বাংলা সাহিত্যে হেমন্ত বন্দনা

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

সাহিত্য

ঋতুকন্যা হেমন্ত ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস মিলে হেমন্তকাল। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ নামক দুটো তারকার

2022-10-28T06:20:45+00:00
2022-10-28T06:20:45+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
সাহিত্য
বাংলা সাহিত্যে হেমন্ত বন্দনা
ড. আবদুল আলীম তালুকদার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২২, ৬:২০ এএম   (ভিজিট : ২৫৯০)
ঋতুকন্যা হেমন্ত ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস মিলে হেমন্তকাল। ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আর্দ্রা’ নামক দুটো তারকার নামানুসারে এ ঋতুর মাসদ্বয়ের নামকরণ করা হয়েছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ। কার্তিকের আঞ্চলিক নাম ‘কার্তি’ বা ‘কাত্তি’। যাকে গাঁও-গেরামের মানুষেরা ‘মরা কার্তিক’ নামেই অভিহিত করে থাকে। কেননা এ সময় গ্রামাঞ্চলে অভাব-অনটনে পড়ে যায় কৃষকেরা। তবে নতুন ধান কাটার পর সাময়িকের জন্য হলেও আবার তাদের সুদিন ফিরে আসে। 

শরতের শ্বেত-শুভ্র কাশফুল বন মলিনতায় পর্যবসিত হলে এবং নীলাকাশে সাদা সাদা মেঘদলের ছোটাছুটির পরিবর্তে সকাল-সন্ধ্যায় কণা কণা শিশিরের জৌলুসতা লক্ষ করলে বুঝতে আর বাকি থাকে না যে প্রকৃতিতে এসে গেছে হেমন্তকাল। হেমন্তের পরেই আসে হাড়-কনকনে শীত। তাই হেমন্তকে বলে শীতের পূর্বাভাস। হেমন্তের সকালে হালকা কুয়াশা পড়তে দেখা যায়। সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়তে থাকলে কুজ্ঝটিকা মুক্ত হয় চারপাশের মাঠ-ঘাট ও আকাশ-প্রান্তর। এই সময় হালকা শীতও অনুভূত হতে থাকে। সবুজ ঘাস ও ধান গাছের ডগায় জমে থাকে মুক্তা দানার মতো শিশিরবিন্দু। হেমন্তে শিউলি, কামিনী, জবা, গোলাপ, মল্লিকা, বকফুল ইত্যাদি ফুলও ফোটে।

মধ্যযুগে বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত ঋতু দিয়ে। কেননা, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। অগ্রহায়ণ শব্দটির ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দুটো অংশের অর্থ যথাক্রমে ধান ও কাটার মৌসুম। সম্ভবত এ কারণেই মোগল সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বর্ষায় রোপণ করা আমন ধান এবং দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বোনা আউশ ধান শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপুষ্ট হয় আর অগ্রহায়ণের প্রথমার্ধেই ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। কাস্তে হাতে কৃষাণ-কৃষাণী ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফসল ঘরে তোলার জন্য। আর নতুন ফসল ঘরে তুলতে পেরে কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা যায়। এ সময় গ্রামবাংলার ঘরে-ঘরে আবহমান বাংলার শস্যভিত্তিক লোকউৎসব নবান্নের আমেজ লেগে থাকে। হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। নব অর্থ নতুন আর অন্ন অর্থ ভাত। অর্থাৎ হেমন্তকালীন নতুন ধান কাটার পর নতুন চালের পিঠা-পুলি-পায়েস প্রভৃতি খাওয়ার উৎসব বা পার্বণবিশেষ-যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মহোৎসব, পল্লী গাঁয়ের লোকেদের প্রাণের উৎসব। বাংলাদেশসহ দুই বাংলাতেই প্রতি বছরই নবান্ন এলে গ্রামে-গঞ্জে মেলা বসে। এসব মেলায় নানা ধরনের খেলনা, মিষ্টান্ন, গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রীসহ নানা জিনিসের সমাহার ঘটে। তা ছাড়া ঐতিহ্যবাহী দেশীয় নৃত্য, গান-বাজনা, খেলাধুলাসহ আবহমান বাংলার লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উদযাপন হয়।

নবান্নের এই ঋতু বাংলা সাহিত্যে কবি-শিল্পীদের ধরা দেয় নানা মাত্রায়, নানা আঙ্গিকে। দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকেরা যুগে-যুগে হেমন্তের নবান্ন উৎসব, পাকা ধানের ম-ম গন্ধ, শুষ্ক অনুজ্জ্বল শান্ত প্রকৃতির ভাবচ্ছবি নানাভাবে তাদের রচনায় তুলে ধরেছেন। অনেকেই আবেগে মন পুড়িয়ে হেমন্তকে পুঁজি করে লিখেছেন কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস বা গল্প। যেমন-নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘হিমেল রাতে’ কবিতায় হেমন্তকে নিয়ে লিখেছেন-‘হিমেল রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে/ হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।/ ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো/ দীপালিকায় জ্বালাও আলো/ আপন আলো,/ সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’ বিশ্বকবির মানসচক্ষে হেমন্তের রূপ ঠিকই ধরা পড়েছে। তিনি হেমন্তকে সৃষ্টির ডালি দিয়ে সাজিয়েছেন। 

কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘অঘ্রানের সওগাত’ কবিতায় বলেন-‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?/ নবীন ধানের আঘ্রানে আজি অঘ্রানে হ’ল মাৎ।/ ‘গিন্নি-পাগল’ চা’লের ফিরনী/ তশতরী ভ’রে নবীনা গিন্নী/ হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশীতে কাঁপিছে হাত।/ শিরনী রাঁধেন বড়ো বিবি, বাড়ী গন্ধে তেলেসমাত!’

পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবিতায় হেমন্ত প্রকৃতিতে গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন-‘আশি^ন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান/ সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।/ ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু/ কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’ 

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন-‘ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন-ক্ষেত মাঠে পড়ে আছে খড়/ পাতা কুটো ভাঙা ডিম-সাপের খোলস নীড় শীত।/ এইসব উৎরায়ে ওইখানে মাঠের ভিতর/ ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ-কেমন নিবিড়। হেমন্তের মনোহারি রূপে মুগ্ধ হয়ে জীবনানন্দ দাশ আরও লেখেন-‘আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়... কার্তিকের নবান্নের দেশে... কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এই কাঁঠাল ছায়ায়...।’ হেমন্তের আসল রূপের বর্ণনা মেলে প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশের এই কবিতায়-‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে/ অলস গেঁয়োর মতো এই খানে-কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার/ চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/ তাহার আস্বাদ পেয়ে পেকে ওঠে ধান।’

 কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় হেমন্তকে উপস্থাপন করেছেন একটি বিশেষ কালের প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন-‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক/ তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিল ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতন।’

কবি বেগম সুফিয়া কামাল গ্রামবাংলার অনবদ্য রূপ-সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ। পল্লী প্রকৃতির সহজ-সরল ও স্বাভাবিক রূপ তার কাব্যে উপজীব্য হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন-‘হেমন্তের কবি আমি, হিমাচ্ছন্ন ধূসর সন্ধ্যায়/ গৈরিক উত্তরীয় টানি মিশাইয়া রহি কুয়াশায়।’ আবার কখনো তিনি হেমন্তকে চিঠি লিখে বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তার ‘হেমন্ত’ কবিতায়-‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/ কোন পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে?/ আনল ডেকে মটরশুঁটি/ খেসারি আর কলাই ফুলে/ আনল ডেকে কুয়াশাকে/ সাঁঝ সকালে নদীর কূলে।/ সকাল বেলা শিশির ভেজা/ ঘাসের ওপর চলতে গিয়ে/ হালকা মধুর শীতের ছোঁয়ায়/ শরীর ওঠে শিরশিরিয়ে।’

নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তার ‘হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল’ কবিতায় লেখেন-‘হেমন্তের হরিদ্রাভ পিঠের ক্ষতটি/ বলে, কবি, আমাকে করাও স্নান, করো নিরাময়/ যে আমাকে ভালোবাসে তাকে কাঁদিয়ে/ বারবার পুড়িয়ে নিজের চোখ অশ্রুহীন আমি;/ কীভাবে সারাবো ক্ষত? কী করে ঝরাবো/ অব্যর্থ শিশির আর্ত হেমন্তের পীড়িত শরীরে?’

বাংলার লোকায়িত জীবন ও তার শ্যামল রূপ-ঐশ্বর্য আল মাহমুদের কবিতায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তার কাব্যে প্রেম-প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও নারী অভিন্ন সত্তায় একাকার হয়ে মিশে আছে। ‘অঘ্রান’ কবিতায় কবি আল মাহমুদ তার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন এভাবে-‘আজ এই হেমন্তের জলজ বাতাসে/ আমার হৃদয় মন মানুষীর গন্ধে ভরে গেছে।/ রমণীর প্রেম আর লবণ সৌরভে/ আমার অহংবোধ ব্যর্থ আত্মতুষ্টির ওপর।/ বসায় মার্চের দাগ, লাল কালো কট ও কষায়।’

আধুনিক যুগের কবি রফিক আজাদ তার ‘প্রতীক্ষা’ কবিতায় বলেছেন-‘এমন অনেক দিন গেছে/ আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,/ হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনবো ব’লে/ নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে।’

আবার কবি নির্মলেন্দু গুণের কণ্ঠে হেমন্তের স্তুতি প্রকাশ পেয়েছে তার ‘হেমন্ত’ কবিতায় এভাবে-‘ঝরা শেফালির মালা গাঁথা সারা হতে না হতেই দুপুরের রোদে সে মালা শুকায়,/ সজীবতা হারা সেই শেফালিতে ভরে না হৃদয়।/ গাছ ভরে যদি শেফালি ফোটালে,/ কুড়াতে কেন তা সময় দিলে না?/ এই অভিযোগে এই অভিশাপে/ চিরকাল হবে হেমন্ত দণ্ডিত।’

কবি মহাদেব সাহা তার ‘হেমন্তের কবিতা’য় লেখেন-‘হেমন্তেই ভালো আছি নিস্তরঙ্গ বাপী-নীর মতো/ চিকন কুয়াশা আছে কখনো বা স্ফুর্তির রোদ,/ সকাল-দুপুর নেই সারাক্ষণ বিকাল স্বগত/ জিজ্ঞাসার জ্বালা নেই, নেই কোনো বিকার বা বোধ/ হেমন্তেই ভালো আছি, শাদা শাদা আছে কিছু মেঘ/ আকাশে ওড়ে না মন উচ্চতম বাঞ্ছার শিখরে/ উত্তেজিত করো না তো অনর্থক অত্রপ আবেগ/ চারুস্বপ্ন জেগে থাকে যতক্ষণ প্রসন্ন শিয়রে।’ 

বৈচিত্র্যে ভরা বাংলার প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও অপার সৌন্দর্য। সে-মতে হেমন্তের সৌন্দর্য হলো তার শান্ত-সুনিবিড় সোনালি প্রকৃতি এবং ঐতিহ্যে লালিত নবান্ন উৎসব। তার সঙ্গে রয়েছে হিম শীতল বাতাস, সোনার ধানে ভরা সোনালি প্রান্তর-সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে, যা গ্রামগঞ্জ, শহরে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিককে আনন্দ দেয়, উৎফুল্ল করে। হেমন্ত যেমন মানবমনকে আবিষ্ট করে রেখেছে যুগের পর যুগ ধরে, তেমনি কবি-সাহিত্যিকেরাও হেমন্তের চিরায়ত রূপ-সৌন্দর্য অমর পঙ্ক্তিমালায় সযতনে ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের কলমের আঁচড়ে। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজও তা প্রবহমান।



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: