকজন একেক দেশে গিয়েছি? পরিরানি বললেন, তোমরা এক দেশেই গিয়েছ কিন্তু বছরের বিভিন্ন সময় গিয়েছ বলে একেক রকম প্রকৃতি দেখতে পেয়েছ।
আসলেই তাই। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হয়। একেক ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে ও ফলে, ফসলে ও সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো প্রকৃতিতে ঋতুবৈচিত্র্যের এমন রূপ পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয়তো নেই।
/ডিএফ