কার্তিকের নবান্নের দেশে

আলী রেজা

সাহিত্য

রূপ-লাবণ্য আর স্নিগ্ধতায় ভরাপ্রকৃতি উপহার হিসেবে নিয়ে আসে হেমন্ত। সে আসে ‘কৃষকের মুখে ফসলের হাসি’ নিয়ে। ‘এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’

2023-11-10T02:29:08+00:00
2023-11-10T02:39:29+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
কার্তিকের নবান্নের দেশে
আলী রেজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৩, ২:২৯ এএম  আপডেট: ১০.১১.২০২৩ ২:৩৯ এএম
কার্তিকের নবান্নের দেশে
রূপ-লাবণ্য আর স্নিগ্ধতায় ভরা প্রকৃতি উপহার হিসেবে নিয়ে আসে হেমন্ত। সে আসে ‘কৃষকের মুখে ফসলের হাসি’ নিয়ে। ‘এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’ আমরা তাকে বলি ফসল কাটার ঋতু। ফসলের গন্ধ বিলিয়ে হেমন্ত হয়ে ওঠে আমাদের প্রেয়সী ঋতু। শরৎ প্রকৃতিতে যে সৌন্দর্যের সূচনা করে, হেমন্ত সে সৌন্দর্যের পূর্ণতা দান করে। এই পূর্ণতা বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দ বয়ে আনে। বিশেষ করে সোনালি শস্যে ভরে দেয় বাংলার কৃষকের আঙিনা। হেমন্তের আবেশ ও আমেজ তাই মানবমনকে পুলকিত, আন্দোলিত ও আশান্বিত করে। হেমন্ত শুধু একটি ঋতু বা কালপর্ব নয়। এ হচ্ছে পূর্ণতা ও সচ্ছলতার শুভাগমন। হেমন্ত ফসল তোলার ঋতু। কিষান-কিষানির দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে মাঠের ফসল ঘরে আসবে। ফসলের গন্ধে ভরে উঠবে সারা বাড়ি। কন্যা-জায়া-জননীর ব্যস্ততা দিনরাত। আর  উঠোনে ছড়ানো সোনালি ধান। সঙ্গে ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব। তার সঙ্গে আনন্দের হিল্লোল। কিষান-কিষানির মনে সচ্ছলতার এমন হাসি হেমন্ত ছাড়া আর কে ফোটাতে পারে?

কাশফুলের শুভ্রতা আর হালকা শিশিরের কোমলতা দিয়ে শরৎ আমাদের কুসুমিত মানস গঠন করে। হেমন্ত সেই মোহন মানসে এনে দেয় পূর্ণতা। এই পূর্ণতা প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ ও উচ্ছ্বাসের পূর্ণতা। তাই বলা হয় ‘শরতে-হেমন্তে বাংলাদেশ’। বাংলার কৃষক যখন হেসে ওঠে তখন পুরো বাংলাদেশ হেসে ওঠে। বাংলার কৃষকের উঠোন-আঙিনা যখন সোনালি শস্যে ভরে যায় তখন পুরো বাংলাদেশ সচ্ছলতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই আমরা অপেক্ষায় থাকি হেমন্তের। গ্রামীণ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে হলে আমাদের দেখতে হবে শরৎ-হেমন্তের বর্ণিল রূপ।

ঋতু পরিক্রমায় হেমন্ত আসে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস মিলে। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মিলে হেমন্ত সাজিয়ে তোলে বাংলার প্রকৃতিকে। কত কবির কত কবিতা, কত শিল্পীর কত গান এই হেমন্ত নিয়ে। আর এসব কবিতা ও গানে আমাদের প্রাণের সুর বেজে ওঠে। আমরা প্রাণিত হই বাংলার রূপ বর্ণনায়, মেতে উঠি কাব্য ও গানে। আমাদের নিসর্গ ও নির্জনতার কবি, রূপসী বাংলার পথঘাট আর জলাঙ্গীর কবি জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর পর আবার দ্বিতীয় জীবন নিয়ে এই বাংলায় ফিরে আসতে চেয়েছেন। বিভিন্ন রূপে দেখতে চেয়েছেন বাংলার রূপবৈচিত্র্য। তবে তিনি অবশ্যই ফিরে আসতে চেয়েছেন হেমন্তে। এই ‘কার্তিকের নবান্নের দেশ’ই যেন কবির কাক্সিক্ষত বাংলা। তাই বাংলা আর হেমন্ত-এ দুয়ের সখ্য যেন আবহমান কাল ধরে।

আবহমান কাল ধরে বাংলার কৃষক প্রকৃতির বৈরী আচরণকে সহ্য করে টিকে থাকে। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, খরায় তছনছ হয়ে যাওয়া অনেক সাধের ফসলের মাঠটিকে আবার ফুলে-ফসলে সাজিয়ে তোলে বাংলার কিষান-কিষানিরা। হেমন্তই সে সুযোগ এনে দেয়। হেমন্তে প্রকৃতি সাজে আপন রঙে আর মানুষ সাজে প্রকৃতির রঙে। ফসলের গন্ধে বিভোর করে দেয় কৃষকের মন। শুধু কৃষক নয়। কৃষকের সঙ্গে জেগে ওঠে খাল-বিল, জলাঙ্গী। মানুষমাত্রই ফসলের গন্ধে মুগ্ধ হয়, মোহিত হয়ে ওঠে। আর ফসল বাঙালিকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। ফসল বাঙালিকে উল্লাসে মেতে ওঠার শক্তি জোগায়। ফসল বাঙালিকে হাসতে শেখায়। ফসল বাঙালিকে ভালোবাসতে শেখায়। আর হেমন্ত বাঙালিকে এই ফসল ভরা মাঠ উপহার দেয়। ফসলভরা মাঠের হাসি দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আবেগে উদ্বেলিত হয়েছেন। সুর ও ছন্দে আন্দোলিত হয়ে উঠেছে কবির হৃদয়। হেমন্তের ফসলভরা মাঠ কবিকে মুগ্ধ করেছে। কবির কাব্যভাষায় সে মুগ্ধতার প্রকাশ : ‘ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি/ আমি কী দেখেছি মধুর হাসি সোনার বাংলা...।’ অগ্রহায়ণ বা হেমন্তের ফসলভরা ক্ষেতে যে মধুর হাসি কবিগুরু দেখেছেন সে হাসি আসলে বাংলা মায়ের হাসি। প্রতিটি বাঙালির হাসি। এ হাসি বাঁধভাঙা। এ হাসি নৈসর্গিক। এ হাসি চিরন্তন।

 কবিগুরুর সংগীতের এই পঙক্তিই বলে দেয় হেমন্ত বাঙালির জীবনে দারুণ সুখ, সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার বার্তা নিয়ে আসে। হেমন্তের প্রকৃতি একটি পূর্ণরূপ নিয়ে হাজির হয় বাংলায়। গ্রীষ্ম ও বর্ষা জীবনকে প্রায়ই অতিষ্ঠ করে তোলে। জীবনের ছন্দপতন ঘটায় প্রতিনিয়ত। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় অস্থির করে দেয় মন। ঝড়-বন্যার কবলে পড়তে হয় মাঝে মাঝেই। বাংলার কৃষকের আতঙ্কের সীমা থাকে না। তখন শরৎ আসে সুখের বার্তা নিয়ে। তারপর হেমন্ত আসে। সুখে ভরিয়ে দেয় জীবনকে।

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: