ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন সর্বপ্রথম ১৮৬৬ সালে এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের চিহ্নিত করেন। জন ল্যাংডন ডাউন তার নামানুসারে একে ডাউন সিনড্রোম নামকরণ করেন। ক্রোমোজোম সংক্রান্ত রোগের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম প্রথম সারির একটা রোগ।
প্রায় ১০০০ জনের মধ্যে ১ বা ২ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগের প্রকৃত কারণগুলো এখনও জানা সম্ভব হয়নি। তবে বাহ্যিক পরিবেশের কিছু বিষয়কে এর সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হয়। যেমন মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি, ক্রোমোজোম ২১ (৪৭ : ২১)-এর নিয়মিত ট্রাইসোমি প্রভৃতি।
ডাউন সিনড্রোমডাউন সিনড্রোম নামক বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। ডাউন সিনড্রোম (DS বা DNS ) মূলত একটি জেনেটিক ডিসঅর্ডার। এটি ট্রাইসোমি ২১ নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি রোগ যেখানে ২১ নং ক্রোমোজোমে আরেকটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম বিদ্যমান থাকে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি কম হয় ও বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। তবে এটিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এটি কোনো রোগ নয়, বরং জন্মগত একটি ত্রুটি। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক তরুণের গড় আইকিউ ৫০ যা ৮-৯ বছরের সুস্থ শিশুর সমান।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যেতে পারে (সব শিশুর ক্ষেত্রে সবগুলো থাকবে না) :
শারীরিক বৈশিষ্ট্য : মুখমণ্ডল তুলনামূলক চ্যাপ্টা, চোখ কিছুটা তির্যক ও চোখের কোণে ভাঁজ, ছোট নাক ও চ্যাপ্টা নাসারন্ধ্র, ছোট কান, জিহ্বা তুলনামূলক বড় মনে হতে পারে, হাতের তালুতে একটিমাত্র ভাঁজ, পেশির টান কম (hypotonia)।
বিকাশগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক : বসা, হাঁটা, কথা বলা সবকিছুতে দেরি, শেখার ক্ষমতা ধীর কিন্তু সম্ভব, সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা।
স্বাস্থ্যগত সমস্যা (সব ক্ষেত্রে নয়) : জন্মগত হৃদরোগ, থাইরয়েড সমস্যা, শ্রবণ ও দৃষ্টিজনিত সমস্যা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকা।
ডাউন সিনড্রোম নির্ণয়গর্ভাবস্থায় : স্ক্রিনিং টেস্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষা ও সিভিএস, অ্যামনিওসেন্টেসিস (এটির মাধ্যমে শিশুর ক্রোমোজোম বিশ্লেষণ করা হয়)।
জন্মের পরে : শিশুর শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে সন্দেহ হলে ক্যারিওটাইপিং (chromosomal anaylis) করে নিশ্চিত করা হয়।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুকে লালনপালন
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ভালোবাসা, ধৈর্য ও সঠিক সহায়তা।
চিকিৎসা ও থেরাপিনিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞের ফলোআপ, হৃদরোগ, থাইরয়েড, চোখ ও কানের পরীক্ষা, থেরাপি খুবই প্রয়োজনীয় একটা পদক্ষেপ যেমন ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি।
শিক্ষা ও বিকাশডাউন সিনড্রোমের শিশুকে স্বাভাবিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা দেওয়া গেলেও অনেকের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দিতে হয়। কেউ কেউ মাধ্যমিক বিদ্যালয় শেষ করতে পারে, খুব অল্পসংখ্যক উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত যেতে পারে। বিশেষ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, ধাপে ধাপে শেখানো, প্রশংসা ও উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের শেখানো সম্ভব।
বাংলাদেশে ডাউন সিনড্রোম নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। ২০১৬ সালে গঠিত ‘বাংলাদেশ ডাউন সিনড্রোম সোসাইটি’ এ শিশুদের উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এনজিও এ বিষয়ে উদ্যোগী হলেও জাতীয় পর্যায়ে এখনও সুসংগঠিত সেবা নিশ্চিত হয়নি।
ডাউন সিনড্রোম শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল এবং থেরাপি সেন্টারের অভাব রয়েছে। অধিকাংশ পরিবার এ বিষয়ে সচেতন নয় এবং অনেক সময় সামাজিক লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে সমস্যাটি গোপন রাখার চেষ্টা করে।
ডাউন সিনড্রোম শিশুদের মানসিক এবং শারীরিক বিকাশে বিশেষ শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা সীমিত। সাধারণ স্কুলে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিশুর শিক্ষার সুযোগ নষ্ট হয়।
এই শিশুদের শেখার গতি ধীর হলেও ধৈর্য এবং সঠিক পদ্ধতিতে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। থেরাপি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মানসিক উন্নয়ন ঘটানো যায়।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকাডাউন সিনড্রোম শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই শিশুদের উন্নয়নের জন্য বাবা-মায়ের ধৈর্য, যত্ন, ও উৎসাহ প্রয়োজন। শিশুকে বোঝা নয়, পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অন্য শিশুদের ওদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখাতে হবে এবং কারও সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক পরিবার এ ধরনের শিশুদের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়।
অভিভাবকদের কাউন্সেলিং এ ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হতে পারে। পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে এবং নিয়মিত থেরাপি ও চিকিৎসার মাধ্যমে এই শিশুরা উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
ডাউন সিনড্রোম শিশুদের জন্য দয়া নয়, সহযোগিতা প্রয়োজন। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের শিশুদের প্রতি সমান আচরণ এবং তাদের সঠিক অধিকার নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। সঠিক সহায়তা পেলে অনেক ডাউন সিনড্রোম শিশু স্কুলে যায়, কাজ করে এবং সমাজে স্বাধীনভাবে বাঁচে।
সামাজিক সচেতনতা তৈরিডাউন সিনড্রোম নিয়ে সমাজে এখনও ভুল ধারণা ও কুসংস্কার আছে। এগুলো দূর করা খুব জরুরি। ডাউন সিনড্রোম কোনো অভিশাপ নয় এ কথা প্রচার করা। স্কুল, হাসপাতাল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা।
মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিবাচক গল্প শেয়ার করা। ডাউন সিনড্রোম শিশুদের স্কুল ও সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা।
তাদের নিয়ে করুণা নয়, সম্মান দেখানো।
মনে রাখতে হবে তারা আলাদা নয়, তারা আমাদেরই অংশ। ডাউন সিনড্রোম একটি জেনেটিক অবস্থা, এটি প্রতিরোধযোগ্য নয়, কিন্তু সঠিক যত্ন, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তায় একটি শিশুকে আনন্দময় জীবন প্রদান করা সম্ভব।
লেখক : শিশু বিশেষজ্ঞ, রেজিস্ট্রার, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
সময়ের আলো/এআর