আজ কবি নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। কবিতার পাশাপাশি তিনি গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন ও ছবি এঁকেছেন। তার কবিতায় মূলত নারীপ্রেম, শ্রেণি-সংগ্রাম এবং স্বৈরাচার বিরোধিতা-এ বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৪৫ সালে ২১ জুন নেত্রকোনার বারহাট্টার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতার নাম সুখেন্দু প্রকাশ গুণ এবং মাতা বীণাপাণি।
ষাটের দশকের শেষ প্রজন্মের কবি নির্মলেন্দু গুণ। ষাটের দশকের আর্থ-রাজনৈতিক শাসনে বেড়ে ওঠা এই কবি, তার সূচনালগ্নে কোনো প্রাকরণিক কিংবা নান্দনিক চর্চার পথ বেয়ে কাব্যক্ষেত্রে এগিয়ে আসেননি। ষাটের অধিকাংশ কবি যেখানে তাদের কণ্ঠস্বর নির্মাণে পাশ্চাত্য জ্ঞানের প্রেরণায়, তিরিশের কবিতার অভিজ্ঞতায় ভিন্ন ভিন্ন পথের অভিযাত্রী হয়েছেন, নির্মলেন্দু গুণ সেখানে খুব সাদামাটাভাবেই কবিতায় প্রচলন করতে চেয়েছেন এক সহজিয়া সাধন পদ্ধতি। কবিতায় সহজিয়া পথে যারা পথচারী হন তাদের সহজে কাব্য সিদ্ধি লাভ হয় না। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় কাব্য প্রসিদ্ধি করেছেন।
স্বভাবকবিদের মতোই তিনি একটি ফর্ম তৈরি করেছেন। যাতে পাঠক মনোহরণের স্বভাব-দক্ষতা সঙ্গে আবেগময়তার মিশ্রণ ঘটে। তার ফলে অর্জিত হয়েছে একটি হার্দিক ভঙ্গি। রাজনীতিসচেতন স্বভাবসিদ্ধি পন্থার কবি নির্মলেন্দু গুণ সমাজবাস্তবতার ধারণা নিয়ে কবিতাচর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ঠিক তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দলগত রাজনীতি করেছেন, মার্কসবাদী রাজনীতির সঙ্গে প্রকাশ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু কবিতায় তিনি দলগত কর্মোদ্যমকে এবং কৌশলকে তুলে ধরেননি। মূলত যৌবনাবেগ সৃষ্টিশীলতার শক্তিতে রূপান্তরের আকুলতাই কবিচিত্তকে তীব্র গতি দিয়েছেন।
নির্মলেন্দু গুণ একটি স্পন্দিত গদ্যের রীতিতে কবিতায় অস্তিত্বচেতনা ও বিচ্ছিন্নতা বোধকে চিত্র মায়ায় নির্মাণ করেছেন। তিনি উন্মূল স্বভাবের কবি হলেও তার নিজের মধ্যে একটি অন্তর্লোক আছে, যা দিয়ে তিনি মনোনিবেশের একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারেন। তার ‘হুলিয়া’ কবিতায় রাজনৈতিকচেতনা যেমন স্পষ্ট, তারপর তার ব্যক্তিকচেতনার অন্তর্দ্বন্দ্বকে বস্তুপৃথিবীর সঙ্গে অস্তিত্বচেতনা বিচ্ছিন্নতাবোধকে প্রকাশের গতি লক্ষণীয়। মূলত নির্মলেন্দু গুণ রাজনীতি ও প্রেম-এ দুই প্রত্যয়কে নির্ভর করে তার কবিতার ভূমি নির্মাণ করেছেন। এখানেই তার মৌলিকত্ব এবং বাংলা কবিতায় তার প্রতিষ্ঠার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা সরব প্রতিবাদ করেছেন, নির্মলেন্দু গুণ তাদের প্রথম সারির একজন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম কবিতা লেখেন তিনি এবং প্রকাশ্য সভায় পাঠ করেন। এসব ছিল তার প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের অংশ। প্রতিবাদের সঙ্গে সাহস ছিল, ঘৃণা ছিল, শোক ছিল। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন গণমানুষের কবি। সর্বজনগ্রহণযোগ্য ভালোবাসার কবি।
লেখাপড়ার প্রথমে বারহাট্টার করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনস্টিটিউটে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। ১৯৬২ সালে করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনস্টিটিউট অর্থাৎ বারহাট্টা সি. কে. পি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পাস করেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’।
ম্যাট্রিকের পর আইএসসি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। ১৯৬৪ সালের আইএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। আইএসসিতে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা। ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বিএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে পারেননি। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে।
স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি নীরা গুণের সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে এ দাম্পত্যজীবন সফল হয়নি। তাদের একটিমাত্র সন্তানের নাম মৃত্তিকা গুণ।
নির্মলেন্দু গুণের কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহ্যের আবহে লালিত। বেশিরভাগ কবিতায় অত্যাধুনিক দৃষ্টান্তবাদিতা পরিলক্ষিত। তার নারীপ্রেমার্দ্র কবিতাগুলো আবেগ-অন্ভুূতি-সংলগ্ন। তার কবিতায় পাওয়া যায় কমনীয় ধ্বনি ও ছন্দ। নিজের অনুভূতিকে তিনি চিত্রিত করেন চিত্রময়তায়। অনেক ক্ষেত্রে ছন্দময়তার পরিবর্তে অবলম্বন করেছেন গদ্যকবিতার সহজ কাঠামো।
স্বদেশ প্রিয়তা কাব্যরচনার অন্যতম অনুপ্রেরণা। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে আত্মিকভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে যখনই বিপর্যয় এসেছে ততবারই তিনি কলম তুলে প্রকাশ করেছেন তার ক্ষোভ ও দ্রোহ। শ্রেণি-সংগ্রাম এবং স্বৈরাচারবিরোধী কবিতা। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে যে কজন কবি ও লেখক সোচ্চার হয়েছেন, তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য।
১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংশুর রক্ত চাই প্রকাশিত হওয়ার পর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ গ্রন্থের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা ‘হুলিয়া’ কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কবিতার পাশাপাশি ভ্রমণকাহিনিও লিখেছেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ-কাব্যগ্রন্থ : প্রেমাংশুর রক্ত চাই, না প্রেমিক না বিপ্লবী, কবিতা, অমীমাংসিত রমণী, দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী, চৈত্রের ভালোবাসা ও বন্ধু আমার, আনন্দ কুসুম, তার আগে চাই সমাজতন্ত্র, চাষাভূষার কাব্য ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থ : আপন দলের মানুষ, পোড়ামাটি; ছড়ার বই : সোনার কুঠার; আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ : আমার ছেলেবেলা, আমার কণ্ঠস্বর, আত্মকথা ১৯৭১।
কবিতায় অবদানের জন্যে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। আজ মানুষের ভালোবাসাধন্য কবি নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিন। সময়ের আলোর পক্ষ থেকে জানাই শুভেচ্ছা।