বর্ষা ও বর্ষণ বাঙালির মনোজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাপ যেমন সাপুড়ের বিনে মোহাবিষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমন করে বাঙালিও বৃষ্টি ও বর্ষার মোহাবিষ্ট হয়ে আছে অনন্তকাল ধরে। বাঙালির শিল্প-সাহিত্য, গান-কবিতায় বর্ষা তাই অনিবার্য অনুষঙ্গ। বাঙালির এই বর্ষা বন্দনা সাম্প্রতিক কোনো প্রবণতা নয়। খ্রিস্টপূর্ব ত্রিশ, মতান্তরে চল্লিশ দশকে সংস্কৃত কবি কালীদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে প্রথম উন্মাদনা এনেছিলেন বর্ষা বন্দনার। আর রবীন্দ্রনাথে বর্ষা পেয়েছে পূর্ণতা।
‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শ্রাবণের গান দিতে এসেছিলেন এবং দিয়েছেনও উজাড় করে। বৃষ্টি ও বর্ষা নিয়ে পৃথিবীর আর কোথাও এমন উৎসব নেই, এমন নিবেদন নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো অঞ্চলে বর্ষা ঋতু স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা পায়নি, যেমনটা এই বঙ্গভূমিতে পেয়েছে। আর বর্ষাকে এমন মোহনীয় ভঙ্গিমায়, এমন রূপ-রস-মাধুর্যে কে সাজাতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া? রবীন্দ্রনাথের নীপবনে ছায়াবীথি তলে বারবার বাঙালিকে ছুটতে হয় স্নান করতে হয় নবধারা জলে।
অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তার ডারউইনবাদ ও রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনা প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রকৃতি-সাহিত্যের রাজাধিরাজ।’ রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা ছড়ায় প্রতিটি ঋতু পায় আলাদা বৈভব। কিন্তু বর্ষার প্রতি যেন রবীন্দ্রনাথের এক ধরনের স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব। রবীন্দ্র কাব্যে বর্ষা তাই অনেক বেশি সজীব, অনেক বেশি প্রাণবন্ত।
বাংলাদেশের, বিশেষ করে গ্রামবাংলায় বর্ষাবর্ষণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটেছিল মূলত জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে। বজরায় ভেসে তিনি যখন শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসর অঞ্চলে আসতেন, সেই আসা-যাওয়ার অবকাশে, নদীমাতৃক বর্ষার গ্রামবাংলাকে স্বরূপে চিনে নিয়েছিলেন তিনি। বাংলার ওই প্রকৃতি তার চেতনায় স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিল। আমৃত্যু ওই স্মৃতি বহন করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। একশরও অধিক গান ও কবিতায় এই বর্ষা, এই আষাঢ়-শ্রাবণের নান্দনিক বন্দনা তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
বৃষ্টিঝরা সকাল সন্ধ্যা বা রাতের যে মায়াবী প্রভাব তার সর্বাধিক প্রকাশ দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের গানে, ছিন্ন পত্রাবলীর বয়ানে, কবিতায় এবং ছোটগল্পে কাহিনির পটভূমি বা অনুষঙ্গ তৈরিতে। তার বর্ষা ঋতুর গান তাই এতটা জনপ্রিয় যা শ্রোতার চেতনা আচ্ছন্ন করে। গীতবিতানের অন্তর্ভুক্ত প্রকৃতিবিষয়ক গানের মধ্যে বর্ষা ঋতুর গানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সম্ভবত সেই সংখ্যা ১৩৪ বা ১৩৫।
কেবল গান বা কবিতা নয়। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পেও বর্ষার প্রভাব স্পষ্ট। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘সমাপ্তি’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘একরাত্রি’, ‘মহামায়া’, ‘শাস্তি’, ‘মেঘ ও রৌদ্র’, ‘মণিহারা’ ‘অতিথি’ ইত্যাদি গল্পে বর্ষা ও বৃষ্টি এসেছে অভিনবত্বের শিল্পছোঁয়ায়। এগুলোতে কখনো প্রমত্ত পদ্মার খরস্রোত, কখনো কখনো মুষলধারে বৃষ্টি, কখনো ঝড়জলের প্রলয় স্রোত আবার কখনো বর্ষার পারিপার্শ্বিক চিত্র বাস্তব রূপ নিয়ে ফুটে উঠেছে এবং গল্পগুলোকে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। পদ্মা পর্বের গল্প থেকে গুটিকয় উদাহরণ বক্তব্য-বিষয় স্পষ্ট করে তুলবে। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পের প্রেক্ষাপটরূপে রবীন্দ্রভাষ্য :‘বর্ষাকাল আসিল। ক্ষুধিত পদ্মা উদ্যান গ্রাম শস্যক্ষেত্র এক এক গ্রাসে মুখে পুরিতে লাগিল। পাড়ভাঙার অবিশ্রাম ঝুপ্ ঝাপ্ শব্দ এবং জলের গর্জনের দশ দিক মুখরিত হইয়া উঠিল।’ ‘সমাপ্তি’ গল্পেও দেখা যায় বর্ষার খরস্রোতা নদী ও মুষলধারে বৃষ্টিকাহিনির তাৎপর্যময় পরিণতির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। যেমন দেখা যায় ‘মহামায়া’ ‘মণিহারা’ বা ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে।
রবীন্দ্রনাথের সংগীতজীবনে সর্বমোট ১১২টি বর্ষা অঙ্গের গান, যা তিনি রচনা করেছেন ষোলো বছর বয়স থেকে শুরু করে প্রায় ১৯৪১ সালে মৃত্যুর-প্রাক্কালে পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম বর্ষার গানটি রচনা করেন তার ষোলো বছর বয়সে। বৈষ্ণব পদাবলির অনুসরণে ভানুসিংহ ছদ্মনামে ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদ ‘শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ হলো তার লেখা প্রথম বর্ষার গান। এর পরে বেশ কিছুকাল বিরতির পরে একুশ বছর বয়সে রচনা করেন ‘গহন ঘন ছাইল’ দ্বিতীয় বর্ষার গানটি। গানটি ‘কালমৃগয়া’ গীতিনাট্যে ব্যবহৃত হয় এবং সম্ভবত নাটকের প্রয়োজনেই পূর্ববর্তী কোনো হিন্দি শাস্ত্রীয় সংগীতের আদর্শে রচিত। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বর্ষার গানটি তার বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছেও ভীষণ জনপ্রিয় ছিল।
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ বক্তৃতায়ও বৃষ্টি ও বর্ষা বন্দনা দেখতে পাই। বাঙালির ধ্যান ও মননে এই যে বর্ষার সম্মোহনী রূপের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ তাতে অগ্রণী তো রবীন্দ্রনাথই। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদে এলো বান’ থেকে ‘ওরে আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’ কিংবা ‘এমন দিনে তারে বলা যায় এমনও ঘনঘোর বরিষায়’ কোথায় নেই রবীন্দ্রনাথ? রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় বর্ষা ও নদীর কবি। এই যে উত্তর আধুনিক তকমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো তরুণ কবিটিও বর্ষার প্রশ্নে হয়ে যায় অতি রোমান্টিক, বৃষ্টির রোমাঞ্চে হয়ে উঠে উদাসীন তার পেছনেও আলখাল্লার পকেটে মেঘ বৃষ্টি আর বর্ষা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক চির আধুনিক শাশ^ত রোমান্টিক পুরুষ-বাঙালির চিরকালীন ভরসা রবীন্দ্রনাথ।
সময়ের আলো/আরএস/