ঋতু পরিবর্তনের ফলে সারা দেশেই জেঁকে বসেছে শীত। শীতের এই সময়ে প্রায় সব বয়সের মানুষ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন। তবে শিশু ও বয়স্করা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয় এ সময়। সাধারণ ফ্লু যেমন সর্দি, কাশি, জ্বরসহ আরও নানা ধরনের গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও ঠান্ডা বাতাসের প্রভাবে পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটে। যেহেতু ছোট শিশু ও বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, তাই তাদের বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
প্রতি বছরই শীত মৌসুমে নিউমোনিয়ার কারণে শিশু ও বয়স্ক মানুষ মারা যায়। এটি একটি ফুসফুসজনিত রোগ। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন বিভিন্ন রোগে ভুগছেন বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মধ্যে রোগটি বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিলে মৃত্যুর শঙ্কা অনেকাংশে কমে আসে। চিকিৎসায় বিলম্ব হলে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ ওহী উদ্দিন বলেন, ‘শীতের সময় বাচ্চাদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জন্মের সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে না। এটি বয়স বাড়ার বাড়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে।
সাধারণত আট বছর পর্যন্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দুর্বল থাকে। একই সঙ্গে ঠান্ডা পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে শিশুদের ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অনেক সময় অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরির সমস্যা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, প্রচণ্ড জ্বর এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। যা শিশুদের জন্য খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এতে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যাও দেখা দেয়। ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা, জ্বর ও শরীর ব্যথার মতো সমস্যারও সম্মুখীন হয়।
শীতকালে পরিবেশে আর্দ্রতার অভাব এবং কখনো কখনো ডিহাইড্রেশনের কারণে অ্যালার্জি, ফুসকুড়ি ও ত্বক সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া পশমি কাপড়ের কারণে ত্বকে অ্যালার্জির ঝুঁকিও থাকে।
এই ঋতুতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে বিশেষ যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব শিশু খুব ছোট নিজের যত্ন নিতে পারে না তাদের পিতা-মাতাদের এই বিষয়গুলোর প্রতি সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে সুষম খাবার ও প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। ভিটামিন সি জাতীয় খাবার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শাওন সিংহ বলেন, ‘বয়স্ক ব্যক্তিরা সাধারণত তাদের অসুস্থতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তারা মনে করেন, বয়স হয়েছে এখন এত ডাক্তার দেখিয়ে কী হবে? এ অবস্থায় পরিবারের অন্য সদস্যদের তাদের কার্যকলাপ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার।
যদি প্রচণ্ড সর্দি, কাশি বা জ্বর হয়, অতিরিক্ত কফের কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে তা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তিদের নানা রকম ক্রনিক ডিজিজ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনির রোগ, চর্মরোগ, ব্যথা ইত্যাদি থাকতে পারে। শীতে কিছু কিছু রোগ বাড়ে, তাদের কষ্টও বাড়ে।
বয়স্করা সাধারণত নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পাঙ্গাসের মতো জীবাণুর কারণে নিউমোনিয়া হয়। বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, শরীর দুর্বল থাকে। এ ছাড়া বয়স্করা ঠিকমতো শরীরের যত্ন নিতে পারেন না বলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে।
শীতে বয়স্কদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিটাও বেশি থাকে। কারণ শরীর থেকে গরম বের হতে পারে না, ঠান্ডায় ধমনি সংকুচিত হয়ে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। এ ছাড়া রক্তের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, ফলে রক্তনালিতে রক্ত সহজেই জমাট বেঁধে দেখা দেয় স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক।
এর থেকে পরিত্রাণের জন্য গরম কাপড় পরিধান করতে হবে, গরম পানি পান ও ব্যবহার করতে হবে। যারা অন্যান্য রোগে ভোগেন যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি তাদের অবশ্যই এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
জ্বর, গায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি ও এর সঙ্গে রক্ত বের হওয়া এবং বুকে ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে হবে। শীতকালে যত্ন ও পুষ্টির দিকে আলাদাভাবে খেয়াল রাখাটা জরুরি। সে বিষয়ে মাথায় রাখবেন নিচের বিষয়গুলো..
১. ঠান্ডা আবহাওয়ায় বের হলে খুশখুশে কাশি বা গলাব্যথা হতে পারে। এর সহজ এবং দ্রুত প্রতিকার হলো গরম পানিতে লবণ দিয়ে গড়গড়া করা। এক গ্লাস উষ্ণ পানিতে এক চা চামচ লবণ দিয়ে গড়গড়া করা।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন গরম চা, গরম পানিতে আদা, মধু, লেবুর রস, তুলসী পাতার রস ইত্যাদি মিশিয়ে পান করা। এ ছাড়া ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, বিটা ক্যারোটিন, কাঠবাদাম, গ্রিন টি, আনারস, আঙুর, ভুট্টা, লাল আটা, বাদাম তেল, জলপাই, উদ্ভিজ্জ তেল, ব্রকলি, খেজুর ইত্যাদি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে। কারণ এসব খাবার রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৩. সর্দি-কাশির সমস্যার কারণে যদি নাক বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় তবে সামান্য উষ্ণ গরম লবণ পানি নাক দিয়ে টানার অভ্যাস করুন। নাকের একপাশ দিয়ে টেনে অন্য পাশ দিয়ে বের করার চেষ্টা করুন। এতে জমে থাকা মিউকাস সহজেই বের হয়ে যাবে এবং সর্দি-কাশির সমস্যাও দ্রুত কমে যাবে।
৪. ঠান্ডা বেশি হলে কম পানি পান করতে হবে বিষয়টি একেবারেই অযৌক্তিক। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। পানি পান করলে শরীর থেকে বিষাক্ত টক্সিন বের হয়ে যাবে। আপনার গলা ভেজা থাকবে এবং এতে করে ব্যাকটেরিয়া চারপাশে ঘেষতে পারবে না। সুতরাং সুস্থ থাকতে প্রতিদিন আট গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৫. শীতকালে এমনিতে মেটাবোলিজম কমে যায়। শীত এলে বয়স্করা হাঁটাহাঁটি একেবারেই কমিয়ে দেন। হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখার জন্য হলেও শীতকালে নিজের হাঁটাহাঁটি ঠিক রাখতে হবে।
৬. শিশুকে গরম কাপড়ের পোশাক পরা উচিত। শিশুকে সরাসরি উলের পোশাক না পরিয়ে আগে সুতি কাপড়ের পোশাক পরিয়ে তার ওপরে উলের পোশাক পরালে সেটি শিশুর জন্য বেশি স্বাস্থ্যসম্মত।
শীতকাল মানেই বাড়তি যত্ন। এ সময় পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের যত্নে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাই তাদের সুস্থতার কথা ভেবে পরিবারের সবার সচেতনতা জরুরি।
সময়ের আলো/এআর