লালন ছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিক বাউলসাধক, মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক এবং দার্শনিক। তিনি বহু গান রচনা করেছেন। লালনের জীবিতাবস্থায় তার গানের কোনো সংকলন প্রকাশ হয়নি। তবে তার শিষ্যরা গান লিখে রাখতেন। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে লালনের গান। লালনের গানে প্রভাবিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবাসী পত্রিকার ‘হারামণি’ বিভাগে লালনের ২০টি গান প্রকাশ করেন। মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন একাই লালনের তিনশ গান সংগ্রহ করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘হারামণি’ গ্রন্থে সংকলিত। বর্তমানে লালনের গানগুলো সমগ্র আকারেই পাওয়া যায়। একাধিক ব্যক্তির সম্পাদনায় লালনের গানের সমগ্র প্রকাশ হয়েছে। পূর্বেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গান দিয়ে প্রভাবিত। যার প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘গোরা’ উপন্যাসে লালনের বিখ্যাত একটি গানের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করেছেন। শুধু দেশের কথাই বা বলি কেন? একটু বিদেশিদের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। অ্যালেন গিন্সবার্গও লালনের গান দিয়ে প্রভাবিত। লালনের গান আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
হাছন রাজার গান
হাছন রাজার গানগুলো আমাদের বাউল গানের আরেক মূল্যবান সম্পদ। এসব গানের মধ্যে তার অধ্যাত্মবাদ, জগৎজীবন সম্পর্কে তার ভাবনা প্রভৃতি প্রকাশ পেয়েছে। হাছন রাজার জীবিতাবস্থাতেই তার গানগুলো ‘হাছন উদাস’ নামক গ্রন্থে সংকলন হয়। এই বইতে ৮৫টি গান রয়েছে। বইটি প্রকাশ হয় ১৯০৭ সালে। যখন তার বয়স ছিল ৫৩ বছর। হাছন রাজার এই বইটি তার জীবিতাবস্থাতেই বলা যায় দুর্লভ হয়ে ওঠে। ‘হাছন উদাস’-এর পূর্বেও হাছন রাজার আরেকটি বই প্রকাশ হয়েছিল। সেই প্রথম বইটির নাম ছিল ‘শৌখিন বাহার’।
এই বইতে পশুপাখি ও নারীবিষয়ক কিছু হালকা মেজাজের ছড়া-কবিতা ছিল। যদিও জীবদ্দশায় বড় কবি হিসেবে হাছন রাজার তেমন খ্যাতি ছিল না। হাছন রাজার গান শুনে মুগ্ধ হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৯২৫ সালে কোনো এক সভার সভাপতি হিসেবে প্রথম অধিবেশনে অভিভাষণ দিতে গিয়ে হাছন রাজার গানের দুটি অংশ উদ্ধৃত করেন। তা নিয়ে আলোচনা করেন। শুধু তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে হিবার্টে বক্তৃতা করতে গিয়ে হাছন রাজার গানের বৈশিষ্ট্য ও দর্শনের কথা উল্লেখ করেন।
শাহ আবদুল করিমের গান
২০০৯ সালে ‘শাহ আবদুল করিমের রচনাসমগ্র’ বইটি প্রকাশ হয়। এর পূর্বেও তার বেশ কিছু বই প্রকাশ হয়। শাহ আবদুল করিমের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের শিরোনাম ‘আফতাব সংগীত’। তবে বইটি পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায়নি। এই বইতে তার ৪০টি গান যন্ত্রস্থ হয়। দ্বিতীয় বইয়ের শিরোনাম ‘গণসংগীত’। বইটি প্রকাশ হয় ১৯৫৭ সালে। ১৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ে গানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১টি। ১৯৮১ সালে ‘শালনীর ঢেউ’ শিরোনামে তার তৃতীয় বই প্রকাশ হয়। বইতে গানের সংখ্যা ছিল ১৬৫টি। ‘ধলমেলা’ নামক ১৬ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশ হয় ১৯৯০ সালে। এই বইতে একটি দীর্ঘ কবিতা এবং একটি গান প্রকাশ হয়। শাহ আবদুল করিমের পঞ্চম বই হলো ‘ভাটির চিঠি’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইতে গানের সংখ্যা ছিল ৮৫টি। এরপর প্রকাশ হয় ‘কালনীর কূলে’ শিরোনামে আরেকটি বই। তারপর আর কোনো বই প্রকাশ হয়নি। এসব নিয়ে তার রচনাসমগ্র প্রকাশ হয়। শাহ আবদুল করিমের যত গান ছিল, তার সবই ঠাঁই পেয়েছে এই বইতে।
পাঞ্জু শাহ গান
বিশিষ্ট মরমি কবি পাঞ্জু শাহর ‘ছহি ইস্কিছাদেকি গওহোর’ নামে একখানা কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। পুঁথি আকারে প্রকাশ হলেও কবি তাকে ‘কেতাব’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই বইয়ের তিনটি সংস্করণ প্রকাশ হয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হয় ১৮৯০ ও ১৯০৭ সালে। কবি নিজেই এর প্রকাশক। ওই গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন কবিপুত্র ১৯৬১ সালে। অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন এই বইটিকে পাঞ্জু শাহর প্রথম জীবনের রচনা বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু খোন্দকার রিয়াজুল হক প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, এটি কবির প্রাপ্ত বয়সের রচনা। খোন্দকার রিয়াজুল হক লিখেছেন, আসলে ওই গ্রন্থের কবি-প্রদত্ত নাম ‘ছহি ইস্কিছাদেকী গওহোর’ এবং এর রচনাবর্ষ ১২৯৭, কবির বয়স তখন ৪৯ বছর। এ কাব্যে মূলত পাঞ্জু শাহের ধর্মীয় চিন্তা, সাহিত্য-ভাবনা ও দর্শনতত্ত্ব ফুটে উঠেছে। স্রষ্টার অসীম রহস্য উপলব্ধি করার জন্য এই বই সহায়ক হবে বলেই কবির ধারণা। কবির ভাষায় :
‘এ কিতাব এমানেতে যে জন পড়িবে।
আল্লার যে ভেদ সেই অবশ্য পাইবে ॥’
এই বইতে শরিয়ত, তরিকত, হকিকত, মারফত ইত্যাদির পরিচয়, গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। বক্তব্যপ্রধান হলেও এতে কাব্যরস অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছেন। এ কাব্যটি জনপ্রিয়তাও লাভ করে। জানা যায়, এ কাব্যের লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে।
রাধারমণের গান
‘ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণের বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ¦লিয়া’Ñরাধারমণের এই গান শোনেনি এমন বাঙালি খুব কম পাওয়া যাবে। শুধু বাঙালি ভাষাভাষীই নয়, অন্য ভাষার এক শিল্পীকেও এই গানের সুরে তাদের ভাষায় গান করতে শোনা গেছে। কবি রাধারমণ একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শৈশব থেকেই রাধারমণের সঙ্গে সংগীতের পরিচয় ঘটে। তার বাবা রাধামাধব দত্ত খ্যাতিমান কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ বাংলায় অনুবাদ করেন। ধারণা করা হয়, রাধারমণের গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও ওপরে।
অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে ‘বাউল কবি রাধারমণ’ নামে ৮৯৮টি গান নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ হয়েছে। ‘হারামণি’ সম্পাদক অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ‘হারামণি’ গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে রাধারমণের ৫১টি গান অন্তর্ভুক্ত করেন। চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের সংগৃহীত গানের একটি সংকলন ১৯৮১ সালে সিলেটের মদনমোহন কলেজের সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘রাধারমণ সংগীত’ প্রকাশ হয়।