খাওয়া-দাওয়া থেকে হাঁটাচলা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায়

নৌশিন তাবাসসুম

চিকিৎসাপত্র

বাংলাদেশের অগণিত পরিবারে ডায়াবেটিস এখন নিত্যসঙ্গী। সকালের নাশতায় কতটা ভাত, দুপুরে কতটুকু মাছ, রাতের হাঁটা হলো কি না এসব হিসাব

2025-12-08T02:10:04+00:00
2025-12-08T02:11:29+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
চিকিৎসাপত্র
খাওয়া-দাওয়া থেকে হাঁটাচলা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায়
নৌশিন তাবাসসুম
প্রকাশ: সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:১০ এএম  আপডেট: ০৮.১২.২০২৫ ২:১১ এএম  (ভিজিট : ২৩৪)
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের অগণিত পরিবারে ডায়াবেটিস এখন নিত্যসঙ্গী। সকালের নাশতায় কতটা ভাত, দুপুরে কতটুকু মাছ, রাতের হাঁটা হলো কি না এসব হিসাব অনেকের জীবনযাত্রায় অন্তর্গত হয়ে গেছে। তবু একটি সত্য সব দুশ্চিন্তার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে থাকে: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সঠিক অভ্যাসে বেশিরভাগ মানুষ স্বাভাবিক, সুস্থ, দীর্ঘ জীবন কাটাতে পারে। দরকার শৃঙ্খলা, বুঝে চলা আর ধারাবাহিকতা।

ডায়াবেটিসে সর্বক্ষণ নজর রাখতে হয় রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামায়। প্রতিদিনের খাবার, শরীরচর্চা, মানসিক চাপ, ঘুমের মান, অসুস্থতা সব মিলিয়ে রক্তে শর্করার ওপর বহুমুখী প্রভাব পড়ে। এই সম্পর্কগুলো বুঝে গেলে ডায়াবেটিস আর অচেনা প্রতিপক্ষ হয়ে থাকে না, বরং নিয়ন্ত্রণের পথ নিজে থেকেই স্পষ্ট।

খাদ্যাভ্যাসই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার


রক্তে শর্করার মাত্রা কোন জিনিসে সবচেয়ে দ্রুত বদলায়? উত্তর একটাই খাদ্য। বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেট। সাদা ভাত, পোলাও, নরম রুটি, আলুভাজি এসব আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির মূল অংশ হলেও এগুলো দ্রুত গ্লুকোজে পরিণত হয়। ফলে খাবার শেষে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায়।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের (অউঅ) সবশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ও গুণগত মান দুটি বিষয়ই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। এ জন্য খাবার বাদ দেওয়ার কথা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বদল আনা। সাদা ভাতের অর্ধেকের জায়গায় ব্রাউন রাইস বা আটার রুটি, সঙ্গে লাউ, পটোল, পালং শাক, ডাঁটার মতো আঁশসমৃদ্ধ সবজি এগুলো শর্করার বৃদ্ধিকে ধীর করে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে রুই, তেলাপিয়া, মুরগি, ডাল বা ছোলার মতো খাবার রাখলে রক্তে শর্করা তুলনামূলক স্থির থাকে।

কার্বোহাইড্রেট গুণে খাওয়া বা প্লেট পদ্ধতি দুটিই কার্যকর। প্লেট পদ্ধতি সহজ : প্লেটের অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন, আর এক-চতুর্থাংশ শর্করা। এভাবে সাজানো এক বাঙালি প্লেটে থাকতে পারে মাছের ঝোল, ভাজা বা সেদ্ধ শাক আর অল্প ব্রাউন রাইস। খাবার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে মেপে খাওয়া জরুরি। ভাত একটি মুঠির মতো, প্রোটিন হাতের তালুর মাপের, আর ফল অল্পই বিশেষ করে আম, লিচুর মতো উচ্চ চিনিযুক্ত ফল।

ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্দেশনাও বলে আঁশযুক্ত খাবার বাড়ালে এবং চিনি-সমৃদ্ধ পানীয় কমালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। মিষ্টি চা, বাজারের জুস, কোমল পানীয় এসব রক্তে শর্করা বাড়ায় চোখে পড়ার মতো দ্রুততায়। এর বদলে পানি, পাতিলেবুর শরবত (চিনি ছাড়া), ডাবের পানি বা চিনিমুক্ত চা ভালো বিকল্প।

নিয়মিত শরীরচর্চা : প্রতিদিনের বিনিয়োগ


খাদ্যাভ্যাস যেমন নিয়ন্ত্রণ আনে, শরীরচর্চা সেই নিয়ন্ত্রণকে ধরে রাখে। নিয়মিত ব্যায়ামে শরীরের কোষগুলো গ্লুকোজ ব্যবহার করতে শেখে, ইনসুলিন আরও কার্যকর হয়। এতে রক্তের শর্করা নিচের দিকে আসে।

ডাক্তাররা সাধারণত সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম পরামর্শ দেন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি ভাঙা, বাগানের কাজ, বাসার হালকা-ভারী কাজ সবই এর মধ্যে পড়ে। সপ্তাহে দুদিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, যেমন হালকা ওজন তোলা বা নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে স্কোয়াট, প্ল্যাঙ্ক এসব করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।

যারা ইনসুলিন বা শর্করানিয়ন্ত্রক ওষুধ খান, তাদের ব্যায়ামের আগে-পরে রক্তে শর্করার মাত্রা পরখ করা দরকার। ব্যায়ামের সময় শর্করা কমে গেলে হাতব্যাগে গ্লুকোজ ট্যাবলেট বা বিস্কুট রাখা নিরাপদ।

ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়মিত রুটিন


খাদ্য আর ব্যায়ামের সঙ্গে ওষুধ হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের তৃতীয় স্তম্ভ। ওষুধ বা ইনসুলিন ঠিক সময়ে, ঠিক মাত্রায় নিতে হয়। অনেক সময় ওষুধ ও খাবারের সময় মিল না হলে শর্করার মাত্রা এলোমেলো হয়। ইনসুলিন যারা নেন, তাদের সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, মেয়াদ পরীক্ষা এসব ছোট বিষয়ও প্রভাব ফেলে।

রক্তে শর্করা নিয়মিত মাপলে কোন খাবার শরীরে কী প্রভাব ফেলছে, কোন দিন স্ট্রেস বেশি থাকলে শর্করা বাড়ছে, কোন রাতে ঘুম কম হলে সকালে রিডিং বেশি এসব জানা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আত্মজ্ঞানই সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।

মানসিক চাপ ও ঘুম : অদৃশ্য প্রভাবক

অনেকেই বোঝেন না, মানসিক চাপ রক্তে শর্করাকে নির্দয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। চাপে শরীর কর্টিসলসহ নানা হরমোন বাড়ায়, যা ইনসুলিনকে বাধাগ্রস্ত করে। গভীর শ্বাস, নামাজ বা ধ্যান, হাঁটাহাঁটি, ডায়েরি লেখা এসব সামান্য অভ্যাস শর্করানিয়ন্ত্রণে পরোক্ষভাবে বিশাল ভূমিকা রাখে।

ঘুম কম হওয়া ডায়াবেটিসের অন্যতম অদৃশ্য শত্রু। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৭-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম জরুরি। বিচ্ছিন্ন ঘুম, রাত জাগা, স্ক্রিন ব্যবহার এসব ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়। নিয়মিত ঘুমের রুটিন মানলে রক্তে শর্করা অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকে।

অসুস্থতা ও হরমোনের ওঠানামা


জ্বর, সর্দি, সংক্রমণ এগুলো হলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায়। শরীর তখন লড়াই করতে গিয়ে অতিরিক্ত হরমোন ছাড়ে, যা শর্করাকে ওপরে তোলে। এ সময় ‘সিক ডে প্ল্যান’ অত্যন্ত দরকার কতক্ষণ পরপর শর্করা মাপবেন, পানি কত খাবেন, খাবার না খেতে পারলে কী খাবেন, কোন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে যেতে হবে এসব জানা চাই।

মেয়েদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্র বা মেনোপজের সময় রক্তে শর্করা ওঠানামা করতে পারে। কয়েক মাস নজর রাখলে কোন সময়ে শর্করা বাড়ছে বা কমছে তা বোঝা যায় এবং সে অনুযায়ী খাবার, ওষুধ সামঞ্জস্য করা যায়।
প্রতিরোধ : শুরুটা এখানেই

ডায়াবেটিস হয়নি মানেই নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষ একটু সচেতন হলেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে। বিখ্যাত ডায়াবেটিস প্রিভেনশন প্রোগ্রামের গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র ৫-৭ শতাংশ ওজন কমালে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। পাশাপাশি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটা এবং খাবারে আঁশ বাড়ানো অত্যন্ত কার্যকর।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকে বড় ধরনের ওজন কমাতে পারলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ‘রেমিশন’-এও যেতে পারে। অর্থাৎ শর্করা স্বাভাবিক থাকে, ওষুধ লাগে না। যদিও সবার ক্ষেত্রেই তা সম্ভব নয়, তবু এটি প্রমাণ করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন কতটা শক্তিশালী হতে পারে।

বাংলাদেশি জীবনযাপনে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন

ডায়াবেটিস মানেই প্রিয় খাবার সব বাদ এই ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। বাঙালির রান্নায় অল্প পরিবর্তনেই চমৎকার ফল পাওয়া যায়। যেমন ভাজাপোড়া কমানো, ভাতে আঁশ বাড়ানো, রেসিপিতে তেল অর্ধেক কমানো, মিষ্টি চা বাদ দিয়ে লেবুপানি হাঁটা বাড়িয়ে লিফট কম ব্যবহার বাজারে গেলে লিফট নয়, সিঁড়ি এসব ছোট পরিবর্তন মিলেই বড় উপকার দেয়।

নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার অভ্যাসই আসল চিকিৎসা দিনশেষে ডায়াবেটিস মোকাবিলা কোনো দ্রুত চিকিৎসা নয়, এটি একটি সুস্থ জীবন গড়ার প্রতিশ্রুতি। 

খাবারের তালিকা ঠিক রাখা, সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন হাঁটা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শর্করা পরীক্ষা এসব অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল।

ডায়াবেটিসকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সচেতনতা আছে, রুটিন আছে, সামান্য শৃঙ্খলা আছে এ তিন মিলেই একজন মানুষ স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত, শক্তিশালী জীবনযাপন করতে পারে। সুস্থ জীবন একদিনে আসে না, তবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তই পথ দেখায়।

সেই পথটাই আজ বাংলাদেশে লাখো মানুষ অনুসরণ করে ভালো থাকছেন। আপনিও পারবেন নিয়ম ধরে রাখলেই জয় আপনার।

সময়ের আলো/এআর



  বিষয়:   খাওয়া-দাওয়া  হাঁটাচলা  ডায়াবেটিস  নিয়ন্ত্রণ 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: